জি কে শামীমের আসল ক্যাশিয়ার এখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারিতে। নাম তার মুমিতুর। পুরো নাম মুমিতুর রহমান। পদবি সিনিয়র সহকারী প্রধান। অফিস করেন মন্ত্রণালয়ের ছোট কক্ষে। কিন্তু কাজ তার ছোট নয়, আসল কাজ বড় বড় দাও মারা। একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার সমর্থন নিয়ে তিনি হয়ে উঠেছেন খুবই বেপরোয়া। তাই গৃহায়ন ও পূর্ত মন্ত্রণালয়ে যোগদানের রেকর্ড চার বছর হলেও প্রায় তিন বছর থেকে তার দাপটে সবাই অস্থির। কাঁড়ি কাঁড়ি টাকার গরমে ধারে-কাছে অন্যদের ভেড়া দায়। মোটা অঙ্কের ঘুষ লেনদেনের ক্রীড়নক হিসেবে তিনি তারকা ঠিকাদার জি কে শামীমের সব কাজ বাগিয়ে দিতেন। বিনিময়ে পেতেন বস্তাভর্তি কমিশন। যার ভাগ আরও কিছু প্রভাবশালী মহলে সময়মতো পৌঁছে দিতেন। তবে রাজকীয় এই ঘুষ লেনদেনের সাক্ষী মুমিতুরের জীবনযাপনের চিত্রও বদলে গেছে ঘটা করে। যেন কয়েক বছরের ব্যবধানে তিনি আলাদীনের চেরাগ পাওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছেন। নিজে থাকেন বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে। কিনেছেন আরও কয়েকটি ফ্ল্যাট। এত টাকা রাখবেন কোথায়, তাই আবাসন কোম্পানি খুলে রাতারাতি ধনাঢ্য ব্যবসায়ীর খাতায় নাম লিখিয়েছেন। শখের বশে গড়ে তুলেছেন বিশাল গরুর খামার। র্যাবের হাতে আটক জি কে শামীমের রিমান্ডের তৃতীয় দিনে এ রকম বহু ঘুষ কমিশনখোকো প্রভাবশালীদের চাঞ্চল্যকর ফিরিস্তি একে একে বেরিয়ে আসছে।
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে গৃহায়ন ও পূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. শহীদ উল্লা খন্দকার সোমবার গণমাধ্যমকে বলেন, ‘মুমিতুর রহমানের বিরুদ্ধে কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
এদিকে অভিযোগের বিষয়ে জানতে মন্ত্রণালয়ের দফতরে গিয়ে মুমিতুর রহমানকে পাওয়া যায়নি। পরে তার মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন কল রিসিভ করেননি।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে মুখ খুলতে শুরু করেছেন ‘টেন্ডার কিং’খ্যাত ঠিকাদার জি কে শামীম। তিনি এরই মধ্যে পূর্ত মন্ত্রণালয়ে কর্মরত বেশ কয়েকজন পদস্থ কর্মকর্তার নামও বলেছেন। যারা মোটা অঙ্কের কমিশনের বিনিময়ে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় শামীমকে অবৈধ পথে বিশেষ সুবিধা পাইয়ে দিতেন। এছাড়া জি কে শামীমের পক্ষে মন্ত্রণালয়ের উচ্চ পদের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাও বিভিন্ন টেন্ডার সংক্রান্ত ফাইল দেখভাল করতেন। বিভিন্ন পর্যায়ে দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা ছিল তার হাতের মুঠোয়। তিনি বেশ কয়েকজন ঠিকাদার ও তদবিরবাজের সমন্বয়ে পূর্ত মন্ত্রণালয়ে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন।
সূত্র জানায়, পূর্ত মন্ত্রণালয়ে যেসব প্রভাবশালী কর্মকর্তা জি কে শামীমের হয়ে কাজ করতেন তাদের অন্যতম হলেন পরিকল্পনা শাখার কর্মকর্তা মুমিতুর রহমান ও সাজ্জাদ। এছাড়া জিয়া ও নাঈম নামের দুই প্রভাবশালী জি কে সিন্ডিকেটের প্রভাবশালী সদস্য।
পূর্ত মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা মুমিতুর রহমান ও সাজ্জাদ ঠিকাদার শামীমের পক্ষে বিভিন্ন ফাইলে তদবির করেন। এছাড়া দরপত্র আহ্বান থেকে শুরু করে বড় কর্তার টেবিলে ঘুষের প্রস্তাব দেয়ার কাজটিও মূলত তারাই করেন। নিজের গোপনীয় ও বিশেষ কাজে সাজ্জাদ মুমিতুরকে রাখার অন্যতম কারণ হল- মন্ত্রণালয়ের বড় কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের হট কানেকশন। ফলে এ চেক্রের মাধ্যমে অনেক কাজই সহজে বাগিয়ে নিতে পারতেন জি কে শামীম। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে পূর্ত মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা মুমিতুর রহমানের নাম উঠে আসার পর এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করো হয়।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, মাত্র চার বছর আগে তিনি পূর্ত মন্ত্রণালয়ে যোগ দেন। পরিকল্পনা শাখায় কাজ করলেও তিনি উন্নয়ন শাখার বিভিন্ন কাজের দেখাশোনা করেন। এই মন্ত্রণালয়ের অধীন সব উন্নয়ন প্রকল্প সংশ্লিষ্ট ফাইল আসে তার টেবিলে। উন্নয়ন কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকায় অবৈধ অর্থ আয়ের অবারিত সুযোগ তার কাছে সবসময় হাতছানি দিত। অবশ্য যার পুরোপুরি সদ্ব্যবহার করতে তিনি কোনো কার্পণ্য করেননি। যদিও এখন যে কোনোদিন তাকেসহ তার সহযোগীদের জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি করা হতে পারে।
সূত্র বলছে, অফিস শেষে প্রায় প্রতিদিনই তিনি জি কে শামীমের নিকেতনের অফিসে যেতেন। সেখানে গভীর রাত পর্যন্ত থাকতেন তিনি। মাঝেমধ্যে মুমিতুর রহমানের সঙ্গে মন্ত্রণালয়ের আরেক কর্মকর্তা সাজ্জাদকে দেখা যায়। ঠিকাদারের সঙ্গে এমন দহরম-মহরমের কারণে মুমিতুর রহমানের নামে দুর্নীতির অভিযোগও জমা পড়ে। মন্ত্রণালয়ে কয়েক দফা বেনামি চিঠিও আসে। কিন্তু উপর মহলে যোগাযোগ থাকায় কোনো কিছুই কাজে আসেনি। উড়ো চিঠির অভিযোগ সত্য হলেও তা কেউ আমলে নেয়নি।
সূত্র বলছে, মুমিতুর রহমান শুধু জি কে শামীম নয়, পূর্ত মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন কাজে ঘুষ বাণিজ্য করেন। অনেক ঠিকাদারের কাছে শুধু নগদ টাকা নয়, বিদেশি মুদ্রায় ঘুষ নেন তিনি। বিদেশে যাওয়ার কথা বলে ঠিকাদারদের কাছে মোটা অঙ্কের ডলার নেন। জনৈক প্রভাবশালী জিয়া ও নাইমের সঙ্গে মুমিতুর রহমানের ঘনিষ্ঠতা পূর্ত মন্ত্রণালয়ে অনেকটাই ওপেন সিক্রেট। মন্ত্রণালয়ে যে কোনো কঠিন কাজ এই সিন্ডিকেটের হাতে পড়লে জলের মতো সহজ হয়ে যায়। এর উদাহরণও আছে ভূরি ভূরি। যদিও বর্তমান মন্ত্রীর আমলে এখনও তারা সেভাবে সুবিধা করতে পারছেন না। মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম দুর্নীতির বিরুদ্ধে শুরু থেকেই একজন খোলামেলা সোচ্চার ব্যক্তি। যে কারণে চক্রটি ভিন্নপথে কাজ হাসিলে সক্রিয়।
সূত্র বলছে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে ২০১৭ সালেই দুর্নীতির অভিযোগ উঠলেও মুমিতুর রহমান তা ধামাচাপা দেন। কিন্তু গত বছর বালিশ-কাণ্ড প্রকাশ হয়ে পড়লে দেশজুড়ে তোলপাড় হয়। এই বালিশ-কাণ্ডের মূল হোতা মূলত জি কে শামীম। কারণ একটি বিশেষ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে শতকোটি টাকার কমিশন বাণিজ্য হয়। সাজিন ট্রেডার্স, পায়েল ও হাসান অ্যান্ড সন্স নামের তিনটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অবিশ্বাস্য মূল্যে গৃহস্থালি সরঞ্জাম সরবরাহ করে।
সূত্র বলছে, বালিশ-কাণ্ড প্রকাশিত হওয়ার পর জি কের প্রতিষ্ঠান জি কে বিপিএলকে রক্ষায় মরিয়া হয়ে উঠেন মুমিতুর রহমান। একপর্যায়ে তিনি সফলও হন। ফলে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে দেখা যায়, অন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোয় অভিযুক্ত করা হলেও জি কে প্রতিষ্ঠান দায়মুক্তি পায়। এমনকি প্রতিবেদনে জি কের প্রতিষ্ঠানের ভূয়সী প্রশংসা করে প্রতিবেদন দেয়া হয়।
সূত্র বলছে, গত বছর তিনটি ভবন হস্তান্তর করা হয়। আর ৬টি ভবন হস্তান্তরের পথে। এ ছয়টি ভবনেই মূলত ব্যাপক দুর্নীতি হয়, যা যৌথ উদ্যোগে নির্মাণ করে জি কে শামীমের প্রতিষ্ঠান জি কে বিপিএল। এই ৬টি ভবনে বালিশ-চাদরসহ ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী সরবরাহে ব্যাপক অনিয়ম হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঠিকাদার গণমাধ্যমকে বলেন, রূপপুরে জি কে শামীমের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বালিশ-কাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত আরেক প্রতিষ্ঠান পায়েল। যার মালিক মিনারুল চাকলাদার। তবে ২০১৮ সালেই এ প্রকল্পে ভয়াবহ দুর্নীতির তথ্য প্রকাশিত হলেও জি কে শামীমের সহায়তায় মুমিতুর রহমান সিন্ডিকেট তা বিশেষ কৌশলে ধামাচাপা দেয়।
সূত্র বলছে, জি কে শামীমকে অভিনব কৌশলে সুবিধা পাইয়ে দিত পর্দার আড়ালে থাকা একটি চক্র। টেন্ডার পাওয়ার পর ১০ শতাংশ কাজ করে দীর্ঘদিন কাজ ফেলে রাখতেন শামীম। এরপর কয়েক দফা বাড়িয়ে নেয়া হতো টেন্ডারমূল্য। দাফতরিক ভাষায় এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ভেরিয়েশন। জি কে শামীমের প্রতিটি কাজে শত শত কোটি টাকার ভেরিয়েশন হয়। যার ভাগ পান প্রভাবশালী কর্মকর্তারা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পূর্ত মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে বলেন, জাতীয় রাজস্ববোর্ড ভবন নির্মাণে ভেরিয়েশনের নামে এমন দুর্নীতি হয়। মাত্র ৮০ কোটি টাকার এই ভবন নির্মাণের ব্যয় কয়েক দফা বাড়িয়ে ৩৫০ কোটিতে নিয়ে যাওয়া হয়। বাড়তি এই টাকার বড় অংশ দুর্নীতিবাজরা নিজেদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করে নেন। শুধু ভেরিয়েশন করে নয়, টেন্ডার পেলেই দুর্নীতি করার অবারিত সুযোগের কারণে ঢাকার বাইরের বড় বড় অনেক কাজের টেন্ডার স্থানীয়ভাবে না ডেকে ঢাকায় করা হয়। চট্টগ্রামের অনেক টেন্ডার ডাকা হয় ঢাকায়। এমনকি রাঙ্গামাটির টেন্ডারও ঢাকা থেকে আহ্বান করা হয়। গণপূর্তের সাবেক চিফ ইঞ্জিনিয়ার রফিকুল ইসলামের সঙ্গে হাত মিলিয়ে এভাবে অনেক টেন্ডার জি কে শামীম হাতিয়ে নিতেন।
সূত্র বলছে, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় এমন জাল-জালিয়াতির আড়ালে মোটা অঙ্কের ঘুষ লেনদেন হয়। কিন্তু ঘুষের কারবার কখনও বাকিতে বা চেকের মাধ্যমে হয় না। সবই করতে হয় নগদে। এ কারণে জি কে শামীম তার অফিসেই সব সময় কয়েক কোটি টাকা নগদ জমা রাখতেন। যখনই প্রয়োজন হতো নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনী দিয়ে তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার পছন্দের জায়গায় ঘুষের টাকা পৌঁছে দিতেন।
-সূত্রঃ যুগান্তর
বার্তাবাজার/ডব্লিওএস