চট্টগ্রামে মাদক, জুয়া, ক্যাসিনো ও কিশোর গ্যাং পরিচালনায় জড়িত শতাধিক বড় ভাই। যারা দীর্ঘদিন দাপিয়ে বেড়িয়েছে চট্টগ্রাম মহানগর। কিন্তু তারা এখন লাপাত্তা।
র্যাব-পুলিশের অভিযান ও কিশোর গ্যাংয়ের বড় ভাই যুবলীগ নেতা নূর মোস্তফা টিনু র্যাবের হাতে গ্রেপ্তারের পর কথিত বড় ভাইরা লাপাত্তা হয়ে যায় বলে জানান নগর পুলিশের কর্মকর্তারা।
চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ কমিশনার মাহাবুবুর রহমান এ প্রসঙ্গে বলেন, বড় ভাই, ছোট ভাই বুঝি না, মাদক, জুয়া, ক্যাসিনো ও কিশোর গ্যাং পরিচালনায় যারা লিপ্ত তাদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতারা যে দলেরই হোক, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশনা রয়েছে। তবে অভিযান শুরুর পর তারা এখন লাপাত্তা।
সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম মহানগরীর ১৬ থানায় মাদক, জুয়া ও কিশোর গ্যাং পরিচালনায় লিপ্ত কথিত বড় ভাইদের একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে।
ওই তালিকায় এলাকাভিত্তিক ৬০০ অপরাধীর নাম উঠে এসেছে। এ তালিকায় থাকা অপরাধীদের মধ্যে শতাধিকই হচ্ছেন কথিত বড় ভাই। যারা বিভিন্ন উৎসবে দলীয় ব্যানার-পোস্টার ব্যবহার করলেও বেশির ভাগের দলে কোনো পদ-পদবি নেই। প্রভাবশালী নেতা তকমা নিয়ে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করছে তারা। তবে অভিযান শুরু হওয়ায় নড়েচড়ে বসেছেন দাপুটে বড় ভাইরা।
সূত্র জানায়, চট্টগ্রামে দীর্ঘদিন ধরে কিশোরদের হাতের পুতুল হিসেবে ব্যবহার করছে এসব বড় ভাইরা। মাদক ও জুয়ার নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে কিশোরদের প্রশ্রয় দিয়েছেন তারা। এর মধ্যে কিশোর অপরাধের সর্বশেষ বলি জাকির হোসেন সানি (১৮)।
গত ২৬শে আগস্ট দুপুরে নগরীর খুলশী থানার জাকির হোসেন সড়কে ওমরগণি এমইএস কলেজের ফটকের অদূরে ইক্যুইটি ভবনের সামনে ছুরিকাঘাতে খুন হয় সানি। ২২শে আগস্ট বড় ভাইয়ের ছত্রছায়ায় চুরি করা ৩ কিশোরকে আটক করে কোতোয়ালি থানা পুলিশ। আটককৃতরা চুরি করলেও ফায়দা হাসিল করেন ওই বড় ভাই- এমন তথ্য উঠে আসে আটককৃতদের স্বীকারোক্তিতে।
পুলিশ সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম মহানগরীর চকবাজারে মাদক, জুয়া ও কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা সীমা ছাড়িয়েছে। এখানে দুটি নামকরা কলেজ ও কয়েকটি স্কুল রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের উঠতি বয়সী শিক্ষার্থীদের নিয়ে সক্রিয় রয়েছে দুটি গ্রুপ। এক গ্রুপের নেতৃত্বে রয়েছেন যথাক্রমে যুবলীগ নেতা নূর মোস্তফা টিনু।
গত ৬ই এপ্রিল এক স্কুলছাত্রীকে উত্ত্যক্ত করার জেরে কিশোরদের দুই পক্ষের মধ্যে ঝগড়া হয়। অভিযোগ, এ দ্বন্দ্বের একপর্যায়ে নগরীর গোলপাহাড় এলাকার যুবলীগ কর্মী এমএইচ লোকমান রনি নিহত হন স্থানীয় সন্ত্রাসী সাইফুল ইসলামের গুলিতে। এর দু’দিন পর পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন সাইফুল। সে ছিলো নূর মোস্তফা টিনুর অনুসারী। এ ছাড়া বিভিন্ন ছিনতাইয়ের ঘটনায়ও টিনুর অনুসারীরা পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছে।
এসব বিষয় নিয়ে র্যাবের পক্ষ থেকে রীতিমতো যাচাই বাছাইয়ের পর তারা টিনুকে গ্রেপ্তারে অভিযান চালায়। রোববার দিনগত রাতে চার ঘণ্টাব্যাপী অভিযানে অস্ত্রসহ তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাকে নিয়ে তার বিভিন্ন ডেরায় হানা দিয়ে আরো কিছু অস্ত্র-গুলি ও তথ্য উপাত্ত জোগাড় করে র্যাব।
নগরীর চকবাজার, জামালখান, গণি বেকারি মোড়, চন্দনপুরা ও রহমতগঞ্জ এলাকায় সক্রিয় রয়েছে ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়াবিষয়ক সম্পাদক আবদুর রউফের একটি গ্রুপ। যার নেতৃত্বে রয়েছে এনাম হোসেন, জিলহাজ ও বোরহানসহ অর্ধশতাধিক কিশোর।
চট্টগ্রামের দুর্ধর্ষ শিবির ক্যাডার ও ডাকাতি মামলার আসামি মো. ফিরোজ ও শাহীন যুবলীগ নেতা পরিচয়ে আবদুর রউফের গ্রুপে সক্রিয়। তারা রিচ কিডস গ্যাং পরিচালনা করেন। অর্ধশতাধিক কিশোর এ গ্রুপে সক্রিয়। অভিযোগ রয়েছে, আবদুর রউফ প্রায় ৭ বছর আগে নগরীর জামালখান এলাকায় একটি ভবন দখল করে। চতুর্থ তলা ওই ভবনের নিচতলা ‘মেজ্জান হাইলে আইয়ুন’ নামে একটি হোটেল ও উপরের তিন তলার অর্ধেকাংশ ভাড়া দিয়ে প্রতিমাসে লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে আবদুর রউফ। অর্ধেকাংশ ভাড়া দিয়েছে শাহীনসহ সহযোগী আরো ৫ জন।
এদিকে নগরীর দুই নম্বর গেট, জিইসি, জাকির হোসেন রোড, আল ফালাহ গলি ও নাসিরাবাদ এলাকায় সক্রিয় শুলকবহর ওয়ার্ডের কথিত যুবলীগ নেতা সোলাইমান বাদশার গ্যাং। এই গ্যাংয়ের ডিএক্স বয়েজ নামে একটি ফেসবুকভিত্তিক গ্রুপ রয়েছে। এ গ্রুপের সদস্যরা ২০১৮ সালের ১৬ই ফেব্রুয়ারি পুলিশের এক এএসআইকে গুলি করে। প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নাসিম আহমদ সোহেল হত্যার অভিযোগও রয়েছে এ গ্রুপের সদস্যদের বিরুদ্ধে।
নগরীর বায়েজিদ বোস্তামি থানার নাসিরাবাদ শিল্প এলাকা, পলিটেকনিক ও শেরশাহ এলাকায় রয়েছে যুবলীগ নেতা আবু মোহাম্মদ মহিউদ্দিন এবং দিদারুল আলম দিদারের একটি গ্যাং। তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন পোশাক কারখানা, নির্মাণাধীন ভবনে চাঁদাবাজি ও ভূমি দখলের অভিযোগ রয়েছে।
গত ১৩ই মে নগরীর বায়েজিদ বোস্তামি থানার শেরশাহ বাংলাবাজার এলাকায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ভ্রাম্যমাণ আদালত অবৈধ দোকান উচ্ছেদ করতে গেলে হামলা চালান কথিত যুবলীগ নেতা মো. জসিম ওরফে পানি জসিম। সেখানে তার একটি গ্যাং রয়েছে। পরে পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে আহত হন তিনি।
২০১৮ সালের ১৭ই জুন রাতে চট্টেশ্বরী রোডের মুখে প্রকাশ্যে খুন করা হয় আবু জাফর অনিককে। এ মামলার প্রধান আসামি মহিউদ্দিন তুষার। তুষারের নেতৃত্বে নগরের ব্যাটারি গলি এলাকায় কিশোর-তরুণদের একটি গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। একই বছরের ২৭শে এপ্রিল ডিশ ব্যবসার বিরোধের জেরে নগরের চকবাজার ডিসি রোডের গনি কলোনি এলাকায় গুলি করে যুবলীগ নেতা ফরিদুল ইসলামকে খুন করা হয়। এ ঘটনায় জড়িত মোহাম্মদ ফয়সাল। প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ইয়াসির আরাফাত ইমন খুনেও জড়িত ছিলেন ফয়সাল। ডিসি রোড এলাকায় তার একটি গ্যাং রয়েছে।
বায়েজিদ বোস্তামী থানার শেরশাহ এলাকায় সক্রিয় রয়েছে ইমদাদ, নাজিম ও রিপন। এ ছাড়া শফি ও আব্দুল কুদ্দুস ওরফে কানা কুদ্দুসের একটি গ্রুপও রয়েছে। নগরীর লালখান বাজার এলাকায় সক্রিয় দুটি গ্রুপ। এক পক্ষের নেতৃত্বে আছেন লালখান বাজার ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সমপাদক দিদারুল আলম মাসুম। অন্য পক্ষের নেতৃত্বে রয়েছেন স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা আবুল হাসনাত মোহাম্মদ বেলাল। গত বছরের ২৯শে সেপ্টেম্বর দুই পক্ষের সংঘর্ষে খুন হন ছাত্রলীগ কর্মী দিদার।
২০১৭ সালের ৬ই অক্টোবর সদরঘাট থানার দক্ষিণ নালাপাড়ার বাসার সামনে খুন হন নগর ছাত্রলীগের সহ-সমপাদক সুদীপ্ত বিশ্বাস। এ ঘটনায় বড় ভাই ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সমপাদক দিদারুল আলম মাসুমকে ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে আসে পিবিআই। প্রায় দেড় মাস জেল খাটার পর তিনি সমপ্রতি জামিনে মুক্ত হন।
এর আগে নগরের জামালখান, চেরাগী পাহাড়, হেমসেন লেইন, লাভলেইন, নন্দনকানন, এনায়েত বাজার এলাকায় সক্রিয় ছিল দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী অমিত মুহুরীর গ্যাং। নৃশংসভাবে হত্যা, অস্ত্রবাজি, চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধের অভিযোগ রয়েছে এ গ্রুপের বিরুদ্ধে। ২৯শে মে কারাগারে খুন হন অমিত মুহুরী। তার অনুসারীরা যুবলীগ নেতা হেলাল আকবর চৌধুরী বাবরের ছত্রছায়ায় নানা অপরাধে যুক্ত।
নগরের সিআরবি, কদমতলী, আমবাগান, টাইগারপাস এলাকায় সক্রিয় বহিষ্কৃত ছাত্রলীগ নেতা সাইফুল আলম লিমনের গ্যাং। ২০১৩ সালের ২৪ জুন নগরের সিআরবিতে কোটি টাকার টেন্ডার নিয়ে বাবর গ্রুপের সঙ্গে সংঘর্ষে শিশুসহ দু‘জন খুন হয়। এ মামলার আসামি লিমন। তার গ্যাংয়ের সদস্যদের বিরুদ্ধে রেলওয়ের টেন্ডারবাজিসহ নানা সন্ত্রাসী কাজের অভিযোগ রয়েছে।
-মানবজমিন
বার্তাবাজার/ডব্লিওএস