১৬, জানুয়ারী, ২০১৯, বুধবার | | ৯ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪০

মা এমনও হয়!

আপডেট: জানুয়ারি ১৪, ২০১৯

মা এমনও হয়!

নিজের দুই মেয়েকে যৌনপল্লিতে বিক্রির অভিযোগ উঠেছে এক নারীর বিরুদ্ধে। এই অভিযোগ তুলেছেন ওই নারীর মা। তিনি বিভিন্ন স্থানে এই অভিযোগ করে কোনো প্রতিকার পাননি। শেষে নাতনিকে ফেরত চেয়ে হাইকোর্টে আবেদন করেছেন তার নানি। আগামী বৃহস্পতিবার এই আবেদনের ওপর শুনানি হবে বলে জানা গেছে। ঘটনাটি ঘটেছে ভারতের দক্ষিণ ২৪ পরগনায়।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এই সময়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রায় ১৬ বছর আগে দক্ষিণ ২৪ পরগনার জয়নগরের বরেন মণ্ডলের (নাম পরিবর্তিত) সঙ্গে বিয়ে হয় স্থানীয় কবিতা হালদারের (নাম পরিবর্তিত)। তাদের দুই মেয়ে হওয়ার পরেই একদিন নিখোঁজ হয়ে যান বরেন। স্বামী নিখোঁজ হওয়ার পর এলাকারই আরেক যুবকের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ওঠে কবিতার। তারপর দুই ও তিন বছরের দুই মেয়েকে নিজের মায়ের কাছে রেখে ওই যুবকের সঙ্গে ঘর ছাড়েন কবিতা। দিল্লিতে গিয়ে তাকে বিয়ে করেন। তার মা সুমনা হালদার (নাম পরিবর্তিত) পরিচারিকার কাজ করেন। দিন চলে অতি কষ্টে।

দুই নাতনির বয়স এখন ১২ ও ১৩ বছর। সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণিতে পড়া দুই বোনের বড়জন বাস্কেট বল খেলায় দক্ষ। অনূর্ধ্ব ১৪ জাতীয় দলে তার সুযোগ পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয় সম্প্রতি। কিন্তু তাতে দরকার জন্ম সনদ। ওই জন্ম সনদ সংগ্রহ করতে গিয়েই ঘটনা অন্য দিকে মোড় নেয়।

নানির অভিযোগ, দুই মেয়েকে রেখে গেলেও তাদের জন্ম সনদ নিয়ে গিয়েছিলেন কবিতা। এ কারণে তাকে ফোন করে নাতনিদের জন্ম সনদ চান তিনি। জন্ম সনদ চাইলে ববিতা মেয়েদের নিয়ে দিল্লিতে তার বাড়িতে আসতে বলেন। এরপর দুই নাতনিকে নিয়ে গত বছর ২৫ ডিসেম্বর কলকাতা থেকে ট্রেনে ওঠেন তিনি। পরে তিনি নাতনিদের নিয়ে দিল্লি যান। একদিন সেই বাড়িতে থাকার পর এক আত্মীয়ের বাড়িতে যাওয়ার কথা বলে মা ও দুই মেয়েকে নিয়ে বের হন কবিতা।

অভিযোগপত্রে নানি সুমনা জানান, দিল্লির কোন বাড়িতে তাদের নিয়ে যাওয়া হয়েছিল-তা তিনি বুঝতে পারেননি। তবে বাড়িটি ছিল ছয়তলা। তার ভাষ্যমতে, ‘সেই বাড়ির একেবারে উপরের তলার একটি ঘরে নিয়ে আমাদের বসানো হয়। তারপর মেয়ে বেরিয়ে যায়। এরই মধ্যে ছয়-সাতজন বিভিন্ন বয়সের লোক ওই ঘরে এসে বসে। তারা দুই নাতনিকে দেখতে থাকে।’

পরিবেশ অন্যরকম বুঝে সুমনা তখন মেয়ের খোঁজ করতেই কিছু সময় পরে ওই ঘরে ফিরে আসে মেয়ে। তিনি নাতনিদের নিয়ে ফিরে যেতে চাইলে এবার মুখ খোলেন কবিতা। তিনি বলেন, ‘দুই মেয়েকে এখানেই বিয়ে দেওয়া হবে।’

ওই বৃদ্ধার অভিযোগ, হিন্দিতে কথা হলেও ১০ লাখ টাকা দেওয়া নিয়ে যে ওই লোকেদের সঙ্গে মেয়ের আলোচনা হচ্ছিল-তা তিনি বুঝেছিলেন। তিনি সব বুঝে সেখান থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করলে তাদের ওই ঘরেই আটকে রাখা হয়। দুজন পাহারায় থাকে। ঘরে থাকা পাহারাদাররা ঘুমে ঢুলে পড়তেই নাতনিদের নিয়ে ভোররাতে কোনো মতে বড় রাস্তায় এসে পড়েন তিনি। সেখান থেকে পৌছান দিল্লি স্টেশনে।

স্টেশনে পৌঁছনোর মুখেই সেই ঘরের দুই পাহারাদার এসে ধরে ফেলে দুই নাতনিসহ বৃদ্ধাকে। কেড়ে নেয় বৃদ্ধার বড় নাতনিকে। কেউ কিছু বোঝার আগেই ওরা চলে যায়। বৃদ্ধা বলেন, ‘ট্রেন থেকে নেমে যে অভিযোগ করব, সেই সাহসও পাইনি। কারণ তখন ছোটটাকে ধরে নিয়ে যায় কি না, সেই আতঙ্কও ছিল।’

ছোট নাতনিকে আঁকড়ে কলকাতায় ফেরেন বৃদ্ধা সুমনা। জয়নগরে ফেরার পর স্থানীয় নেতাদের সঙ্গেই জয়নগর থানায় গিয়ে সব ঘটনা জানান। কিন্তু এখানে কিছু করা যাবে না বলে দায় এড়ায় সবাই। এরই মধ্যে ৫ জানুয়ারি একটি ফোন আসে সুমনার কাছে।

‘দিল্লি পুলিশ থেকে ফোন করছি’ দাবি করে ফোনের অপর প্রান্ত থেকে বলা হয়, তার নাতনিকে তারা পেয়েছে। এক যুবককেও আটক করা হয়েছে। কিন্তু কয়েকদিন আগে দিল্লির গোটা ঘটনাক্রমে আতঙ্কিত ওই বৃদ্ধা তাদের জয়নগর থানায় ফোন করার পরামর্শ দেন। তার ভাষ্য, ‘আসলে ফোন কে করেছে তাই তো বুঝতে পারছি না। তাই পুলিশের সঙ্গ ছাড়া আর দিল্লি যাওয়ার ভরসা পাইনি।’

সুমনার আইনজীবী ইন্দ্রজিৎ রায় চৌধুরী বলেন, ‘পুলিশের দিক থেকে কোনো সাহায্য না পাওয়ায় ৭ জানুয়ারি বৃদ্ধার পক্ষে স্থানীয় থানা, পুলিশ সুপার, জেলা শাসক, সিআইডি থেকে শুরু করে স্বরাষ্ট্র সচিব পর্যন্ত সর্বত্র চিঠি দিয়ে গোটা ঘটনা জানিয়ে সাহায্য চাওয়া হয়। কিন্তু সাহায্য তো দূরের কথা, চিঠির প্রাপ্তিস্বীকার পর্যন্ত করা হয়নি। তাই প্রতিকারের আশায় শেষ পর্যন্ত হাইকোর্টে মামলা দায়ের করা হয়েছে। সম্ভবত আগামী বৃহস্পতিবার বিচারপতি জয়মাল্য বাগচির এজলাসে মামলাটি শুনানি হবে।

জয়নগর থানার এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘যেখানকার ঘটনা সেখানেই অভিযোগ জানানো উচিত।’ যদিও গোটা বিষয়টি শোনার পরে ওই অফিসারের জানান, থানায় এমন অভিযোগ নিয়ে কেউ আসেননি। এবার এলে অবশ্যই বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।