২২, অক্টোবর, ২০১৮, সোমবার | | ১১ সফর ১৪৪০

‘দক্ষ’ চালক তৈরিতে সরকারি অচল গাড়ি

আপডেট: অক্টোবর ৭, ২০১৮

‘দক্ষ’ চালক তৈরিতে সরকারি অচল গাড়ি

নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের তীব্র আন্দোলনের পর এক লাখ দক্ষ গাড়িচালক তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এজন্য সরকারি যানবাহন অধিদপ্তর প্রায় ৫০০ অচল গাড়ি বিনামূল্যে বিএমইটি ও বিআরটিসিকে দিয়েছে। যে কেউ চাইলেই এই গাড়িগুলোর মাধ্যমে প্রশিক্ষণ নিতে পারবে। বিনা পয়সায় এই প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে সারাদেশের সরকারি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অকেজো গাড়ি দিয়ে ড্রাইভিং শেখা যায় না। প্রশিক্ষণের জন্য ভালো মানের গাড়ি প্রয়োজন।

জানা গেছে, অধিদপ্তরের দেওয়া গাড়িগুলো বিএমইটি ও বিআরটিসি দু’ভাবে ব্যবহার করছে। যেসব গাড়ি একেবারেই অচল, সেগুলো প্রশিক্ষণসহায়ক সামগ্রী হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। এর মাধ্যমে গাড়ির বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ও যন্ত্রপাতি সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হচ্ছে প্রশিক্ষণার্থীদের। এতে তারা ড্রাইভিং ও মেরামত দুই বিষয়েই প্রশিক্ষণ পাচ্ছে। আর যে গাড়িগুলো মেরামতের পর প্রশিক্ষণ দেওয়ার উপযোগী সেগুলো দিয়ে সরাসরি ড্রাইভিং শেখানো হচ্ছে। দক্ষ চালক তৈরির এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সেভ প্রজেক্টের মাধ্যমে।

ইতিমধ্যে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) সারাদেশের ২০টি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে এই কাজ শুরু করেছে। পর্যায়ক্রমে সব জেলায় এই প্রশিক্ষণের কাজ শুরু হবে। একইভাবে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি) তাদের ১৬টি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও তিনটি ইনস্টিটিউটে প্রশিক্ষণের কাজ শুরু করেছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সরকারি যানবাহন অধিদপ্তরের পরিবহন কমিশনার মুনশী শাহাবুদ্দীন আহমেদ বলেন, দক্ষ চালক হওয়ার জন্য গাড়ির খুটিনাটি বিষয় জানতে হয়। অকেজো গাড়িগুলো দিয়ে সেটি প্র্যাকটিক্যাল শেখানো যাচ্ছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অনুমতি নিয়ে প্রচলিত আইনে প্রায় ৫০০ গাড়ি বিএমইটি ও বিআরটিসিকে দেওয়া হয়েছে। এজন্য কোনো বিশেষ আইন নেই। আইন করার চেষ্টা চলছে।

তিনি বলেন, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের অকেজো গাড়িগুলো এমনিতেই পড়ে থাকে। এগুলো এক মাস ব্যবহার না করলে নষ্ট হয়ে যায়। তাই এসব গাড়ি দিয়ে দক্ষ চালক তৈরি করা হচ্ছে। শাহাবুদ্দীন আহমেদ আরও বলেন, এখন তাদের জন্য দক্ষ ট্রেইনার প্রয়োজন। ভালো ট্রেইনার হলে তারা যথাযথভাবে প্রশিক্ষণ পাবে।

এদিকে অকেজো ঘোষিত গাড়িগুলো সংশ্নিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিনামূল্যে ব্যাপক আকারে দেওয়ার জন্য যানবাহন অধিদপ্তর নীতিমালাও চূড়ান্ত করেছে। এ ছাড়া টেকসই উন্নয়নের আট নম্বর লক্ষ্য (কর্মসংস্থান ও অর্থনীতি) বাস্তবায়নের জন্য উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এজন্য প্রধানমন্ত্রীর এসডিজি বাস্তবায়নবিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক আবুল কালাম আজাদও সরকারি অকেজো গাড়িগুলো বিএমইটি ও বিআরটিসিকে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন অধিদপ্তরকে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্বদ্যালয়ের (বুয়েট) এক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এআরআই) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মাহবুব আলম তালুকদার বলেন, দক্ষ চালক তৈরির যে সমস্যা, সেটা এভাবে সমাধান হবে না। এজন্য মেগা প্রকল্পের মাধ্যমে একসঙ্গে ১০ লাখ দক্ষ চালক তৈরি করতে হবে। বর্তমানে যে ট্রেইনার আছে, তাদের দিয়েও হবে না। দক্ষ চালক তৈরি করতে হলে আন্তর্জাতিক মানের ট্রেইনার লাগবে। বুয়েটের এই অধ্যাপক বলেন, অকেজো গাড়ি দিয়ে ড্রাইভিং শেখা যায় না। ভালো ড্রাইভিং শিখতে ভালো গাড়িও লাগবে।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, দক্ষ চালক তৈরির এই উদ্যোগটি অত্যন্ত প্রশংসনীয়। তবে এটি প্রয়োজনের তুলনায় অতি সামান্য। বর্তমানে ৪০ লাখের মতো গাড়ি চলাচল করে রাস্তায়। এর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ চালকের বৈধ লাইসেন্স নেই। যাদের লাইসেন্স আছে, তাদেরও বেশিরভাগের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ নেই। অন্য চালকের কাছ থেকে কোনো রকমে স্টিয়ারিং ধরতে শিখেই লাইসেন্স বাগিয়ে নিয়েছে। ফলে রাস্তার নিয়ম-কানুন কিংবা আইন সম্পর্কেও তাদের ধারণা কম।

তারা বলছেন, নতুন উদ্যোগে চালক তৈরির জন্য চার মাসে ৩৬০ ঘণ্টা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকবে। এতে সড়কে চলাচলের জন্য প্রয়োজনীয় সব বিষয়েই প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। কিন্তু যেভাবে প্রতিদিন সড়কে নতুন নতুন গাড়ি নামছে, তাতে আগামী পাঁচ বছরে আরও কয়েক লাখ গাড়ি রাস্তায় নামবে। প্রয়োজন হবে কয়েক লাখ চালকের। বাকি চালক আসবে কোত্থেকে? তাই দক্ষ চালক তৈরির এই উদ্যোগ আরও সম্প্রসারণ করতে হবে। চাহিদা অনুযায়ী প্রশিক্ষিত চালক তৈরির উদ্যোগ নিতে হবে। বেসরকারি যেসব ট্রেনিং ইনস্টিটিউট আছে, তাদেরও সহযোগিতা নেওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে পুরনো চালকদের জন্য বাধ্যতামূলক ওরিয়েন্টেশন কোর্সের ব্যবস্থা করতে হবে। লাইসেন্স প্রদান প্রক্রিয়া নিখুঁত করার পাশাপাশি সড়কে আইনের বাস্তবায়নও নিশ্চিত করতে হবে।

বিএমইটির মহাপরিচালক মো. সেলিম রেজা বলেন, এটি অনেক ভালো কর্মসূচি। ড্রাইভিং ও মেকানিক একসঙ্গে শেখানো হচ্ছে। প্রশিক্ষণ শেষেই বিআরটিএ তাদের লাইসেন্স দিচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে চাকরিও পাচ্ছে। কারণ, আমাদের দেশে দক্ষ চালকের অনেক অভাব। সেলিম রেজা বলেন, যানবাহন অধিদপ্তরের অকেজো গাড়িগুলো মেরামত করে তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। প্রশিক্ষণের জন্য আরও ভালো গাড়ি হলে এর পরিধি বাড়ানো যাবে।

বিআরটিসির পরিচালক (কারিগরি) কর্নেল মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, অধিদপ্তর থেকে প্রায় ৩০০ অকেজো গাড়ি পেয়েছি। এগুলো দু’ভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। কিছু গাড়ি মেরামত করে ড্রাইভিং শেখানো হচ্ছে। আর পুরোপুরি অকেজো গাড়িগুলোর বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ও যন্ত্রপাতি সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হচ্ছে। তবে প্রশিক্ষণের জন্য আরও ভালো মানের গাড়ি প্রয়োজন।