রিমান্ডে নিয়ে আমাকে টর্চার করেনি, আমি এমনিতেই অসুস্থ

ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের বহিষ্কৃত সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া আদালতকে বলেছেন, রিমান্ডে নিয়ে আমাকে টর্চার বা কোনো অত্যাচার করেনি। আমি এমনিতেই অসুস্থ। ১৯ দিন রিমান্ডে আছি। উচ্চ রক্তচাপের পাশাপাশি আমার ডায়াবেটিসও রয়েছে। এসব রোগের নিয়মিত ওষুধ খাচ্ছি।

সোমবার মতিঝিল থানায় করা মাদক আইনের মামলায় রিমান্ড শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। শুনানিকালে ঢাকা মহানগর হাকিম কনক বড়ুয়া আসামির কাছে জানতে চান- রিমান্ডে নিয়ে তাকে (খালেদ) টর্চার করা হয়েছে কি না। জবাবে আদালতের কাছে হাসিমুখে খালেদ ওইসব কথা বলেন।

এদিন অর্থ পাচার ও মাদক আইনের দুই মামলায় পৃথক দুই আদালত তৃতীয় দফায় খালেদের মোট সাত দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এর মধ্যে গুলশান থানায় করা অর্থ পাচার আইনের মামলায় ঢাকা মহানগর হাকিম সাদবীর ইয়াছির আহসান চৌধুরী চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

আর মতিঝিল থানায় করা মাদক আইনের মামলায় ঢাকা মহানগর হাকিম কনক বড়ুয়া তিন দিনের রিমান্ডের আদেশ দেন। দুপুরে গুলশান থানায় করা অস্ত্র আইনের মামলায় আসামিকে আদালতে হাজির করে কারাগারে আটক রাখা এবং একই সঙ্গে অর্থ পাচার আইনের মামলায় গ্রেফতার দেখানো ও রিমান্ড আবেদন করা হয়।

এ ছাড়া মতিঝিল থানায় করা মাদক আইনের মামলায়ও রিমান্ড চাওয়া হয়। আদালত অস্ত্র মামলায় শুনানি শেষে আসামির জামিন নাকচের আদেশ দেন। অর্থ পাচার আইনের মামলায় আসামির ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা।

রিমান্ড আবেদনে বলা হয়, ১৮ সেপ্টেম্বর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে গুলশান-২-এর রোড নং : ৫৯, বাড়ি নং : ৪-এর ৩/এ ফ্ল্যাটে অভিযান পরিচালনা করা হয়।

র‌্যাবের উপস্থিতি টের পেয়ে পালানোর চেষ্টাকালে আসামি খালেদকে গ্রেফতার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আসামি তার কাছে অস্ত্র ও মাদক আছে বলে স্বীকার করে। তখন বাসায় তল্লাশি চালিয়ে অস্ত্র, ইয়াবা, দেশি টাকা ও বিদেশি মুদ্রা উদ্ধার করা হয়।

বিপুল পরিমাণ দেশি-বিদেশি মুদ্রা তিনি বিদেশে পাচারের উদ্দেশ্যে হেফাজতে রেখেছেন। অর্থ পাচারের মূল রহস্য ও এর সঙ্গে জড়িতদের গ্রেফতারের লক্ষ্যে আসামির রিমান্ড প্রয়োজন। আসামি একজন পেশাদার জুয়ার ব্যবসায়ী। রাজধানীতে তার অনেকগুলো জুয়ার ব্যবসা রয়েছে।

রাষ্ট্রপক্ষে হেমায়েত উদ্দিন খান ও আজাদ রহমান আসামির রিমান্ডের শুনানি করেন। শুনানিতে তারা বলেন, দেশি-বিদেশি বিপুল পরিমাণ অর্থ আসামি পাচারের উদ্দেশ্যে নিজ হেফাজতে রেখেছেন। আসামির অর্থ পাচারের সঙ্গে আরও কে কে জড়িত, তা জানার লক্ষ্যে আসামির রিমান্ড প্রয়োজন।

অপরদিকে আসামিপক্ষে মাহমদুল হক, সুব্রত দাসসহ কয়েকজন আইনজীবী রিমান্ড বাতিল চেয়ে জামিন আবেদন করেন। শুনানিতে তারা বলেন, আসামির বাবা সুপ্রিমকোর্টের একজন আইনজীবী, আসামির ছোট ভাই এমনকি ভগ্নিপতিও আইনজীবী। তাদের কাছে টাকা থাকা স্বাভাবিক।

এ ছাড়া আসামি একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। সরকারের কোটি কোটি টাকার কাজ চলমান রয়েছে। প্রতিবছর সরকারকে লাখ লাখ টাকা ট্যাক্স দিচ্ছেন। রিমান্ডে নিয়ে আসামিকে শারীরিক, মানসিক চর্টার- কোনোকিছুই তো আর বাদ রাখেনি। আসামির জীবন বাঁচাতে রিমান্ড নাকচ করা হোক।

রিমান্ডের কোনো যৌক্তিকতা নেই। প্রয়োজনে জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদ করা যেতে পারে। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আদালত অর্থ পাচার আইনের মামলায় আসামির চার দিনের রিমান্ডের আদেশ দেন। আগামী পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে এ রিমান্ড কার্যকরের আদেশ দেয়া হয়েছে।

এরপর অপর হাকিম কনক বড়–য়ার আদালতে মতিঝিল থানায় করা মাদক আইনের মামলায় রিমান্ড শুনানির জন্য আসামিকে নিয়ে যাওয়া হয়। মাদক আইনের এ মামলায় গত ২০ সেপ্টেম্বর আসামির সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা।

২২ সেপ্টেম্বর আদালত হাজতি পরোয়ানা ইস্যু করে খালেদের উপস্থিতিতে রিমান্ড শুনানির জন্য দিন ধার্য করেন। রাষ্ট্রপক্ষে হেমায়েত উদ্দিন খান ও আজাদ রহমান মাদক মামলায় আসামির রিমান্ডের শুনানি করেন। শুনানিতে তারা বলেন, আসামির কাছ থেকে মাদক উদ্ধার হয়েছে।

মাদকের উৎস ও এর সঙ্গে আরও কে কে জড়িত, তা জানার জন্য আসামির রিমান্ড প্রয়োজন। অপরদিকে আসামিপক্ষে মাহমদুল হক, সুব্রত দাসসহ কয়েকজন আইনজীবী রিমান্ড বাতিল চেয়ে জামিন আবেদন করেন। শুনানিতে তারা বলেন, আসামির অফিসের তালা ভেঙে কিছু ইয়াবা, বিয়ারের কৌটা আর সিসা পাওয়া গেছে।

ইতিমধ্যে এ আসামি ১৭ দিন রিমান্ড খেটেছেন। আসামি একজন প্রথম শ্রেণির নাগরিক ও প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। প্রতিদিন তার কোটি কোটি টাকার কাজ চলছে। তিনি বন্ধুবান্ধবসহ হজ করে এসেছেন। এর ৪০ দিনও পার হয়নি। যে পরিবারের বাবা, ছোট ভাই, ভগ্নিপতি একজন আইনজীবী, সে পরিবারের সদস্য হয়ে তিনি (খালেদ) কি কোনো অপরাধ করতে পারেন?

শুনানির এ পর্যায়ে বিচারক আইনজীবীকে থামিয়ে দিয়ে খালেদকে কিছু প্রশ্ন করেন। প্রথমে বিচারক খালেদের উদ্দেশে বলেন, আপনাকে যে রিমান্ডে নেয়া হয়েছে- আপনাকে কি মেরেছে? টর্চার করা হয়েছে? খালেদ দূর থেকে আস্তে জবাব দিলে বিচারক তাকে সামনে এগিয়ে আসতে বলেন।

এরপর নীল রঙের গেঞ্জি ও হাতকড়া পরা খালেদ ডকের ভেতর থেকে বিচারকের দিকে কিছুটা এগিয়ে আসেন এবং বলেন, না; রিমান্ডে নিয়ে আমাকে টর্চার করেনি। আমি এমনিতেই অসুস্থ। গত ১৯ দিন রিমান্ডে আছি। আমার প্রেসার ও ডায়াবেটিস আছে। কি ধরনের প্রেসার তা বিচারক জানতে চান।

জবাবে খালেদ বলেন, হাই প্রেসার। এরপর বিচারক জানতে চান, ওষুধ খাচ্ছেন কি না। জবাবে খালেদ বলেন, এসব রোগের জন্য আমি নিয়মিত ওষুধ খাচ্ছি। কথোপকথন শেষে বিচারক ফের শুনানি শুরুর আদেশ দেন।

আসামিপক্ষের আইনজীবীরা যে কোনো শর্তে জামিন প্রার্থনা করেন এবং প্রয়োজনে জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদ করা যেতে পারে বলে পরামর্শ দেন। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আদালত আসামির জামিন নাকচ করে তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

গত ১৮ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় খালেদকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পরদিন ১৯ সেপ্টেম্বর খালেদের বিরুদ্ধে অস্ত্র, মাদক ও অর্থ পাচার আইনে গুলশান থানায় তিনটি এবং মতিঝিল থানায় মাদক আইনে একটি মামলা করে র‌্যাব।

বার্তাবাজার/কেএ

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর