১৫, অক্টোবর, ২০১৮, সোমবার | | ৪ সফর ১৪৪০

ভোটের আগে ফের জঙ্গি নিয়ে শঙ্কা

আপডেট: October 6, 2018

ভোটের আগে ফের জঙ্গি নিয়ে শঙ্কা

২০১৬ সালের ১ জুলাই হলি আর্টিসানে জঙ্গি হামলার পর দেশের বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক অভিযানে কমতে থাকে উগ্রপন্থিদের শক্তি। তবে এরপরও গোপনে নানা কৌশলে তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে জঙ্গিরা। চলতি বছর জামা’আতুল মুজাহিদীন অব বাংলাদেশ (জেএমবি) ও আনসার আল ইসলাম একসঙ্গে মুন্সীগঞ্জে লেখক-প্রকাশক শাহজাহান বাচ্চুকে হত্যার পর সংগঠনটির পুনঃশক্তির বিষয়টি আবারও সামনে আসে। এরই মধ্যে গোয়েন্দারা তথ্য পান, জঙ্গিরা আবারও সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। শুধু দেশি গোয়েন্দা সংস্থা নয়, ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপও (আইসিজি) তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, বাংলাদেশে ভোটের বছরে রাজনৈতিক বৈরিতা আবারও সহিংস জঙ্গিবাদের ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে। তারা বলছে, জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক মেরুকরণ যে সংকট তৈরি করবে জঙ্গিরা সেই সুযোগ নিতে পারে। অনেকের আশঙ্কা ভোট সামনে রেখে আবার জঙ্গি অভিশাপের মুখোমুখি হবে দেশ। যদিও গোয়েন্দারা বলছেন, বড় ধরনের হামলা করার মতো সক্ষমতা জঙ্গিদের নেই। তবে এরপরও তারা আত্মতুষ্টিতে ভুগতে চান না। এর মধ্যেই বৃহস্পতিবার রাতে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে একটি জঙ্গি আস্তানায় অভিযান চালিয়েছে র‌্যাব। অভিযানে জেএমবির দুই জঙ্গি নিহত হয়েছে। র‌্যাব বলছে, আস্তানায় থাকা জঙ্গিদের চট্টগ্রামের আদালত ভবন উড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি (গোপনীয়) মো. মনিরুজ্জামান বলেন, নির্বাচন সামনে রেখে জঙ্গিরা আবার সংঘটিত হতে পারে- এ ধরনের ঝুঁকি ও শঙ্কা রয়েছে। এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে এরই মধ্যে নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনের সময় জঙ্গিরা তৎপর হলে তা মোকাবেলার প্রস্তুতি পুলিশের রয়েছে। তাদের কোনোভাবে তৎপরতা চালাতে দেওয়া হবে না। তথ্য পেলেই তাদের আস্তানায় অভিযান চালানো হবে।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান বলেন, নির্বাচনী আমেজের মধ্যে যাতে জঙ্গিরা তৎপর হতে না পারে সেই প্রস্তুতি র‌্যাবের রয়েছে। র‌্যাব এরই মধ্যে সে ধরনের সক্ষমতা অর্জন করেছে। নির্বাচন ঘিরে কোনো অশুভ শক্তিকে তৎপর হতে দেওয়া হবে না।

জঙ্গি তৎপরতার তথ্য রাখেন এমন একাধিক কর্মকর্তা জানান, জামিনপ্রাপ্ত ও দেশে-বিদেশে পলাতক জঙ্গিদের ওপর তারা নজরদারি করছেন। বিশেষ করে অনলাইনে জেএমবির সদস্যরা তাদের সংগঠনে নতুন সদস্য সংগ্রহ করার চেষ্টা করছে। বর্তমানে যেসব এলাকায় জঙ্গিরা সবচেয়ে বেশি সক্রিয় তার মধ্যে রয়েছে চট্টগ্রাম-সিলেট ও তিন পার্বত্য জেলা। এ ছাড়া জেএমবি ও আনসার আল ইসলাম যৌথভাবে প্রকাশক শাহজাহান বাচ্চুকে হত্যার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর গোয়েন্দাদের নতুনভাবে ভাবিয়ে তুলেছে। মূলত ওই অপারেশনে জেএমবি আনসার আল ইসলামের ভাড়াটে বাহিনী হিসেবে কাজ করেছে। এ ধরনের পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে টার্গেট কিলিং অতীতে দেখা যায়নি।

দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, বাংলাদেশের অনেক জঙ্গি দেশের বাইরে সক্রিয়। তারা এখন দেশে সক্রিয় জঙ্গিদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করছে। জেএমবির প্রতিষ্ঠাতা শায়খ আবদুর রহমানের পরিবারের সদস্যরা সৌদি আরব থেকে সংগঠনকে চাঙ্গা করতে অর্থ পাঠাচ্ছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ ও ভারতের জেএমবির দুই অংশকে তারা আর্থিক সহায়তা করে যাচ্ছে।

আগামী জাতীয় নির্বাচনের পরিবেশ নষ্টের লক্ষ্যে জঙ্গি সংগঠনগুলো সক্রিয় হতে পারে বলেও মনে করছে দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। এ জন্য নতুন করে টার্গেট কিলিং শুরু করতে পারে বলেও এক গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, জঙ্গিদের পুরনো লিস্টে থাকা দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিরাও টার্গেট হতে পারেন।

চলতি বছরের শুরুর দিকেই আইসিজি তাদের এক প্রতিবেদনে বলেছে, বাংলাদেশে ভোট সামনে রেখে রাজনৈতিক বৈরিতা হলে আবারও সহিংস জঙ্গিবাদের উত্থানের ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে। এ নিয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থাটি সতর্কও করেছে। মাঠ পর্যায়ে গবেষণার মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সংঘাত ও তা নিরসনে করণীয় সম্পর্কে পরামর্শ দেয় এই আন্তর্জাতিক সংস্থা।

ঢাকার গোয়েন্দা কর্মকর্তারাও বলছেন, নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জেএমবি এরই মধ্যে সংগঠিত হয়ে অপতৎপরতা শুরু করেছে বলেও কিছু আলামত পেয়েছেন তারা। বগুড়ার একটি জঙ্গি আস্তানা থেকে উদ্ধার করা এক জঙ্গি নেতার লেখা চিঠিতেও জাতীয় নির্বাচনের সময়ে হামলার পরিকল্পনার কথা রয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, পুরনো জেএমবি নতুনভাবে সংগঠিত হওয়ার বেশ কিছু আলামত পাওয়া গেছে। তাদের কিছু নাশকতা পরিকল্পনাও এরই মধ্যে নস্যাৎ করা হয়েছে। বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পুরনো জেএমবি সাংগঠনিক শক্তি বাড়াতে আগের মতো ডাকাতিতে জড়াচ্ছে।

২৯ মার্চ দক্ষিণখানে ডাকাতি করতে গিয়ে পাঁচজন ধরা পড়ে। তারা হলো- জামালপুরের সফিকুল ইসলাম, কুমিল্লার হাবিবুর রহমান, নেত্রকোনার নুরুজ্জামান নাবিল, বাগেরহাটের ওবায়দুর রহমান ও জহিরুল ইসলাম। তাদের দুই দফায় রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে থানা পুলিশ। তারা পেশাদার ডাকাতচক্রের সদস্য বলে স্বীকার করলেও জঙ্গি গ্রুপের সদস্য বলে স্বীকার করেনি। পরে প্রকাশক বাচ্চু হত্যার পর তদন্তে বেরিয়ে আসে দক্ষিণখানের ঘটনায় জড়িতরা উগ্রপন্থি গ্রুপের সদস্য।

গোয়েন্দারা ধারণা করছেন, জেএমবি ভেতরে ভেতরে অনেকটাই সংগঠিত হয়েছে। এরই মধ্যে এর কিছু আলামতও পাওয়া গেছে। বিশেষ করে চলতি বছরের ১১ জুন মুন্সীগঞ্জের সিরাজদীখানে প্রকাশক ও লেখক শাহজাহান বাচ্চু হত্যার মাধ্যমে নিজের অস্তিত্ব নতুন করে জানান দেয় জেএমবি। ওই হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত জেএমবির ঢাকা বিভাগীয় অপারেশনাল প্রধান আবদুর রহমান ওরফে লালু জড়িত থাকার তথ্য জানার পর তাদের সাম্প্রতিক কার্যক্রম সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পায় পুলিশ। যদিও তার সহযোগীদের গ্রেফতার অভিযানের সময় লালু ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়।

সরকারের গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে দেশের রাজনৈতিক অবস্থা স্বাভাবিক। আগামী ডিসেম্বরে জাতীয় সংসদ নির্বাচন হওয়ার কথা। সেদিক বিবেচনায় দেশের রাজনৈতিক মাঠ শান্ত থাকা দরকার। এ পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক মাঠ উত্তপ্ত এবং আগামী সংসদ নির্বাচনের পরিবেশ বিনষ্ট করার লক্ষ্যে স্বার্থান্বেষী মহল টার্গেট কিলিংয়ের মাধ্যমে উত্তপ্ত পরিবেশ সৃষ্টির অপচেষ্টা চালাতে পারে। গোয়েন্দা প্রতিবেদনে আরও উঠে এসেছে, টার্গেট কিলিংয়ের মাধ্যমে জাতীয় নির্বাচনের আগে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করে তোলা হতে পারে।

জঙ্গি চিঠিতে নির্বাচনে নাশকতার পরিকল্পনা :বগুড়া পুলিশ চলতি বছরের ১৯ মার্চ জেলার বাঘোপাড়া বাজার এলাকায় অভিযান চালিয়ে জেএমবির রাজশাহী অঞ্চলের নেতা রফিকুল ইসলাম ওরফে রাকিব, ইব্রাহীম ওরফে আবীর ও আবু বক্কর ওরফে সীমান্তকে গ্রেফতার করে। আবিরের কাছ থেকে উদ্ধার হয় জেএমবির শীর্ষ নেতাদের উদ্দেশে এক জঙ্গির হাতে লেখা পাঁচ পৃষ্ঠার পৃথক দুটি চিঠি।

জঙ্গি কার্যক্রম ও জঙ্গি দমনে যুক্ত পুলিশ ইউনিটের এক কর্মকর্তা বলেন, হাতে লেখা চিঠি দুটি জেএমবির আমির সালাউদ্দিন ওরফে সালেহীনের উদ্দেশে লেখা। চিঠিটি জঙ্গি নেতা ইয়ামিন ওরফে শহীদুল্লাহর মাধ্যমে ভারতে অবস্থানরত সালেহীনের কাছে পৌঁছানোর কথা ছিল। তবে চিঠি পৌঁছানোর আগেই তা ধরা পড়ে।

সূত্রগুলো বলছে, দুটি চিঠিই এক জঙ্গি কারাগারে বসে লিখেছিল। চিঠির লেখক ছদ্মনামে তা লেখে। সেই চিঠিতে লেখা ছিল- ‘…অ্যামুনেশন সংগ্রহে তৎপর হওয়া দরকার। সামনে নির্বাচন। বিভিন্ন রকম সহিংসতা হবে। এই সুযোগ কাজে লাগানো দরকার।’ চিঠিতে এ জন্য প্রশিক্ষণ বাড়ানোর তাগাদাও দেওয়া হয়। বলা হয়, ‘ব্ল্যাকবোর্ডসর্বস্ব প্রশিক্ষণের বদলে সশস্ত্র জিহাদ করতে হবে।’

জানা গেছে, পুরনো জেএমবির নেতৃত্বে রয়েছেন পলাতক জঙ্গি সালাউদ্দিন সালেহীন ওরফে সানি। ধারণা করা হচ্ছে, সে বর্তমানে ভারতে পলাতক। তার দিকনির্দেশনায় চলছে জেএমবি। এ ছাড়া কারাবন্দি সাইদুর রহমান জেএমবির অন্য একটি অংশ পরিচালনায় ভূমিকা রাখছে।