১৫, অক্টোবর, ২০১৮, সোমবার | | ৪ সফর ১৪৪০

এবার মুম্বাইয়ে বাংলাদেশি খোঁজার ডাক

আপডেট: October 13, 2018

এবার মুম্বাইয়ে বাংলাদেশি খোঁজার ডাক

ভারতের আসাম রাজ্যে জাতীয় নাগরিকপঞ্জী বা এনআরসি নিয়ে তুমুল বিতর্কের মধ্যেই দেশের আরও নানা প্রান্তে অবৈধ বিদেশিদের শনাক্ত করার দাবি তুলছে দেশটিন ক্ষমতাসীন দল বিজেপিসহ নানা রাজনৈতিক দল।

আর এই পটভূমিতেই আরও একবার আক্রমণের নিশানায় মুম্বাইয়ের কথিত অবৈধ বাংলাদেশিরা, যাদের দেশ থেকে তাড়ানোর দাবি উঠছে প্রকাশ্যেই। কিন্তু এই ইস্যু নিয়ে ভারতের বাণিজ্যিক রাজধানী কি আদৌ চিন্তিত, নাকি দেশে ভোটের আগে শ্রমজীবী এই গরিব মানুষগুলোকে আরও একবার রাজনৈতিক বলির পাঁঠা বানানোর চেষ্টা চলছে?

আরব সাগরের তীরে নতুন করে এই বাংলাদেশি তাড়ানোর ডাক ওঠায় শহরের বাংলাভাষী মুসলিমরাই বা কী বলছেন? মুম্বাই ঘুরে এ বিষয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বিবিসি।

ভায়ান্দারের ‘বাংলাদেশ বস্তি’

মুম্বাইয়ের দক্ষিণতম প্রান্তে চার্চগেট স্টেশন থেকে ছাড়া যে লোকল ট্রেনগুলো শহরের লাইফলাইন হিসেবে কাজ করে, তার অনেকগুলোরই রুটের একেবারে শেষপ্রান্তে শহরতলির ভায়ান্দার স্টেশন। আর সেই স্টেশন থেকে একটু দূরেই শহরের দরিদ্র মানুষের এক বিশাল কলোনি, লোকের মুখে মুখে যার নাম ‘বাংলাদেশ বস্তি’।

সম্প্রতি ভায়ান্দারের এই বস্তির নাম উঠে এসেছে দিল্লির কনস্টিটিউশন ক্লাবের আলোচনাতেও। বিজেপির ভাইস-প্রেসিডেন্ট ও সাংসদ বিনয় সহস্রবুদ্ধে জানান, ‘সুদূর বাংলাদেশ থেকে অসংখ্য লোকজন অবৈধভাবে ভারতে ঢুকে ভায়ান্দারে পাড়ি দিচ্ছে। মুম্বাইয়ের আশেপাশে টিলা-জঙ্গলগুলো দখল করে তারা গড়ে তুলছে বসতি, চালাচ্ছে নানা বেআইনি ধান্দা। এমন কি পুলিশ হানা দিতে গেলেও তাদের পাথর ছুঁড়ে তাড়িয়ে দিচ্ছে এই বাংলাদেশিরা!’

বিজেপির এই দাপুটে নেতার হুঁশিয়ারি, অবৈধ বাংলাদেশির সমস্যা শুধু আসামের নয়- মুম্বাইসহ গোটা দেশেই তা ‘টাইম বোমার মতো টিক-টিক’ করছে।

তার দলের সভাপতি অমিত শাহ তো আরও একধাপ এগিয়ে ভারতে থাকা বাংলাদেশিদের কখনও ‘ঘুষপেটিয়া’ (অনুপ্রবেশকারী), কখনও ‘দীমক’ (উইপোকা) বলেও গালাগাল করছেন।

কিন্তু যেমনটা তারা বলছেন, সত্যিই কি বাংলাদেশিরা ছেয়ে ফেলছেন মুম্বাই শহরতলির বস্তিগুলো?

ভায়ান্দারের তথাকথিত ‘বাংলাদেশ বস্তি’তে খোঁজখবর করতে গিয়ে কিন্তু চমকের পর চমক। বস্তির বাসিন্দা ঊষা, মুকেশরা জানাচ্ছেন তাদের কলোনির নাম বাংলাদেশের নামে হলেও সেখানে একঘর বাঙালি পর্যন্ত নেই। বরং বাইরের একটা দেশের নামে কেন তাদের কলোনির নাম, সেটাই তাদের এতদিন ভাবিয়ে এসেছে।

আরও পুরনো বাসিন্দাদের কাছে খোঁজখবর করতে গিয়ে জানা গেল, চল্লিশ-পঞ্চাশ বছর আগে যখন পুরনো ঝোপড়পট্টি ভেঙে এই কলোনি গড়ে তোলা হয়, তখন বাংলাদেশ যুদ্ধে জেতার সম্মানেই কিন্তু বস্তির নামকরণ করা হয়েছিল বাংলাদেশের নামে। কিন্তু না, কোনওদিন কোনও বাঙালি এই তল্লাটে কখনওই ছিল না।

অবৈধ বাংলাদেশিদের নিয়ে গবেষণার জন্য ফেলোশিপ

অথচ এই ‘বাংলাদেশ বস্তি’ নামটা ব্যবহার করেই কথিত অবৈধ বিদেশীদের বিরুদ্ধে মুম্বাইয়ের আবেগকে খুঁচিয়ে তুলতে চাইছেন বিজেপি নেতারা। ভায়ান্দারের এই বাংলাদেশ বস্তি থেকে কয়েক মাইল দূরেই বিশাল গ্রাম জুড়ে আরএসএস-এর থিঙ্কট্যাঙ্ক তথা এনজিও ‘রামভাউ মহালগি প্রবোধিনী’র সদর দফতর।

অবৈধ বাংলাদেশিরা মুম্বাইয়ের অর্থনীতিতে কী ধরনের বিরূপ প্রভাব ফেলছে তা নিয়ে বিশদ গবেষণার জন্য একটি ফেলোশিপও চালু করছেন তারা।

ওই প্রতিষ্ঠানের মহাপরিচালক রবীন্দ্র সাঠে মনে করেন এই ইস্যুতে কোনও আপস করারই অবকাশ নেই।

সাঠে বলেন, ‘আমরা ধর্মের ভিত্তিতে মানুষের সঙ্গে বৈষম্য করতে চাই না। কিন্তু অবৈধ বাংলাদেশিদের প্রশ্নটা জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত, আর সেটাকে দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বেই রাখা উচিত’।

তিনি বলেন, ‘আসামের সাবেক রাজ্যপাল এস কে সিনহা তার এক রিপোর্টে বলেছিলেন, নিম্ন আসামের পাঁচটি জেলায় যেভাবে বাংলাদেশি মুসলিমরা ঢুকেছে তাতে তারা একদিন বাংলাদেশের সঙ্গে সংযুক্তিরও দাবি জানাতে পারে। ফলে আমাদের সতর্ক হতে হবে এখনই’।

সাঠে বলেন, অবৈধ বাংলাদেশিদের ভারত থেকে ডিপোর্ট করা ছাড়া কোনও উপায় নেই, আর দিল্লি যদি সেটা দক্ষতার সঙ্গে করতে পারে, তাহলে বাংলাদেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক নষ্ট হওয়ারও কোনও আশঙ্কা নেই।

মহারাষ্ট্রে ক্ষমতায় থাকা বিজেপির সঙ্গে তাদের পুরনো শরিক শিবসেনার সম্পর্ক এখন খুব ভাল নয়, কিন্তু এই একটা প্রশ্নে অন্তত দুটো দলের মধ্যে কোনও বিরোধ নেই।

শিবসেনার নেত্রী শ্বেতা পারুলেকর বলেন, ‘শহর মুম্বাই যেহেতু আর আড়ে-বহরে বাড়তে পারবে না- তাই অবৈধ বাংলাদেশিদের ঢল অব্যাহত থাকলে মুম্বাই সেই চাপ আর নিতে পারবে না, শহরের অবকাঠামো মুখ থুবড়ে পড়বে’।

বান্দ্রা-কলানগরের বাঙালি মুসলিমরা

তবে এই যে হাজার হাজার অবৈধ বাংলাদেশির কথা বলা হচ্ছে, মুম্বাইয়ের কোনও বস্তিতেই সহজে তাদের দেখা মিলবে না। বরং সেখানকার বাঙালি বাসিন্দারা সবাই জানাবেন, তারা পশ্চিমবঙ্গ থেকেই এসেছেন।

প্রথমে কথাই বলতে চাইছিলেন না, তবে অনেক সাধ্যসাধনার পর গাইঘাটার আশরাফ বলেন, ‘প্রুফ-টুফ চেক করে, দেখে আধার কার্ড প্যান কার্ড এই সব আছে কি না! আমরা বলি আমরা ইন্ডিয়ারই লোক। সব আইডেন্টিটি দেখে সন্তুষ্ট হলে পুলিশ ছেড়ে দেয়, নয়তো ধরে নিয়ে যায়’।

আজিম শেখ নামের একজন জানান, ‘আজকাল খুব একটা সমস্যা নেই। আর বাংলাদেশি আছে খবর পেলে আশেপাশের বাড়িই ইঙ্গিত দিয়ে দেয়, তখন এসে ধরপাকড় করে। সবাই তো আমরা এখন পেপার (কাগজপত্র) নিয়েই ঘোরাফেরা করি!’ ফলে পুলিশ ‘আসল বাংলাদেশি’দের ধরপাকড় করলেও তাতে তাদের তেমন কোনও সমস্যাও নেই বলে দাবি করেন আজিম।

বলিউডের প্রয়াত অভিনেত্রী নার্গিসের নামে যে নার্গিস কলোনি, সেখানকার রাজু শেখ নামের একজন বলেন, ‘ধরে শুধু বাংলাদেশিদেরই। হাতকড়া পরিয়ে হয়তো নিয়ে যায়, কিংবা ট্রেনে করে ফেরত পাঠিয়ে দেয়। তবে এগুলো নিউজ চ্যানেলেই দেখি, নিজের চোখে কখনও দেখিনি’।

মুম্বাইয়ের সাধারণ মানুষ মনে করেন বাংলাদেশিরা কাজের সন্ধানে ভারতে আশ্রয় নেন। তারা কলকাতা দিয়ে ঢুকে ভারতের নাগরিক পরিচয়পত্র বানিয়ে নিয়ে মুম্বাইতে চলে আসেন।

‘ভোটের জন্যই এই ইস্যু’

মুম্বাইয়ের সবচেয়ে বিখ্যাত বাঙালিদের একজন, কবি-সাংবাদিক-চিত্রনির্মাতা ও শিবসেনার সাবেক সাংসদ প্রীতীশ নন্দী বলেন, ‘আসলে ভোটের জন্য মাঝে মাঝে কিছু কিছু পার্টি চেঁচামেচি করে এই ইস্যুটা নিয়ে। কারণ তারা জানে, যদি ঘৃণা ছড়ানো যায় তাহলে সেটা রাগের জন্ম দেবে- আর সেই রাগটা নাগরিকদের ভোটিং প্যাটার্ন বদলে দেবে’।

তিনি বলেন, ‘দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হল, এই রাগটাই কিন্তু এখনকার এই সময়ে সবচেয়ে ডমিন্যান্ট মেটাফোর! আইডিয়াটা হল সবাই যেন রেগে যেতে চাইছে, একটা লড়াই করার বাহানা খুঁজছে!’

আসামের পর দেশের নানা প্রান্তে যে এখন নাগরিক তালিকা তৈরির দাবি উঠছে, সেটাতেও সাধারণ মানুষের উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। মুম্বাইয়ের কথিত বাংলাদেশিরাও আপাতত এই বিতর্কের জাঁতাকলেই পড়েছেন- তারা কি নিরাপত্তার হুমকি না কি অভিবাসী শ্রমিক হিসেবে কিছু অধিকারও তাদের প্রাপ্য?

এর আগেও বহুবার মুম্বাইতে অবৈধ বাংলাদেশিদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক শ্লোগান উঠেছে, আবার থিতিয়েও গেছে।

মাসছয়েকের মধ্যেই ভারতে সাধারণ নির্বাচন – অন্তত তখন পর্যন্ত কিছু কিছু রাজনৈতিক দল যে এই ইস্যুতে তাদের ভোগাবে, সেই ইঙ্গিত কিন্তু পরিষ্কার!