টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলায় বাল্য বিবাহ। চলতি বছরের ৮ মাসে উপজেলায় ৫’শ ছয় জন মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থী বাল্য বিবাহের শিকার হয়েছে। যাদের সবার বয়স ১২-১৪ বছরের মধ্যে।
উপজেলায় ৬১ টি মাধ্যমিক ও নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং ৩২ টি দাখিল মাদ্রাসা রয়েছে। এর মধ্যে ৩ টি বালক, বিয়ে হয়নি ৭টি প্রতিষ্ঠানে ও তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানায় ২২ টি প্রতিষ্ঠান। স্কুল ও মাদ্রাসা মিলে সর্বমোট ৬১টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অনুসন্ধান চালিয়ে শিক্ষার্থী ও প্রধান শিক্ষকদের দেওয়া তথ্যানুসারে এ হিসাব পাওয়া যায়।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, এ বছর জানুয়ারি থেকে আগস্ট মাসে ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে ২৭ জন, ৭ম শ্রেণীতে ৬১ জন, ৮ম শ্রেণীতে ১১৭ জন, ৯ম শ্রেণীতে ১৪৩ জন ও ১০ম শ্রেণীতে ১৬০ জন। ৮ মাসে মোট ৫’শ ছয় জন শিক্ষার্থীর বিয়ে হয়েছে।
গড়ে প্রতি মাসে প্রায় ৬৪ জনের বিয়ে হয়েছে। অথচ গত মাসিক সমন্বয় সভা ও আইন শৃংখলা সভায় উপজেলায় বাল্য বিবাহ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে এমন দাবি করে অনেকেই বক্তব্য রেখেছেন। ইউএনও অফিস সূত্রে জানা যায়, এই সময়ের মধ্যে উপজেলা প্রশাসন বিভিন্ন সময় বাল্য বিবাহ বন্ধ করেছে মাত্র ১২ টি।
২০১৬ সালে এ উপজেলাকে বাল্য বিবাহ মুক্ত উপজেলা ঘোষণা করা হলেও তা রয়েছে শুধু কাগজে কলমে। অধিকাংশ স্কুল ও মাদ্রাসায় ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে যে পরিমান ছাত্রী ভর্তি হয় ১০ শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া চালিয়ে এর যেতে অর্ধেকের বেশিই নাই হয়ে যায় শুধুমাত্র বাল্য বিবাহের কারণে। উপজেলায় একটি পৌরসভা ও ১৪টি ইউনিয়ন রয়েছে।
পৌরসভা ও প্রতিটি ইউনিয়ন ভিত্তিক প্রতিষ্ঠানে আট মাসে বাল্য বিয়ে সংগঠিত হওয়ার সংখ্যা- ঘাটাইল পৌরসভায় ১৬, দেওলাবাড়ি ইউপিতে ৬০, ঘাটাইল সদর ইউপিতে ২, জামুরিয়া ইউপিতে ৪৫, আনেহলা ইউপিতে ২৬, লোকেরপাড়া ১৪, ইউপিতে দিঘলকান্দি ইউপিতে ৩৩, দিগড় ইউপিতে ৩৭, দেওপাড়া ইউপিতে ২৯, ধলাপাড়া ইউপিতে ৪২, সাগরদীঘি ইউপিতে ৫১, লক্ষিন্দর ইউপিতে ৪২, রসুলপুর ইউপিতে ৪৭, সন্ধানপুর ইউপিতে ২৬, সংগ্রামপুর ইউপিতে ৩৬ জন। উপজেলা প্রসাশন সুত্রে আরো জানা যায়, আট মাসে বাল্য বিবাহ বন্ধ নিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ উপজেলার বিভিন্ন স্থানে আলোচনা হয়েছে ২৪ বার।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে করা হয়েছে মা ও অভিভাবক সমাবেশ। তার পরও থামছে না বাল্য বিবাহ। নিকাহ রেজিস্টেশনে সরকারের পক্ষ থেকে এ সংক্রান্ত বিষয়ে কাজীদের যে বিধি নিষেধ বা আইন রয়েছে তার বিন্দুমাত্র মানতে দেখা যাচ্ছে না। নাম প্রকাশ না করার শর্তে শিক্ষকরা জানান, মেধাবী ও দেখতে সুন্দরী এমন মেয়ে গুলোই বেশী বাল্য বিবাহের বলি হচ্ছে। অভিভাবকরা গোপনে এ কাজ সেরে ফেলেন। অনেক অভিভাবক নিজ বাড়িতে বিয়ের কাজ না করে আত্নীয় -স্বজনের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দেন।
যা আমরা জানতে পারি প্রায় সপ্তাহখানিক পর। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ক’য়েক জন অভিভাবক বলেন, মেয়ে বড় হওয়ার সাথে সাথে বাবাদের দুঃচিন্তাও বড় হতে থাকে। স্কুল ও মাদ্রাসায় পাঠিয়ে আমরা ভয়ে থাকি কখন কি হয়। অনেক বখাটে ছেলে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকে। মান সন্তানের কথা ভেবে বিয়ে দিয়ে দেই।
অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, যে সকল শিশু শিক্ষার্থীরা বাল্য বিয়ের শিকার হয়েছে তাদের বড় একটা অংশের স্বামী প্রবাসী। প্রবাস থেকে দু’তিন মাসের ছুটি নিয়ে এসে বিয়ে করে আবার চলে যায় প্রবাসে। এর ফলে পারিবারিক কলহ ও পরকিয়ায় জরিয়ে পরে ভেঙ্গে যাচ্ছে অনেকের সংসার।
অনেকেই শ্বশুর বাড়ি ছেড়ে মাসের পর মাস থেকে যাচ্ছে বাবার বাড়িতে। ধর্মীয় কুসংস্কার ও স্কুলে যাওয়া আসার পথ নিরাপদ না থাকায় অনেক অভিভাবকরা তাদের কন্যাদের বিয়ে দিয়ে অনেকটাই দায় মুক্ত হচ্ছেন।
এ বিষয়ে কবি, লেখক ও গবেষক জুলফিকার হায়দার বলেন, আমাদের সমাজ এখনো সেই ঊনবিংশ শতকেই পরে আছে। তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়নি। ধর্মীয় কুসংস্কার থেকে মানুষ এখনো বের হয়ে আসতে পারেনি। যার কারণে বাল্য বিবাহ কমছে না।
ধলাপাড়া ইউপি চেয়ারম্যান এজহারুল ইসলাম বলেন, বাল্য বিবাহের কুফল বলেও রোধ করা যাচ্ছে না। অভিভাবরা আমাদের কথা শুনতে চায়না। উপজেলা কাজী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবু তাহের বলেন, আমরা কোনো বাল্য বিবাহের নিকাহ রেজিস্টেশন করি না। জন্মনিবন্ধন দেখে তারপর নিকাহ রেজিস্টেশন করি।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ কামরুল ইসলাম বলেন, আমরা প্রতিনিয়ত বাল্য বিবাহ বন্ধে নানা রকম প্রচার প্রচারনা চালাচ্ছি। সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে।
বার্তাবাজার/কেএ