অনলাইন ক্যাসিনো কিং সেলিম প্রধানকে নিয়ে তার বাসা ও অফিসে দিনভর অভিযান চালিয়েছে র্যাব। তিনি তিনটি ব্যাংকের বিভিন্ন একাউন্টের মাধ্যমে বিপুল টাকা বিদেশে পাচার করতেন বলে জানা গেছে।
এ ছাড়া ক্যাসিনোর বিপুল পরিমাণ টাকা লেনদেনের একটি গেটওয়ে শনাক্ত করেছে র্যাবের তদন্তকারী দল। একাধিক সূত্র জানায়, ঢাকায় অনলাইন ক্যাসিনোর আরও অন্তত ১৫টি চক্রের সন্ধান পেয়েছে র্যাব। তাদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার প্রস্তুতি চলছে।
গত সোমবার ব্যাংককগামী একটি ফ্লাইট থেকে নামিয়ে গ্রেপ্তার করা হয় সেলিম প্রধানকে। পরে তাকে নিয়ে রাজধানীর গুলশান-২ এর ৯৯ নম্বর রোডের ১১/এ বাসায় অভিযান চালায় র্যাব।
দীর্ঘ ১৮ ঘণ্টা অভিযান শেষে গতকাল মঙ্গলবার বিকালে র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সারোয়ার বিন কাশেম সংবাদ সম্মেলনে বলেন, গত সোমবার রাত থেকে যে অপারেশন শুরু করেছি আজ (মঙ্গলবার) সারাদিন আমরা পুনর্নিরীক্ষা করেছি।
এর ফলশ্রুতিতে আমরা তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছি। আমাদের একটি সাইবার মনিটরিং সেল রয়েছে। সেই সেলে আমরা দেখতে পাই কিছু অসাধু ব্যবসায়ী অনলাইনে ক্যাসিনো গেমিংয়ে নিয়োজিত রয়েছে।
এ অনলাইন গেমিংয়ের প্রধান সমন্বয়ক সেলিম বাংলাদেশ থেকে থাই এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইটে ব্যাংকক যাচ্ছিল। আমরা খবর পেয়ে তাৎক্ষণিক তাকে বিমান থেকে নামিয়ে আনি।
তিনি আরো বলেন, প্রাথমিকভাবে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে সন্ধ্যায় তার গুলশানের বাসায় অনুসন্ধান শুরু করি। অনুসন্ধানে আমরা তার বাসায় ৪৮টি বিদেশি মদের বোতল পেয়েছি।
২৯ লাখ ৫ হাজার ৫০০ টাকা উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া, ২৩ দেশের ৭৭ লাখ ৬৩ হাজার টাকা সমমূল্যের বিদেশি মুদ্রা ও ১৩টি ব্যাংকের ৩২টি চেক জব্দ করা হয়েছে। জব্দ করা হয়েছে অনলাইন ক্যাসিনো খেলার মূল সার্ভার, আটটি ল্যাপটপ এবং দুটি হরিণের চামড়া। ১২টি পাসপোর্টও জব্দ করা হয়েছে।
সারোয়ার বিন কাশেম বলেন, ভাইয়ের হাত ধরে সেলিম ১৯৮৮ সালে জাপান পাড়ি জমান। সেখানে গিয়ে ভাইয়ের সঙ্গে গাড়ির ব্যবসা শুরু করেন। সেখান থেকে থাইল্যান্ড গিয়ে শিপইয়ার্ডের ব্যবসা শুরু করেন।
পরে জাপানিদের মাধ্যমে উত্তর কোরিয়ার এক ব্যক্তির সঙ্গে তার পরিচয় হয়। যার নাম মিস্টার দু। এই মিস্টার দু সেলিমকে বাংলাদেশ একটি কনস্ট্রাকশন সাইট খোলার প্রস্তাব দেন।
সেই সঙ্গে বাংলাদেশ একটি অনলাইন ক্যাসিনো খেলারও পরামর্শ দেন। সেই সূত্র ধরে টি-২১ এবং পি২৪ নামে অনলাইন গেমিং সাইট চালু করেন সেলিম। এর মূল কাজ হচ্ছে টাকার মাধ্যমে অনলাইনে ক্যাসিনো খেলা।
তিনি আরো বলেন, অনলাইনে ক্যাসিনো কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার আগে প্রত্যেক জুয়াড়িকে নির্দিষ্ট ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খুলতে হতো। এখন পর্যন্ত এমন তিনটি ব্যাংকের পেয়েছি আমরা। অ্যাকাউন্টগুলোয় নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা রাখতে হতো।
খেলায় জিতলে বা হারলে ওই অ্যাকাউন্টে টাকা যোগ হতো বা কাটা যেত। সম্পূর্ণ লেনদেন হতো একটি গেটওয়ের মাধ্যমে। এখন পর্যন্ত একটি গেটওয়ের সন্ধান পেয়েছে র্যাব। ওই গেটওয়েতে এক মাসেই প্রায় ৯ কোটি টাকা জমা হয়েছে। আরও গেটওয়ে আছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পরবর্তী সময়ে সেলিমের দুই সহযোগী আখতারুজ্জামান ও রোকন লেনদেনের এই টাকা হয় নগদে তুলে নিতেন, নয়তো বিদেশে পাঠিয়ে দিতেন। এসব টাকার অর্ধেক কোরিয়া এবং বাংলাদেশের যারা জড়িত তারা পেতো।
র্যাব জানায়, সেলিমের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ‘প্রধান গ্রুপ’। ২০১৬ সালে তারা শুধু কম্পিউটার গেমস বাজারে আনতেন। পরে তিনি অনলাইন জুয়া ও ক্যাসিনো কারবারে জড়িয়ে পড়ে। পি২৪-এর সঙ্গে বাংলাদেশে ১৫০টি অপারেটর এবং ক্যাসিনো যুক্ত আছে।
অনলাইনে বিশ্বের সবচেয়ে প্রচলিত ক্যাসিনোর সঙ্গে যুক্ত করে দেওয়ার ক্ষমতা আছে তাদের। সেলিম প্রধানের জাপান-বাংলাদেশ সিকিউরিটি প্রিন্টিং অ্যান্ড পেপারসে বিভিন্ন ব্যাংকের চেক বই ছাপা হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অফিসের নথিপত্রও ছাপানো হয়। তার এই প্রতিষ্ঠান রূপালী ব্যাংকের শীর্ষ ঋণখেলাপিদের একটি।
বার্তাবাজার/কেএ