২০০৭ সালে রাজধানীর খিলগাঁও তালতলা মার্কেটের একটি চটপটি দোকানের ৫শ’ টাকার কর্মচারী ছিলেন খিলগাঁও ১নং ওয়ার্ড যুবলীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান খোকন ওরফে ঢালাই খোকন। ক্যাসিনোকাণ্ডে গ্রেফতার ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়ার হাত ধরে যোগ দেন যুবলীগে। হয়ে ওঠেন তার অন্যতম সহযোগী এবং ওই এলাকায় মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি, মার্কেট-ফ্ল্যাট দখল, টর্চার সেলে নির্যাতনসহ সব ধরনের অপকর্মের হোতা। এরপর কয়েক বছরের মধ্যেই কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন খোকন।
খিলগাঁওয়ের আওয়ামী লীগ নেতারা জানান, যুবলীগ নেতা খালেদের ছত্রছায়ায় আসাদুজ্জামান খোকন একের পর এক অপকর্ম করে গেলেও এতদিন কেউ ভয়ে মুখ খুলতে সাহস করেনি। খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া গ্রেফতার হওয়ার পর কেউ কেউ মুখ খুলতে শুরু করেছেন।
আওয়ামী লীগ নেতারা আরও জানান, খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়ার হাত ধরে যুবলীগের রাজনীতিতে যোগ দিয়েই এলাকায় সব অপকর্মের নিয়ন্ত্রণ নেন খোকন। এরপর কয়েক বছরেই কোটি কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন খোকন। খোকনের সব অপকর্মের সহযোগী রমজান হোসেন বাবু, রবিন, জসিম, সাব্বির ও ডন।
খিলগাঁও মডেল কলেজের ছাত্রলীগের সাবেক ভিপি ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা শাখাওয়াত হোসেন আওলাদ বলেন, খোকন মসজিদ মার্কেটের ওপরে বিশাল এক অফিস নিয়ে বসেছেন। মানুষ তার অফিসকে টর্চার সেল হিসেবে চেনে। সেখানে বিভিন্ন ব্যক্তিকে ধরে নিয়ে চাঁদা আদায় ও নির্যাতন তার নিত্যকাজ। কিছুদিন আগেও আমাদের এক ছেলেকে নিয়ে মেরে হাসপাতালে পাঠিয়েছেন। তিনি আরও বলেন, খোকনের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো শতভাগ সত্য। তিনি বাবু ও সাব্বিরকে দিয়ে ফ্ল্যাটে ফ্ল্যাটে মেয়ে ও ইয়াবার ব্যবসা করেন।
খিলগাঁও থানায় খোকনের বিরুদ্ধে মামলা ছাড়াও জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন আওয়ামী লীগ নেতা, ব্যবসায়ীসহ একাধিক ব্যক্তি। এর মধ্যে তিনটি জিডির কপি গণমাধ্যমের হাতে এসেছে। জিডিগুলোতে খোকনের ভয়ে জীবনের নিরাপত্তা চাওয়া হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করে খিলগাঁও এলাকার একাধিক বাসিন্দা জানান, রাজমিস্ত্রির ছেলে খোকন চার বছর আগে যুবলীগের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়ার হয়ে তালতলা মার্কেটের সামনে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের দোকান থেকে চাঁদা উঠানো শুরু করেন। বর্তমানে এসব দোকান থেকে প্রতি মাসে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা চাঁদা উঠান তিনি। খিলগাঁও পুরাতন পাকা মসজিদ মার্কেট দখলে নিয়ে সেখানে টর্চার সেল তৈরি করেছেন খোকন। তার বিরুদ্ধে কেউ কথা বললেই টর্চার সেলে নিয়ে করা হয় নির্যাতন। এই টর্চার সেলেই এলাকার চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের নিয়ে চলে মাদক সেবন ও মাদক ব্যবসা। এলাকার মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণও করেন খোকন। মাদক ব্যবসা ও চাঁদাবাজির টাকার ভাগ তিনি নিয়মিত খালেদকে দিতেন। মাদক বিক্রি নিয়ে রাজীব গ্রুপের সঙ্গে বিভিন্ন সময় মারামারিও হয়েছে খোকনের।
খোকনের বিরুদ্ধে খিলগাঁও চৌরাস্তার কুমিল্লা হোটেলের পাশে ৩৬৮/এ বাড়ির পঞ্চম তলার একটি ফ্ল্যাট দখলের অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে ফ্ল্যাটের মালিক আদালতে মামলা করলে পুলিশ ফ্ল্যাটটি সিলগালা করে দেয়। জানতে চাইলে ফ্ল্যাটের মালিক আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, আমি ফ্ল্যাটটি কেনেছি, কিন্তু আসাদুজ্জামান খোকন দাবি করছেন তিনি ৪৫ লাখ টাকা দিয়ে কিনছেন। আমি অনেক স্যাক্রিফাইস করেছি। কিন্তু কোনো কিছু না হওয়ায় পরে আমি মামলা করেছি। তিনি আরও বলেন, এখানে ডেভেলপার কোম্পানির কারসাজিও রয়েছে।
টর্চার সেলের বিষয়ে নাম প্রকাশ না করে খিলগাঁও তালতলা মার্কেটের ব্যবসায়ীরা জানান, ১৮ সেপ্টেম্বর রাতে খিলগাঁও সিটি কর্পোরেশন সুপার মার্কেটে জুয়েল ও আপেল মিয়ার দোকান দখল করতে যান খোকন ও তার সহযোগীরা। এ সময় তারা আপেল ও জুয়েলকে মারধর শুরু করেন। একপর্যায়ে জুয়েলকে ধরে নিয়ে যান মসজিদ মার্কেটের টর্চার সেলে। খবর পেয়ে পুলিশ জুয়েলকে উদ্ধার করে এবং খোকন ও বাবুকে গ্রেফতার করে। এ ঘটনায় জুয়েলের বাবা বাদী হয়ে খিলগাঁও থানায় মামলা করেন। স্থানীয়রা জানান, পাঁচ দিনের মাথায় খোকন জেল থেকে বের হয়ে মোটর শোভাযাত্রাসহকারে মামলার বাদীর বাড়িতে যান এবং হুমকি-ধমকি দিয়ে আসেন।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে খিলগাঁও থানার ওসি মশিউর রহমান বলেন, খোকন রাজনীতি করে। কমবেশি অপরাধের সঙ্গে জড়িত। এ ধরনের অপরাধ অনেকেই করে। আমলনামা ধরে টান দিলে অনেকে ধরা পড়বে। কিছুদিন আগে খোকনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে জানিয়ে ওসি আরও বলেন, একটি মামলায় তাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। বর্তমানে জামিনে রয়েছে।
তবে এতসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আসাদুজ্জামন খোকন। তিনি বলেন, আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ করা হয়েছে তা মিথ্যা। খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়ার সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক ছিল না। আমরা সম্রাট ভাইয়ের লোক। আমার এলাকায় একটা ফাস্টফুডের দোকান চালাই। খালেদ মাহমুদের সঙ্গে হাস্যোজ্জ্বল ছবি রয়েছে জানালে তিনি বলেন, ছবি থাকতেই পারে। উনি ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। দেখা হলে সালাম দিতাম।
খিলগাঁও থানায় মামলা ও জিডির ব্যাপারে খোকন বলেন, সম্প্রতি শাখাওয়াত হোসেন আওলাদ তার লোক দিয়ে মামলা করিয়েছে। ফ্ল্যাট দখলের ব্যাপারে তিনি বলেন, এটা আমার ফ্ল্যাট। ৩৫ লাখ টাকা দিয়ে কিনেছি। ফাস্টফুডের দোকান দিয়ে কিভাবে ৩৫ লাখ টাকার ফ্ল্যাট ক্রয় করেছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ইট-বালু পাথর সরবরাহের ব্যবসা রয়েছে আমার। ফ্ল্যাটে উঠেছেন কিনা জানতে চাইলে বলেন, কাজ চলছে। ফ্ল্যাট সিলগালা করা আছে জানালে তিনি বলেন, একটু ঝামেলা রয়েছে। ট্যাক্স দেন কিনা জানতে চাইলে বলেন, নিয়মিত কর পরিশোধ করি। কর পরিশোধের ডকুমেন্ট চাইলে তিনি দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
-যুগান্তর
বার্তাবাজার/ডব্লিওএস