১৮, জানুয়ারী, ২০১৯, শুক্রবার | | ১১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪০

লক্ষ্য যদি থাকে অন্ধকার, কোনদিন আলোর দেখা মিলবে না!

আপডেট: জানুয়ারি ৩, ২০১৯

লক্ষ্য যদি থাকে অন্ধকার, কোনদিন আলোর দেখা মিলবে না!

আমরা ছোটবেলায় জীবনের লক্ষ্য (Aim of my life) রচনা লিখেছি। কেউ ডাক্তার হতে চাই ,কেউ ইঞ্জিনিয়ার হতে চাই, কেননা বইয়ে এটাই লেখা ছিল কিন্তু আমরা এর বাইরে কেউ জীবনের লক্ষ্য ঠিক করতে পারিনি। শুধুমাত্র নচিকেতা তার গানে প্রকাশ করেছিল যে সে ভবঘুরে হতে চায় এটাই তার অ্যাম্বিশন।

আসলে আমরা আমাদের জীবনে লক্ষ্য নিজেরা ঠিক করিনি। আমাদের জীবনের লক্ষ্য ঠিক করেছে আমাদের বাবা-মা। বাবা-মা আমাদেরকে বলেছেন বড় হতে হবে কিন্তু কত বড় হতে হবে এবং কি হতে হবে তা কিন্তু তারা সুস্পষ্ট করতে পারে নাই।

কেউ বলেছে আমাদেরকে ডাক্তার হতে হবে কেউ বলেছে আমাদেরকে ইঞ্জিনিয়ার হতে হবে কেউবা বলেছে আমাদেরকে মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে, ব্যাংকে চাকরি করতে হবে । কারণ হচ্ছে এসকল প্রফেশনে মোটা অঙ্কের বেতন পাওয়া যায় এবং তাদের ধারণা বেশি পয়সা পেলেই তাদের সন্তান সুখে থাকবে।

কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে ভিন্ন, মানুষের জীবনে সুখ আর শান্তি মধ্যে অনেক পার্থক্য আছে। এ কথা অস্বীকার করার কোন উপায় নাই যে অর্থ আপনাকে সব ধরনের শান্তি দিতে পারে না, অর্থ সুখ দিতে পারে আরাম দিতে পারে কিন্তু প্রশান্তি সৃষ্টি করতে পারে না। আর এই অর্থের পেছনে ছোটার যে প্রবণতা, এই প্রবণতা সৃষ্টি করেছে আমাদের বর্তমান মিডিয়া । মিডিয়া আমাদের যে দৃষ্টিভঙ্গি এনে দিয়েছে তা হল সৌন্দর্য আর টাকা।

যে কারণে আমরা ছোট থেকেই ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার হতে চাইতাম কেননা এ সকল পেশায় বেতন অনেক, রাতারাতি গাড়ি বাড়ি করা যায়। একটু ভাবুন তো একজন ডাক্তার ডাক্তার হতে চায় কারণ তিনি বেশি পয়সা অর্জন করতে পারবেন যদি মানুষ জটিল জটিল রোগে আক্রান্ত হয়। রোগ নাই তো ব্যবসা নাই।

যদি আজকে এমন হয় যে,রোগমুক্তির জন্য অল্টারনেটিভ মেডিসিন হিসেবে ফুড সাপ্লিমেন্ট বা অন্য প্রাকৃতিক পদ্ধতি আবিষ্কার হয় তাহলে ডাক্তারের চেম্বার এ রোগী যাওয়ার প্রবণতা কমে যাবে, ফলে ডাক্তারি পেশা মন্দ হবে তখন আর ছাত্র ছাত্রীরা তাদের জীবনের লক্ষ্য হিসেবে ডাক্তার পেশাকে বেছে নেবে না। বাবা মাও তাদের সন্তান কে ডাক্তার বানানোর জন্য উঠে পড়ে লাগবে না ।

আসলে সত্যিকার অর্থে যখন একজন মানুষ কাজকে ভালোবাসে তখন কাজই হয়ে ওঠে তার অনুপ্রেরণার উৎস। তখন সে যে পেশাতেই নিজেকে নিয়োগ করুক না কেন সেই পেশা যদি তার ভাল লাগার হয়, সেটা ডাক্তার হোক , ইঞ্জিনিয়ার হোক বা অন্য যে কোন পেশা, সে তখন উৎকর্ষতার চরম মাত্রায় উপনীত হয়।

আর তার জীবনের লক্ষ্য যদি অন্য কেউ ঠিক করে দেয় তাহলে সে সার্টিফিকেটধারী ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হয় কিন্তু বাস্তবে তার দ্বারা সমাজ এবং মানুষ কোন উপকৃত হয় না।

আমাদের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি অনেকাংশেই মিডিয়া ঠিক করে যেমন আমাদের দেশে সাধারণভাবে ধারণা হলো ফর্সা মেয়ে মানেই হচ্ছে সুন্দরী মেয়ে কিন্তু বাস্তবতা কি তাই? গায়ের রং একই সৌন্দর্য যেখানে বিধাতার ছাড়া আর কারো কোন হাত নাই ।এমনটাই যদি হত তাহলে আফ্রিকার নিগ্রো জাতির মধ্যে কি কোনো সৌন্দর্য নাই কিন্তু তারা তো তাদের সেই কালো মেয়ের মধ্যেই সৌন্দর্য কে খুঁজে পায় ।

এমন কি মিস ওয়ার্ল্ড প্রতিযোগিতায় কয়েকবার এই আফ্রিকান কালো মেয়েদের মধ্যেই বিশ্বসুন্দরী নির্বাচিত হয়েছে কিন্তু আমাদের মধ্যে বদ্ধমূল ধারণা ফর্সা বা সাদা মানেই হচ্ছে সুন্দরী এবং সে অর্থে শ্বেত রোগীকে অপূর্ব সুন্দরী বলা যেতে পারে।

আসলে আমরা আমাদের ভালো লাগা কাজকে জীবনের লক্ষ্য করতে পারি না, না পারার কারণে আমরা আমাদের পেশায় সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারি না।

অন্যরা আমাদের জীবনে যে লক্ষ্য ঠিক করে দেয় তা আসলে এক ধরনের আসক্তি। এবং তারা আমাদের জন্য যে লক্ষ্য ঠিক করে তা বর্তমান প্রেক্ষাপট এবং তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই করে। এবং তা আরো ১০ জনের কাছ থেকে ধার নেওয়া।যে কারণে অনেক সময় আমরা লক্ষ্যে পৌঁছানোর পরও হতাশ হই, না পৌঁছাতে পারলে ভেঙে পড়ি।

যদি ভালো ভাবে দেখেন আজকে যারা সফল ব্যক্তি যারা বিএমডব্লিউ, মার্সিডিজ চড়ছেন তারা তারা কি সবাই আনন্দ নিয়ে চড়ছেন ? কতজন এই গাড়িটি খুব আনন্দ নিয়ে চলছেন? তারা তো তাদের স্বপ্নের গাড়িটি পেয়েছেন! প্রকৃতপক্ষে দু-চারজন ছাড়া সকলেই বিষন্নতা ও হতাশায় ভুগছেন যে কারণে জাপানে হারিকিরি এত বেড়েছে, হারিকিরি হচ্ছে আত্মহত্যার একটি প্রক্রিয়া।

আসলে যে কাজ আপনার ভাল লাগে, যে কাজে আপনি নিজেকে উৎসর্গ করতে পারেন সে কাজই হওয়া উচিত আপনার জীবনের লক্ষ্য। তা সেটা গান হোক রাজনীতি হোক ,খেলাধুলা হোক ,ব্যবসা-বাণিজ্য হোক ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার যে কোন কিছু। একমাত্র তখনই আপনি নিজেকে কাজের মধ্যে ডুবিয়ে দিতে পারবেন।

তখন আপনি হয়ে উঠবেন কালজয়ী বিজ্ঞানী, যুগশ্রেষ্ঠ লেখক, জাতীয় অধ্যাপক, সমাজসেবক, স্বনামধন্য ইঞ্জিনিয়ার বা বিশ্বসেরা ডাক্তার।

আবির হোসেন
সহকারী ব্যবস্থাপক
এসএমই ফাউন্ডেশন