মতিঝিল ক্লাবপাড়ায় ক্যাসিনো ডন হিসেবে খ্যাত লোকমান হোসেন ভূঁইয়া একসময় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নিরাপত্তাপ্রধান ছিলেন। ১৯৯৬ সালে বিএনপি বিরোধী দলে থাকতে ওই দায়িত্ব পালন করতেন তিনি।
ক্যাসিনোকাণ্ডে গ্রেপ্তার লোকমানকে নিয়ে ক্লাবপাড়ায় চাউর আছে, সরকার বদল হলেও লোকমানের ক্ষমতার বদল হয়নি। ১৯৯১ সালের দিকে মোসাদ্দেক আলী ফালুর হাত ধরে ক্লাবজগতে প্রবেশ লোকমান হোসেনের। ক্ষমতার পরিবর্তনে ক্লাবপাড়া থেকে ফালু বিতাড়িত হলেও টিকে যান লোকমান।
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ক্রীড়াজগতের এক প্রভাবশালীর আশীর্বাদে আরো ক্ষমতাবান হয়ে ওঠেন লোকমান। বর্তমানে তিনি মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের ডিরেক্টর ইনচার্জ, বিসিবির পরিচালক ও ক্রিকেট বোর্ডের ফ্যাসিলিটি কমিটির চেয়ারম্যান।
হাওয়া ভবন ঘনিষ্ঠ বিএনপির লোক হয়েও আওয়ামী লীগের ওই প্রভাবশালী নেতার প্রশ্রয়ে লোকমান আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য সাবেক ফুটবলার সালাম মুর্শেদী ও সাবেক ফুটবলার বাদল রায়কে মোহামেডান ক্লাব ছাড়তে বাধ্য করেন।
আড়াই বছর আগে ঢাকা দক্ষিণ যুবলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোমিনুল হক সাঈদের সহায়তায় মোহামেডান ক্লাবে ক্যাসিনো সংযোজন করেন লোকমান। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মোহামেডান ক্লাবের একজন নির্বাহী সদস্য গতকাল বৃহস্পতিবার বলেন, ‘ক্যাসিনো থেকে প্রতিদিন এক থেকে দেড় কোটি টাকা আয় হলেও গত আড়াই বছরে লোকমান ক্লাব তহবিলে জমা দিয়েছেন মাত্র ৫১ লাখ ৪০ হাজার টাকা। এর মধ্যে খরচ দেখিয়েছেন ৩৫ লাখ টাকা।’ তিনি আরো বলেন, ‘যুবলীগ নেতাদের চাঁদা দেওয়ার পরও প্রতিদিন অন্তত অর্ধকোটি টাকা লোকমানের হাতে থাকার কথা। ক্লাবে একটি খাতা ছিল। ওই খাতায় পুলিশসহ কোন কোন নেতাকে কী পরিমাণ চাঁদা দেওয়া হতো তা লেখা ছিল। অভিযানের পর খাতাটি আর ক্লাবে পাওয়া যায়নি।’
র্যাব-২-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট আশিক বিল্লাহ গতকাল গণমাধ্যমকে জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে লোকমান হোসেন স্বীকার করেছেন, ক্যাসিনো থেকে তিনি ৪১ কোটি টাকা আয় করেছেন। ওই টাকা অস্ট্রেলিয়ার কমনওয়েলথ ও এএনজেড ব্যাংকে রাখা হয়েছে। লোকমান হোসেনের ছেলে অস্ট্রেলিয়ায় লেখাপড়া করেন; সেই সুবাধে তিনি মাঝেমধ্যে সেখানেও যান বলে র্যাবকে বলেছেন।
লোকমান হোসেনের গ্রামের বাড়ি লক্ষ্মীপুর জেলার রামগঞ্জ উপজেলার ভোলাকোট ইউনিয়নের উদয়পুর গ্রামে। গ্রামে লোকমানের তিনতলা একটি আলিশান ভবন রয়েছে। তবে তিনি গ্রামে তেমন যান না। ঢাকার মনিপুরীপাড়ায় নিজস্ব বাড়িতে বসবাস করেন তিনি। হাওয়া ভবনঘনিষ্ঠ আলোচিত-সমালোচিত ব্যবসায়ী আমিন আহমেদ ভূঁইয়া তাঁর চাচাতো ভাই। তাঁর মাধ্যমেই হাওয়া ভবন ও খালেদা জিয়ার ঘনিষ্ঠ হন লোকমান। খালেদা জিয়ার নিরাপত্তার বিষয়াদি দেখভালের সুযোগে বিএনপির উচ্চপর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে তাঁর। একসময় ঘনিষ্ঠ হন মোসাদ্দেক আলী ফালুর। তাঁর মাধ্যমেই ১৯৯১ সালে ব্রাদার্স ইউনিয়নের একজন সংগঠক হিসেবে ক্রীড়াজগতে তাঁর অভিষেক। পরে ১৯৯২ সালে ব্রাদার্স ছেড়ে যোগ দেন মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবে। ওই সময় মোসাদ্দেক আলী ফালু ছিলেন মোহামেডান ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক। ফালু ক্লাব কমিটির সভাপতি হলে সাধারণ সম্পাদক করেন বিশ্বস্ত লোকমান হোসেনকে। এ সুযোগে ফালুকে দিয়ে মোহামেডান ক্লাবকে লিমিটেড কম্পানি করেন লোকমান। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর মোহামেডান থেকে বিতাড়িত হন ফালু। কিন্তু সাধারণ সম্পাদক হিসেবে টিকে যান লোকমান। এভাবে মূলত ২০০৮ সালের পর থেকে মোহামেডান ক্লাবের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠেন লোকমান।
অন্যদিকে ২০০১ সালে মোসাদ্দেক আলী ফালু যখন সংসদ সদস্য, তখন একদিন তাঁর সঙ্গে সংসদে যান লোকমান হোসেন। ওই দিন তিনি সংসদ লবিতে বঙ্গবন্ধুর ছবি ভাঙচুর করেন।
লোকমান হোসেনের গ্রাম উদয়পুরে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সেখানে তাঁর ভবনটি নির্মাণ করা হয় ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় থাকার সময়। লোকমান হোসেনের ঘনিষ্ঠ মনিপুরীপাড়ার এক বিএনপিকর্মী জানান, লোকমানের মনিপুরীপাড়ায় চারতলা বাড়িটিও বিএনপি আমলে কেনা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, ‘লোকমানের বিরুদ্ধে ক্যাসিনো থেকে আয়ের অর্থ লন্ডনে তারেক রহমানের কাছে পাঠানোর খবর রয়েছে। এ বিষয়ে লোকমানকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।’
নাম না প্রকাশ করে বিএনপির একজন ভাইস চেয়ারম্যান বলেন, ‘মিয়া নুরুদ্দীন অপুর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা রয়েছে লোকমান হোসেনের। একাদশ নির্বাচনের সময় মতিঝিল এলাকার যে ভবন থেকে অপুর বিপুল টাকা উদ্ধার করে গোয়েন্দা সংস্থা, ওই ভবনে লোকমান হোসেনেরও একটি ব্যক্তিগত কার্যালয় ছিল। ঢাকা উদ্ধারের পর তিনি কার্যালয়টি বন্ধ করে দেন।
সূত্র: কালের কণ্ঠ
বার্তাবাজার/কে.জে.পি