তিস্তা চুক্তির অপেক্ষায় বাংলাদেশের জনগণ

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বাংলাদেশের জনগণ দ্রুত তিস্তা পানিবণ্টন চুক্তি স্বাক্ষর এবং এর বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রয়েছে। দিল্লির হায়দরাবাদ হাউসে শনিবার ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক শেষে দেয়া দুই দেশের যৌথ বিবৃতিতে এ কথা বলেন শেখ হাসিনা।

বিবৃতিতে নরেন্দ্র মোদি বলেন, ‘যত দ্রুত সম্ভব’ তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি নিয়ে সমাধানে পৌঁছতে ভারতের সব অংশীদারের সঙ্গে কাজ করছে তার সরকার। দুই প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গাদের নিজ ভূমি মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ‘নিরাপদ, দ্রুত ও টেকসই’ প্রত্যাবাসন ত্বরান্বিত করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে একমত হয়েছেন বলে যৌথ বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।

একই সঙ্গে তারা রোহিঙ্গাদের ফেরার জন্য রাখাইনে নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়নসহ ‘বৃহত্তর প্রচেষ্টা’ নেয়ার প্রয়োজন সম্পর্কেও ঐকমত্য প্রকাশ করেন। তবে যৌথ বিবৃতিতে বহুল আলোচিত আসামের নাগরিকপঞ্জির প্রসঙ্গ উল্লেখ করা হয়নি, যা নিয়ে বাংলাদেশের উদ্বেগ রয়েছে।

এদিন দুই দেশের মধ্যে সাতটি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। এর মধ্যে চারটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ), একটি স্ট্যান্ডার্ড অপারেশন প্রসিডিউর (এসওপি), একটি চুক্তি এবং অপরটি একটি কর্মসূচির নবায়ন।

এগুলো হচ্ছে- সমুদ্র উপকূলে নজরদারি বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার ও ভারত সরকারের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক, ভারতের পণ্য পরিবহনে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহার বিষয়ক চুক্তি সম্পর্কিত একটি এসওপি (স্বাক্ষর এবং ত্রিপুরায় সাবরুম শহরে পানীয়জল সরবরাহ প্রকল্পে ফেনী নদী থেকে ১ দশমিক ৮২ কিউসেক পানি প্রত্যাহার বিষয়ে বাংলাদেশের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় ও ভারতের জলশক্তি মন্ত্রণালয়ের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক।

ভারত থেকে নেয়া ঋণের প্রকল্প বাস্তবায়নের বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে একটি চুক্তি। এছাড়া হায়দরাবাদ বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একটি সমঝোতা স্মারক, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সাংস্কৃতিক বিনিময় কর্মসূচি বিষয়ে চুক্তি নবায়ন এবং যুব উন্নয়নে বাংলাদেশের যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং ভারতের যুব ও ক্রীড়াবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার লক্ষ্যে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়।

হায়দরাবাদ হাউসে দুই প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের পর উভয়ের উপস্থিতিতে এই স্মারক ও চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। সকাল সাড়ে ১১টায় দ্বিপক্ষীয় বৈঠক শুরুর আগে দুই নেতা কিছুক্ষণ একান্তে কথা বলেন।

জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিব মোস্তাফা কামাল উদ্দিন এবং বাংলাদেশে ভারতীয় হাইকমিশনার রিভা গাঙ্গুলী দাস উপকূলীয় নজরদারি সিস্টেম বিষয়ে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেন।

ত্রিপুরায় সাবরুম শহরে পানীয়জল সরবরাহ প্রকল্পে ফেনী নদী থেকে ১ দশমিক ৮২ কিউসেক পানি প্রত্যাহার বিষয়ে দুই দেশের মধ্যকার সমঝোতা স্মারকে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব কবির বিন আনোয়ার এবং ভারতের পানিসম্পদ সচিব উপেন্দ্র প্রসাদ সিং স্বাক্ষর করেন।

ভারত থেকে নেয়া ঋণ চুক্তি (এলওসি) বাস্তবায়ন বিষয়ে দুই দেশের মধ্যকার চুক্তিতেও এই দু’জনই স্বাক্ষর করেন। চুক্তি স্বাক্ষর এবং সমঝোতা স্মারক বিনিময়ের পর দুই প্রধানমন্ত্রী ভিডিও লিংকের মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে সম্পাদিত অংশীদারিত্বমূলক তিনটি দ্বিপাক্ষিক উন্নয়ন প্রকল্প যৌথভাবে উদ্বোধন করেন।

প্রকল্পগুলো হচ্ছে- খুলনার ইন্সটিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্সে বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া প্রফেশনাল স্কিল ডেভেলপমেন্ট ইন্সটিটিউট (বিআইপিএসডিআই), রামকৃষ্ণ মিশন ঢাকায় ‘বিবেকানন্দ ভবন’ নামে একটি ছাত্র হোস্টেল এবং বাংলাদেশ থেকে ভারতের ত্রিপুরাতে এলপিজি আমদানি প্রকল্প।

উদ্বোধন-পরবর্তী ভাষণে শেখ হাসিনা বলেন, ‘গত এক দশকে দুই দেশের মধ্যে বিভিন্ন প্রচলিত ক্ষেত্রে সহযোগিতা এবং সহায়তা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।’ ‘একই সঙ্গে দুই দেশ বিভিন্ন নতুন এবং অপ্রচলিত ক্ষেত্রেও সহযোগিতার হস্তকে প্রসারিত করেছে।

যার মধ্যে রয়েছে- সুনীল অর্থনীতি, সমুদ্রসীমা, পারমাণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার, মহাকাশ গবেষণা, ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ রফতানি এবং সাইবার নিরাপত্তা’, যোগ করেন তিনি।

এই বহুমুখী এবং বহুমাত্রিক সহযোগিতার কারণে দুই দেশের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক সমগ্র বিশ্বের কাছে সুপ্রতিবেশীসুলভ সম্পর্কের উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি এই সহযোগিতা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।’

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালে ভারত সরকার ও জনগণের সর্বাত্মক সহযোগিতার কথা পরম কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটি চিরদিনের জন্য একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে।’

ভারতের আর্থিক অনুদানে ঢাকার রামকৃষ্ণ মিশনে ৪ তলা ‘বিবেকানন্দ ভবন’ (ছাত্র হোস্টেল) নির্মাণের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখানে বসবাসরত শিক্ষার্থীদের শিক্ষার বিকাশে এই ভবনটি ভূমিকা রাখবে।

এখানে বসবাসকারী শিক্ষার্থীরা স্বামী বিবেকানন্দের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, খুলনায় ইন্সটিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্সে স্থাপিত বাংলাদেশ-ভারত প্রফেশনাল স্কিল ডেভেলপমেন্ট ইন্সটিটিউটের উন্নত মানের যন্ত্রপাতি ওই অঞ্চলের ক্ষুদ্র-মাঝারি প্রতিষ্ঠানকে নানা ধরনের সেবা দেয়ার মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসারে ভূমিকা রাখবে।

শেখ হাসিনা অভিমত ব্যক্ত করেন, ‘বাংলাদেশ থেকে ভারতে এলপিজি রফতানির সিদ্ধান্ত দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করবে। এর ফলে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোর জ্বালানি চাহিদা পূরণ সহজ হবে।’

প্রধানমন্ত্রী এ সময় প্রকল্প তিনটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশ এবং ভারতের সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে ভবিষ্যতেও দুই দেশের মধ্যে এ ধরনের যৌথ অংশীদারিত্বমূলক বিভিন্ন প্রকল্পের সফল পরিসমাপ্তির আশা প্রকাশ করেন।

সবাইকে শারদীয় দুর্গোৎসবের শুভেচ্ছা জানিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেন, আজকের এই তিনটি প্রকল্পসহ গত এক বছরের মধ্যে বাংলাদেশ ও ভারত যৌথভাবে ১২টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। তিনি বলেন, ‘এই শুরু হওয়া তিনটি প্রকল্পের উদ্দেশ্য একই- মানুষের জীবন মানের উন্নয়ন এবং এটাই ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কেরও মূল ভিত্তি।’

বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে ভারত সব সময় গুরুত্ব দেয় উল্লেখ করে নরেন্দ্র মোদি বলেন, ‘এই দুই বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিবেশীর মধ্যে সম্পর্ক বিশ্বের কাছে একটি সুন্দর উদাহরণ।’ তিনি বলেন, ‘আজকের পর, এই সম্পর্ক আরও নতুন উচ্চতায় আসীন হল।’

বাংলাদেশ থেকে ভারতে বাল্ক এলপিজি সরবরাহ প্রসঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ এবং ভারত দুই দেশই এ থেকে লাভবান হবে, কেননা এটি দুই দেশের জন্যই সমান সুবিধাজনক পরিস্থিতির নির্দেশ করে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয় যৌথ বিবৃতিতে। নরেন্দ্র মোদি আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছেন, তবে তার সফরের দিনক্ষণ পরবর্তী সময়ে চূড়ান্ত করা হবে।

এদিনই বিকাল সাড়ে চারটায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতের রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দের সঙ্গে রাষ্ট্রপতি ভবনে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চার দিনের সরকারি সফরে বৃহস্পতিবার নয়াদিল্লি আসেন।

টানা তৃতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর এটাই তার প্রথম দিল্লি সফর। এর আগে তিনি ২০১৭ সালের এপ্রিলে সর্বশেষ দিল্লি সফর করেন। আজ রোববার প্রধানমন্ত্রী দেশে ফিরবেন।

শেখ হাসিনার হাতে উঠল ‘টেগর শান্তি পুরস্কার’ : শান্তি প্রতিষ্ঠা, ক্ষুধা ও দারিদ্র্য দূর এবং দুর্নীতি প্রতিরোধে অবদানের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘টেগর শান্তি পুরস্কার’ দেয়া হয়েছে। শনিবার নয়াদিল্লিতে হোটেল তাজমহলে এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে এ পুরস্কার দেয়া হয়।

কলকাতা এশিয়াটিক সোসাইটির সভাপতি আশা মোহাম্মদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে এ পুরস্কার তুলে দেন। পুরস্কারের জন্য বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে বেছে নেয়ার কারণ হিসেবে এশিয়াটিক সোসাইটি, কলকাতা বলেছে, শান্তি প্রতিষ্ঠা, ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও দুর্নীতি প্রতিরোধ, সন্ত্রাসবাদ নির্মূল এবং রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রতি ভূমিকা রাখায় তাকে এই পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছে। বিশ্ব শান্তির অবিসংবাদিত নেতা নেলসন ম্যান্ডেলাও এ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন।

বাংলাদেশকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয় ভারত- জয়শঙ্কর : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে ‘সর্বোচ্চ গুরুত্ব’ দেয়ার কথা জানালেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর।

শনিবার শেখ হাসিনা-নরেন্দ্র মোদি দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের আগে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে যান ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। পারস্পরিক সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় নিতে এই সাক্ষাতে উষ্ণ আলোচনা হয়েছে জানিয়ে টুইট করেছেন ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রাভীশ কুমার।

তিনি লিখেছেন, ভারত যে প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে ‘সর্বোচ্চ গুরুত্ব’ দেয়, তা তুলে ধরেছেন জয়শঙ্কর। এই সাক্ষাৎ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আবদুল মোমেন, উপদেষ্টা গওহর রিজভী, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম।

বার্তাবাজার/কেএ

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর