জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ ও দুর্নীতির অভিযোগে উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে প্রশাসনিক ভবন অবরোধসহ সর্বাত্মক ধর্মঘট পালন করছে আন্দোলনকারী শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। এর ফলে স্থবিরতা নেমে এসেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রমে।
বুধবার সকাল ৭টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ও পুরাতন প্রশাসনিক ভবনের সামনে অবস্থান নেয় আন্দোলনকারীরা। এছাড়াও পূর্বঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে বুধবার রাত সাড়ে ১২টায় ঢাকায় অবস্থানরত শিক্ষকদের আনতে যাওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ঢাকাগামী বাস আটকে দেয় তারা।

এদিকে উপাচার্য অধ্যাপক ড. ফারজানা ইসলামের বিরুদ্ধে চলমান আন্দোলনের প্রতিবাদে ‘বঙ্গবন্ধু শিক্ষক পরিষদ’র ব্যানারে মানববন্ধন করেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। বুধবার সকাল ১১টায় শতাধিক শিক্ষকের উপস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পাদদেশে এ কর্মসূচী পালন করা হয়।
এদিকে আন্দোলনকারীদের অবরোধ চলায় কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কোন অফিসেই প্রবেশ করতে পারেনি। এসময় তাদের অফিসগুলোর সামনে অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। সর্বাত্মক ধর্মঘটের ফলে ক্যাম্পাস থেকে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের বহনকারী কোন বাস ক্যাম্পাসের বাইরে ছেড়ে যেতে পারেনি। তাছাড়া ক্লাস-পরীক্ষাগুলো আন্দোলনের ফলে বন্ধ রয়েছে। তবে পূর্ব নির্ধারিত পরীক্ষাগুলো এ কর্মসূচির বাইরে ছিল।
আন্দোলনের বিষয়ে ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর’ আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক আরিফুল ইসলাম বলেন ‘গত দু’মাসে আন্দোলনকে দমানোর জন্য উপাচার্য বারবার মিথ্যাচার করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫০ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে অযোগ্য, অদক্ষ প্রশাসন হল এ উপাচার্যের প্রশাসন। ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর, ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রারসহ বিভিন্ন ভারযুক্ত প্রশাসন এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তিতে কলঙ্ক লেপন করেছে। আমরা মনে করি অধ্যাপক ফারজানা নৈতিকভাবে তার পদকে কলঙ্কিত করায় তিনি আর তার পদে থাকতে পারেন না। বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম ও ভাবমূর্তি রক্ষার্থে তাকে অপসারণ করতে আন্দোলনকারীরা বদ্ধ পরিকর।’
‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর’র আরেক সংগঠক শহিদুল ইসলাম পাপ্পু বলেন, ‘আমরা উপাচার্যকে ১ অক্টোবরের মধ্যে স্বেচ্ছায় পদত্যাগের সুযোগ দিয়েছিলাম। কিন্তু তিনি তা করেননি। এখন আমরা আন্দোলনের মাধ্যমে তাকে অপসারণ করব। আজকের মতো কালও সর্বাত্মক ধর্মঘট চলবে। এরপর আরও কঠোর আন্দোলনের কর্মসূচি দেওয়া হবে।’
অন্যদিকে গতকাল দুপুরে প্রেস ব্রিফিংয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম আন্দোলনকারীদের দাবিকে ‘অযৌক্তিক’ আখ্যা দিয়ে পদত্যাগ করবেন না বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘বিচার-বিভাগীয় তদন্তের যে দায়িত্ব আমাকে আন্দোলনকারীরা দিয়েছে, সেটি অযৌক্তিক। আমি নিজের বিরুদ্ধে তদন্ত করতে বা চাইতে পারিনা। এটি সরকার অথবা বিচার বিভাগ চিন্তা করবে। এখানে অযৌক্তিক দাবি নিয়ে আমাকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগে আহ্বান করা হচ্ছে।’
এদিকে আজ উপাচার্যের পক্ষে মানববন্ধনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক অজিত কুমার মজুমদার বলেন, ‘আন্দোলন আর চক্রান্ত দুইটা দুই জিনিস। আমি মনে করি আন্দোলন হলে আলোচনাও হবে। আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান হবে। আলোচনায় না গিয়ে আন্দোলন করলে তা চক্রান্তই বলা যায়।’
মানববন্ধনে বঙ্গবন্ধু শিক্ষক পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক আবদুল মান্নান চৌধুরী বলেন, ‘আন্দোলনকারীদের দাবির প্রেক্ষিতে তদন্ত কমিটির জন্য উপাচার্য আলোচনায় বসলেও তারা উপাচার্যের পদত্যাগ দাবি করে। এতেই প্রমাণিত হয় এই আন্দোলনের পেছনে ষড়যন্ত্র রয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ষড়যন্ত্রমূলক কোনো অযৌক্তিক আন্দোলনের কাছে আমরা মাথা নত করব না।’
মানববন্ধনে বঙ্গবন্ধু শিক্ষক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক বশির আহমেদ বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন কর্মকান্ড বাঁধাগ্রস্ত করতে একটি মহল অযৌক্তিক আন্দোলন করছে। এ বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো অযৌক্তিক আন্দোলন সফল হবে না।’ এসময় আন্দোলনকারীরা অচিরেই তাদের ভুল বুঝতে পেরে আন্দোলন প্রত্যাহার করে নিবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
মানববন্ধনে অধ্যাপক এ এ মামুন, অধ্যাপক আবদুল্লাহ হেল কাফী, অধ্যাপক হানিফ আলী, অধ্যাপক সোহেল আহমেদ, অধ্যাপক রাশেদা আখতার, অধ্যাপক আলী আজম তালুকদার সহ শতাধিক শিক্ষক উপস্থিত ছিলেন।