পাবনায় ভুয়া ডাক্তারের অভিনব জালিয়াতিঃ কঠোর শাস্তির দাবী

রাজশাহী

রাকিবুল হাসান,পাবনা প্রতিনিধি:

সাত বছর ধরে এক লাখ দশ হাজার টাকা বেতনে কাজ করছেন চিকিৎসক পরিচয়ে। অথচ বিএমডিসির নিবন্ধন, মাধ্যমিক, উচ মাধ্যমিক পরীক্ষার সনদ এমনকি নামটিও ব্যবহার করছেন অন্য এক ব্যক্তির। পাবনার ভাঙ্গুড়া উপজেলায় হেলথ কেয়ার ক্লিনিকের এক প্রতারকের এমন কাণ্ডে এখন তোলপাড় জেলাজুড়ে। স্থানীয় চিকিৎসকদের মাধ্যমে সম্প্রতি এ জালিয়াতি ধরা পড়লে কর্মস্থল ছেড়ে উধাও হয়ে গেছেন এই নকল ডাক্তার।

খবর পেয়ে পাবনায় হাজির প্রকৃত চিকিৎসক ডা. মাসুদ করিম। এনিয়ে তোলপাড় শুরু হলে গা ঢাকা দিয়েছেন ওই কথিত চিকিৎসক। ঘটনার শুরু ৭ বছর আগে ২০১২ সালে। পাবনার ভাঙ্গুড়া হেলথ কেয়ারে আলট্রাসনোলজিষ্ট ও আবাসিক চিকিৎসক হিসেবে যোগ দেন ‘কথিত চিকিৎসক’ ডা. মাসুদ করিম। প্রতি মাসে এক লাখ ১০ হাজার টাকা বেতন নেন তিনি। বাংলাদেশ মেডিকেল এসোসিয়েশন (বিএমএ) পাবনা জেলা শাখার আজীবন সদস্য হিসেবে তার পরিচিতি ছিল সবার সাথে। কিন্তু কেউ ঘুনাক্ষরেও জানতে পারেনি, তিনি প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে চিকিৎসক সেজে আছেন। সাত বছর পর এসে জানা গেলো তিনি আসল ডাক্তার মাসুদ করিম নন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ঢাকার খিঁলগাওয়ের বাসিন্দা ডাঃ মাসুদ করিম। ময়ময়নসিংহ মেডিকেল কলেজের ২৮ তম ব্যাচের শিক্ষার্থী এই চিকিৎসক ২০০১ সাল এমবিবিএস পাশ করে কাজ করছেন ঢাকায় নিজস্ব চেম্বারে । অথচ তার নাম ও বিএমডিসি সনদ ব্যবহার করে গত সাত বছর ধরে পাবনার ভাঙ্গুড়ায় হেলথ কেয়ার ক্লিনিকে আলট্রসনোলজিস্ট ও আবাসিক চিকিৎসক হিসবে কাজ করছেন অন্য এক ব্যক্তি। অভিনব জালিয়াতির মাধ্যমে বাংলাদেশ মেডিকল অ্যাসোসিয়েশন বিএমএর পাবনা শাখার আজীবন সদস্যও হয়েছেন তিনি। সম্প্রতি, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের কয়েকজন সহপাঠির মাধ্যম অভিনব এই জালিয়াতির কথা জানতে পারেন আসল ডাঃ মাসুদ করিম। পাবনায় এসে বাস্তব প্রমান পেয়ে হতভম্ব হয় পড়েছেন তিনি।

শনিবার আইনী সহায়তা চেয়ে জেলা পুলিশ সুপার বরাবর লিখিত অভিযোগও করেছেন তিনি। পাবনা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আলাপকালে প্রকৃত চিকিৎসক ডা. মাসুদ করিম বলেন, ১৯৯০-৯১ সেশনে তিনি ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। তিনি ছিলেন ২৮তম ব্যাচের শিক্ষার্থী। এমবিবিএস শেষ করে নিবন্ধন পান বিএমডিসির। নিবন্ধন নং ৩৩৩৬০। বর্তমানে ঢাকার খিলগাঁওয়ে নিজস্ব ডক্টরস চেম্বারে প্রাইভেট চিকিৎসা দেন। স্থায়ী ঠিকানা ফেনীর সোনাগাজী। বাবার নাম আব্দুস শাকুর। বন্ধু চিকিৎসকদের মাধ্যমে জানতে পেরে পাবনায় ছুটে এসেছি। আমার নাম-পরিচয় ও নিবন্ধন নম্বর ব্যবহার করে একজন চিকিৎসক সেজে কাজ করছেন, বিষয়টি আমার জন্য খুব অপমানজক।

বিষয়টি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিভিন্ন শাখায় মৌখিক আমি জানিয়েছি এবং পাবনা সিভিল সার্জনকে লিখিত অভিযোগ দিয়েছি। আইনী ব্যবস্থা নিতে প্রতারক ওই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে শনিবার পুলিশের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন বলেও জানান তিনি।

এদিকে ঘটনা জানাজানির পর কর্মস্থল থেকে লাপাত্তা নকল মাসুদ করিম। ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ তার আসল নাম পরিচয় জানাতে পারেন নি।
অভিযুক্ত মাসুদ করিমের বিষয়ে ভাঙ্গুড়া হেলথ কেয়ার লিমিটেড ক্লিনিকের পরিচালক আবদুল জব্বার জানান, ‘মাসুদ করিমকে মাসিক এক লাখ ১০ হাজার টাকা বেতনে আমাদের ক্লিনিকে চাকুরী করেন।

তিনি পাবনা জেলা বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) আজীবন সদস্য। পাবনার বিভিন্ন ক্লিনিকে দীর্ঘদিন চাকুরী করেছেন। আমাদের কাছে তার সনদের ফটোকপি জমা দিয়েছিলেন। কখনও মনে হয়নি যে তার কাগজপত্র জাল। তবে এখন শুনছি তিনি ভুয়া চিকিৎসক। রাতের আঁধারে ডা. মাসুদ করিম নামের সাইনবোর্ড খুলে ফেলছেন কেন জানতে চাইলে কোনো সদুত্তোর দিতে পারেননি তিনি।’

স্থানীয় সাংবাদিক মাসুদ রানা জানান, ইতিপুর্বে ভুয়া মাসুদ করিমের ভুল চিকিৎসায় কয়েকজন মারা গেছে। ভাঙ্গুড়া হেলথ কেয়ার ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ এ দায় এড়াতে পারেন না। কারণ বাড়ি ভাড়া নিতে গেলেও জাতীয় পরিচয়পত্র, ছবি সহ অনেক কিছু দিতে হয়। সেখানে একটি ক্লিনিকে এক লাখ টাকার উপরে বেতন দিয়ে একজন চিকিৎসক রাখবেন তারা তাকে ও তার কাগজপত্র যাচাই বাছাই করে দেখবে না?
বিএম এ পাবনা শাখার সাধারণ সম্পাদক আকসাদ আল মাসুদ বলেন, ভুয়া ডাক্তার কাগজপত্র জাল করলো কিভাবে? নিশ্চয়ই বিএমডিসির কেউ তাকে সহযোগিতা করেছে। তাদের খুঁজে বের করা দরকার।সবার দাবি, অতি দ্রুত ভুয়া চিকিৎসককে খুঁজে বের করে তার আসল পরিচয় উদঘাটন করা হোক।

পাবনা জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার গৌতম কুমার বিশ্বাস বলেন, আমরা প্রতারণার বিষয়ে ডাঃ মাসুদ করিমের লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। এ বিষয়ে যথাযথ আইনী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

এ বিষয়ে ভাঙ্গুড়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. হালিমা খানম জানান, ঘটনা জানার পরপরই আমরা পদক্ষেপ নিয়েছি। সত্যতা যাচাই করেছি। কাগজপত্র আনার কথা বলে পালিয়েছে কথিত ভুয়া ওই মাসুদ। প্রকৃত মাসুদ করিম স্বশরীরে আমার কাছে এসে অভিযোগ দিয়েছেন। বিষয়টি সিভিল সার্জন স্যার, ইউএনও ও বিএমডিসি কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।