সময়টা ১৯৮৬ সাল। তখন আমি ৫ম শ্রেণীর ছাত্র। গৌর পদ দাস স্যার তখন ফরিদপুরের গোয়ালচামট পিটিআই সংলগ্ন পরীক্ষণ বিদ্যালয়ের শিক্ষক। উত্তম চরিত্রের সদালাপী ও মিশুক স্বভাবের এই মানুষটা আমাদের ভালোবাসতেন খুব। স্যারের সাথে কত স্মৃতি আমার। স্যার এমনভাবে যত্ন নিয়ে ক্লাসে অংক করাতেন সে সময়ে প্রাইভেট, কোচিং কি বিষয় তা আমরা বুঝতামই না। অবশ্য তার প্রয়োজনও ছিলনা। সবচেয়ে সহজ এবং বোধগম্য নিয়মটি ক্লাসে প্রয়োগ করতেন তিনি।
শুধু শ্রেণীকক্ষেই নয়, সকল ধরনের সহশিক্ষা-কার্যক্রমে স্যারের সহযোগিতা ছিল সবচেয়ে বেশি। কবিতা আবৃত্তি করাতেন, বিতর্ক শেখাতেন, নিজে জারী গান লিখে সুর দিয়ে শেখাতেন আমাদের। শিশু একাডেমি ও খেলাঘর কর্তৃক আয়োজিত মৌসুমী প্রতিযোগিতাসহ বিভিন্ন দিবস উদযাপনে স্যার আমাদের অংশগ্রহণ করাতেন। এসব প্রতিযোগিতায় কবিতা আবৃত্তি, গান কিংবা অভিনয়ে বিজয়ী হলে স্যার আনন্দে আমাদের বুকে জড়িয়ে ধরতেন। স্কুলের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার দায়িত্বে থাকতেন গৌর স্যার। তিনি আমাদের খেলাধুলাসহ শরীরচর্চার প্রশিক্ষণ দিতেন। স্যারের আন্তরিকতার ফলেই লেখাপড়া ও সহশিক্ষা কার্যক্রমে আমরা কখনো পিছিয়ে ছিলাম না। মানুষ গড়ার কারিগর গৌর স্যার শিক্ষার্থীদের থেকে পেয়েছেন স্বার্থহীন-প্রাণভরা ভালোবাসা। এখনো স্যার প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের সাথে যোগাযোগ করে খোঁজ খবর নিয়ে থাকেন। শিক্ষার্থীরা কৃতজ্ঞচিত্তে স্যারের ভূঁয়সী প্রশংসা করেন।
এখনো আমি স্যারের শূন্যতা অনুভব করি। বন্ধের দিনে স্যার আমাকে নিয়ে ফরিদপুর কুমার নদীর পাড়ে, শ্রী অঙ্গনের প্রাকৃতিক পরিবেশে, শিশু পার্কেসহ খোলা মাঠে ঘুরতে নিয়ে যেতেন। স্কুলের আশেপাশে কোন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হলে আমাকে সাথে করে নিয়ে যেতেন এবং অনুষ্ঠান উপভোগ করতেন। এই স্মৃতিগুলো আমাকে আবেগাপ্লুত করে। তিনি শুধু শিক্ষকই নন, তিনি ছিলেন আমার বন্ধু।
স্যারের মুখে সবসময় হাসি লেগেই থাকতো। সবার সাথেই তিনি হাসি মুখে কথা বলতেন। শিশুদের ভালোবাসতেন খুব। স্যারের বাসায় যাতায়াত ছিল আমার। একদিন দেখি স্যারের কোলে দুটি বিড়াল ছানা বসে আছে। শিশুদের ন্যায় ছানা দুটিকে তিনি আদর করছেন আর ছানা দুটিও স্যারের সাথে খেলা করছে। দৃশ্যটি আমাকে অভিভূত করেছিল। স্যার ক্লাসে সবসময় বলতো, মানুষকে ভালোবাসবে, অসৎ সঙ্গ থেকে দূরে থাকবে, সময়ের কাজ সময়ে শেষ করবে। যা কিছুই করো না কেন, লেখাপড়া যেন ঠিক থাকে। ছড়া শোনাতেন, ‘খোকন সোনা বলি শুন, থাকবে না দুঃখ কোন! মানুষ যদি হতে পারো।’ স্যারের কথাগুলো আজও মেনে চলি কদমে কদমে। চেষ্টা করি তাঁর আদর্শ ধারণ করতে।
নির্লোভ, শিক্ষার্থীবান্ধব এই শিক্ষক পারিবারিক জীবনেও সফল। মানবসেবার ব্রতে দুই সন্তানকেই বানিয়েছেন ডাক্তার। একপুত্র তমাল বর্তমানে মাগুরা মেডিকেল কলেজের লেকচারার। আরেকপুত্র তরুরাজ ৩৯তম বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত। যত্ন আর ভালোবাসায় সন্তানদ্বয় মানুষ করেছেন স্যার। আমিও চেষ্টা করছি সন্তানদের সেভাবে মানুষ করতে। স্যারের সবচেয়ে বড় যে গুণটি আমাকে অণুপ্রাণিত করেছে, তিনি নির্লোভ নির্মোহ চরিত্রের একজন মানুষ। স্যারের মত নির্মোহ হওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছি।
লেখক: মোহাম্মদ এমদাদুল হক, জনসংযোগ কর্মকর্তা, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়