তখন আমি ফার্স্ট ইয়ার। ঢাকায় বাসা। হলে না থাকলে নাকি বিশ্ববিদ্যালয় জীবনই বৃথা। ঢাকার বাসিন্দা হওয়ায় সিট দিতে চায়নি প্রভোস্ট। অনেক কষ্টে উনাকে রাজি করিয়ে হলে উঠে পড়লাম।
হলে ওঠার সাথেই র্যাগ ট্যাগ খেয়ে বুকে যতটুক কলিজা ছিল তাও শেষ। ১৬ ব্যাচ এর প্রথম স্ট্যাম্প দিয়ে মার আমিই খেয়েছিলাম । যাই হোক স্ট্যাটাসের ফোকাস এটা না। সাড়ে চার মাস পরও আমি গণরুমে।
আমার ব্যাচমেট যারা ছিল ২-৩ জন বাদে তারা সবাই রুমে উঠে গেছে। একটাই কারণ আমি চাটতে পারিনা বড় ভাইদের। আমার কথা একটাই ছিল আমার তো হলে রুম নাম্বার অ্যালট করা। আমাকে রুমে সিট দিবে প্রভোস্ট।
বড় ভাইরা এখানে কোথা থেকে আসল? কী বোকা আমি! কয়দিন পর আমি বুঝে গেলাম বড় ভাইদের কাছে না যেয়ে উপায় নাই। আমার রুম লাগবে। আমি দ্বারে দ্বারে রুম ভিক্ষা করতে লাগলাম।
আমার এখনও চোখে ভাসে আমি রশীদ হলের নীচ তলা থেকে পাঁচতলা পর্যন্ত প্রতিটা রুমে নক করে জানতে চাইছি যে -ভাই কোনো বেড কী ফাকা আছে? আমাকে কী একটা বেড দেওয়া যাবে? প্রত্যেকটা রুম থেকে নেগেটিভ উত্তর আসছে।
আমার চোখ দিয়ে পানি এসে পড়ছিল। আমার অ্যালট যেই রুমে পড়ছিল ওই রুমের ১৩ ব্যাচের ভাই বলল এখানে একটা সিট ফাকা হতে পারে। আরও দুজন এখানে ওঠার জন্য রিকোয়েস্ট করছে। ওরা যদি না উঠে তবে তোমাকে ফোন দিব।
আমি বুঝে গেলাম এই রুমও আমার হাতছাড়া। অন্য রুম এ খোঁজ করতে করতে লাস্ট এক ভাইয়ের সাথে পরিচয় হল। তার নাম ঝলক ভাই (১৪)। সেসময়ের যুগ্ন সাধারণ সম্পাদক, রশীদ হল ছাত্রলীগ। উনি আমার পরিচয় জিজ্ঞেস করল।
পরিচয় বলার পরে দেখি উনি বলে তুমি ওই ছেলে না যে যাকে স্ট্যাম্প দিয়ে পিটাইছে? আমি বললাম জ্বি ভাই। উনি খুব দেখি উৎসাহী হয়ে উঠলেন। বললেন তুমি তো মিয়া সেই মাল। তুমি ছাত্রলীগে জয়েন কর। তোমার মধ্যে সেই স্পার্ক আছে।
তারপর আমাকে বুয়েট ছাত্রলীগ যে সবার থেকে আলাদা, টিউশনির টাকা দিয়ে চলে এইসব হেনতেন বুঝাইয়ে বললেন উনি রুমের ব্যবস্থা করে দিবেন টার্ম ফাইনালের পর। আমি চলে আসলাম।
২ দিন পরই আমাকে ১৩ ব্যাচ এর ভাই ফোন দিয়ে বলল তুমি রুমে উঠে যেতে পার। যারা রিকোয়েস্ট করছিল ওরা অন্য রুমে উঠে গেছে। আমি শেষ পর্যন্ত ওই রুমেই উঠলাম। পলিটিক্যাল ব্যাকাপে রুমে ওঠার কোনো ইচ্ছাই আমার ছিলনা।
১০-১২ দিন পর ডাইনিং এর সামনে ঝলক ভাইয়ের সাথে দেখা। উনি হাসিমুখে বলল তোমার জন্য সিট ব্যবস্থা করে দিব একটু ফ্রি হলেই। আমি বললাম আমি রুমে উঠে গেছি। উনি যাস্ট এটুকু বলল -আমাকে জানাবা না!
কয়দিন পর আমার ডাক আসল উনার রুমে। আমি ভয়ে কাপতে কাপতে গেলাম। আমি ভাবলাম হয়ত ঝাড়বে ওই কারনে। উনি আমাকে ভালমানুষের মতো অনেক ধানাই পানাই করে শেষে বলল -তোমাকে একটা কাজ করতে হবে।
পারবা! আমি আমতা আমতা করতে লাগলাম। উনি নীরবতা ভেঙ্গে বললেন তোমাকে জগন্নাথে প্রক্সি এক্সাম দিতে হবে। আমার কান দিয়ে ধোয়া বের হতে লাগল। এ আমি কি শুনলাম!উনি বললেন তোমাকে অনেক দিন ধরেই আমরা ফল করতেছি।
আমার কাছে মনে হইছে তুমি এই কাজটা করতে পারবা। টাকা পয়সা কোনো ব্যাপারনা। টিউশুনি আর করাতে হবে না।
সূত্র: কালের কন্ঠ
বার্তাবাজার/কেএ