২২, অক্টোবর, ২০১৮, সোমবার | | ১১ সফর ১৪৪০

নির্যাতন-লুটপাটমুক্ত প্রতিষ্ঠান চান শিক্ষকরা

আপডেট: অক্টোবর ৫, ২০১৮

নির্যাতন-লুটপাটমুক্ত প্রতিষ্ঠান চান শিক্ষকরা

সারাদেশে শুক্রবার পালিত হচ্ছে বিশ্ব শিক্ষক দিবস। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে দিবসটি উদযাপন করছে শিক্ষক সংগঠনগুলো। এ উপলক্ষে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক এ দিবস উদযাপনের প্রাক্কালে পরিচালনা কমিটির অত্যাচার-নির্যাতন থেকে মুক্তি এবং লুটপাটমুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছেন শিক্ষকরা।

প্রবীণ শিক্ষক নেতা অধ্যক্ষ কাজী ফারুক আহমেদ বলেন, ইউনেস্কো ২০১৬ সালে ‘স্কুলস লিডারশিপ’নামে একটি প্রস্তাবনা তুলে ধরেছে। তাতে বলা হয়েছে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনার নেতৃত্ব দেবেন বা সভাপতির পদে আসীন হবেন অধ্যক্ষ বা প্রধান শিক্ষকরা। অংশীজন হিসেবে অভিভাবকরা মূলশক্তির ভূমিকা পালন করবেন।

এ ছাড়া যারা আছেন তারা বহিরাগত। বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেখি, বহিরাগতদের বেশির ভাগ লুটপাট আর অপকর্মে ব্যস্ত। ইউনেস্কোর প্রস্তাব অনুযায়ী পরিচালনা কমিটির বিধান তৈরি করে প্রতিষ্ঠান ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব অধ্যক্ষ-প্রধান শিক্ষককে দিতে হবে। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানকে দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে রাখতে হবে। নাহলে জাতীয় প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি, শিক্ষার মাধ্যমে দক্ষতা নিশ্চিত, আত্মনির্ভরশীল শিক্ষার্থী তৈরি করা সম্ভব হবে না। আর এসব না হলে রূপকল্প ২০২১ বা ২০৪১ অর্জনও সম্ভব হবে না।

তিনি জানান, দেশে বিদ্যমান বিভিন্ন ধরনের বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে হাই স্কুল, দাখিল মাদরাসা, স্কুল-কলেজ, আলিম মাদরাসা, ডিগ্রি বা ডিগ্রিসহ অনার্স-মাস্টার্স কলেজ, ফাজিল বা ফাজিলসহ কামিল মাদরাসা পরিচালিত হয় পরিচালনা কমিটি দ্বারা। এসব পরিচালনা কমিটি গঠন করা হয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা বিধি ও নীতিমালা অনুযায়ী। সাধারণত রাজনৈতিক নেতা, এলাকার প্রভাবশালী ব্যক্তি, সাবেক আমলা ও শিক্ষক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তারা পরিচালনা কমিটির সভাপতি-সদস্য হয়ে থাকেন। সবধরনের প্রতিষ্ঠানেই শিক্ষক প্রতিনিধি এবং অভিভাবক প্রতিনিধি রাখা হয়। শিক্ষা বোর্ডের অধীন স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় রাজনৈতিক ব্যক্তিদের প্রভাব বেশি থাকে।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন প্রতিষ্ঠানে সাবেক আমলা-শিক্ষক, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের পরিচালনা কমিটির সভাপতির দায়িত্ব দেয়া হয়ে থাকে। তবে যেসব ব্যক্তি প্রতিষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্বে আসছেন তারে বেশির ভাগের শিক্ষাগত যোগ্যতা, নৈতিকতা, সামাজিক মর্যাদা ইত্যাদি প্রশ্নবিদ্ধ।

বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের বিভিন্ন সংগঠনের মোর্চা বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ মো. সেলিম ভূঁইয়া বলেন, সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হচ্ছে বর্তমানে একশ্রেণির অশিক্ষিত মানুষ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনার ভার নিয়েছেন। ইয়াবাসহ মাদক ব্যবসায়ীরা পরিচালনা কমিটির সদস্য পদে চলে আসছেন। অনেকেরই টার্গেট থাকে স্কুল-কলেজ থেকে অর্থ লুটপাট। তারা দলীয় রঙ মেখে শিক্ষককে চাকরিচ্যুত করে থাকে। আসল উদ্দেশ্য থাকে ওই পদে নিয়োগ দিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেয়া। এভাবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চলতে পারে না। এ পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতেই আমরা চাকরি জাতীয়করণের দাবি জানিয়ে আসছি।

এ দাবির নেপথ্যে তিনটি কারণ আছে। সেগুলো হচ্ছে, শিক্ষকের আর্থিক স্বচ্ছলতা, চাকরির নিরাপত্তা এবং সামাজিক মর্যাদা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সামান্য ব্যতিক্রম ছাড়া পরিচালনা কমিটিতে আসা রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অর্থ লুটপাটে জড়িত হওয়ার অভিযোগ বেশি। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের মধ্যেও কিছু পাওয়া গেছে যারা নানাভাবে অর্থ লুটে নিচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে কৌশলীরা শিক্ষার মানোন্নয়নের চেয়ে প্রতিষ্ঠানের নির্মাণ, সংস্কার, কেনাকাটার দিকে বেশি মনোনিবেশ করেন। ওইসব কাজের মাধ্যমে অর্থ লুটপাট করেন তারা। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানে লোক দেখানো অডিট কমিটি থাকে। ওই কমিটি নামেমাত্র নিরীক্ষা করে প্রতিবেদন তৈরি করে।

যেহেতু পরিচালনা কমিটিতে পাস করাতে পারলেই সব মাফ। তাই সেই নিরীক্ষা প্রতিবেদন পরিচালনা কমিটিতে পাস করিয়ে নেয়া হয়। এভাবে কায়েম করা হয় লুটপাটের রাজ্য।

সংশ্লিষ্টরা জানান, দুষ্ট সভাপতি ও সদস্যদের লুটপাটে প্রধান সহায়কের ভূমিকা পালন করেন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক প্রতিনিধিরা। কোথাও অধ্যক্ষ-প্রধান শিক্ষকরাও লুটপাটের প্রধান অংশীদার বনে যান। চতুর অধ্যক্ষ-প্রধান শিক্ষক এবং শিক্ষক প্রতিনিধিরা লুটপাটের রাস্তা সুগম রাখতে পছন্দের সভাপতি ও অভিভাবক প্রতিনিধি নিয়ে পরিচালনা কমিটি গঠন করেন। এরপর মিলেমিশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের তহবিল লুটপাট করেন।

তবে নিবেদিতপ্রাণ সভাপতি এবং সদস্যও আছেন। অসৎ শিক্ষক-অধ্যক্ষ বা প্রধান শিক্ষকদের মোকাবেলা করে প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে নিচ্ছেন তারা। কিন্তু এ সংখ্যা খুবই নগন্য বলে জানা গেছে।

প্রবীণ শিক্ষক নেতা ও শিক্ষক-কর্মচারীদের সংগঠনের অন্যতম বড় মোর্চা জাতীয় শিক্ষক কর্মচারী ফ্রন্টের প্রধান সমন্বয়কারী অধ্যক্ষ কাজী ফারুক আহমেদ বলেন, বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান সমস্যা হলো এর পরিচালনা কমিটি। বিধিমালায় কমিটিকে এমন ক্ষমতা দেয়া হয়েছে যে, আল্লাহর পরই যেন সভাপতির ক্ষমতা। অসৎ সভাপতিরা যাচ্ছেতাই করলেও তাকে বিচারের মুখোমুখি হতে হয় না। চাকরিচ্যুতির ভয় দেখিয়ে প্রতিষ্ঠান প্রধানকে দিয়ে অনেকে নানা অপকর্ম করেন। কিন্তু প্রতিষ্ঠান প্রধান ও আয়ন-ব্যয়ন কর্মকর্তা হিসেবে শাস্তিটা পেতে হয় অধ্যক্ষ বা প্রধান শিক্ষককে। যেমন কয়েকদিন আগে অতিরিক্ত ভর্তির ইস্যুতে রাজধানীর একটি মহিলা কলেজের অধ্যক্ষকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় সতর্ক করেছে, যেটা চাকরিবিধি অনুযায়ী লঘু শাস্তি। একই ঘটনায় এরআগে আরেক প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষের এমপিও স্থগিত রাখা হয়েছিল।

অথচ আমার জানামতে, ওই দুই প্রতিষ্ঠানের অতিরিক্ত ভর্তির দায়ভার পরিচালনা কমিটির কয়েকজন সদস্যের। সুতরাং, সভাপতিকে বিচারের অধীনে এনে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা বিধিমালা প্রণয়ন করা উচিত।

প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের নির্যাতিত হওয়া এবং পরিচালনা কমিটির সভাপতি-সদস্যদের লুটপাট প্রসঙ্গে জানতে চাইলে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, আমরা বিভিন্ন সময়ে কমিটির সভাপতি ও সদস্যদের নানা অনিয়মের অভিযোগ পেয়েছি। কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমরা ব্যবস্থা নিয়েছি।

তিনি বলেন, অধিকাংশ বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটি বেপরোয়া। শিক্ষক নিয়োগ বাণিজ্য, নানাভাবে অর্থ উপার্জন তাদের প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়ায়। তাদের বিরুদ্ধে তেমন কঠিন ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হয় না, আমরা শুধু কমিটি বাতিল করে দিতে পারি। তাই এরা কাউকে তেমন কেয়ার করেন না। পরিচালনা কমিটির কারণে বর্তমানে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগ কেন্দ্রিয়ভাবে চালু করা হয়েছে। সুষ্ঠুভাবে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য আমরা নতুন করে ভাবছি। প্রয়োজনে এ সংক্রান্ত আইন সংশোধন করে কমিটির লাগামহীন ক্ষমতাকে কমিয়ে আনা হবে বলে জানান শিক্ষামন্ত্রী।