নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে জিসান হোসেন (১৬) নামের এক নবম শ্রেণীতে পড়ুয়া স্কুল ছাত্রকে পিটিয়ে ও আঁচরে হত্যা করেছে সন্ত্রাসীরা। হত্যার ঘটনার পর থেকেই খুনিদের ভয়ে নিহত জিসানের পরিবারের লোকজনসহ আত্মীয় স্বজন এলাকা ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।
হত্যাকান্ডের ঘটনায় পুরো এলাকায় আতঙ্ক বিরাজ করছে। এদিকে, পেরাব আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা ক্লাস বর্জন করে জিসানের খুনিদের দ্রুত গ্রেফতার করে ফাঁসির দাবিতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসুচী পালন করেছেন। এসময় এলাকাবাসীও ওই কর্মসুচীতে অংশ গ্রহন করেন। গত বৃহস্পতিবার (২২ আগস্ট) দুপুরে গোলাকান্দাইল এলাকায় সন্ত্রাসীরা জিসান হোসেনকে পিটিয়ে ও আঁচরে গুরুতর আহত করা হলে শুক্রবার (২৩ আগস্ট) সকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যায়।
নিহত জিসান হোসেন ঢাকা জেলার সুত্রাপুর থানার ধোলাইখাল রাশাবাজার এলাকার গোপাল হোসেনের ছেলে। স্থানীয় পেরাব আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণীতে পড়–য়া ছাত্র জিসান। জিসানের বাবা গোপাল হোসেন তার পরিবার নিয়ে রূপগঞ্জ উপজেলার কান্দাপাড়া এলাকায় প্রায় ১৫ বছর ধরে বসবাস করে আসছেন। বর্তমানে তারা পশ্চিম কান্দাপাড়া এলাকার মনোয়ার হোসেনের বাড়িতে বসবাস করছেন।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সুত্র জানায়, গত ১৫ দিন আগে গোলাকান্দাইল মধ্যেপাড়া এলাকার ছাত্রলীগের নামধারী নেতা সৌরভের ছোট ভাই সিয়ামসহ তার লোকজন অস্ত্রেশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে নাগেরবাগ বউবাজার এলাকার মাসুদ রানাকে পিটিয়ে আহত করে। এসময় বউবাজার এলাকার বাদল নামের একজন প্রতিবাদ করলে তাকেও পিটিয়ে আহত করা হয়। ওই সময় নাগেরবাগ বউবাজার এলাকার লোকজনও পাল্টা সিয়ামের দুই জনকে পিটিয়ে আহত করে।
এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে গত বৃহস্পতিবার সকালে নাগেরবাগ বউবাজার এলাকার হৃদয় হাসান শুভ স্কুল ছাত্র জিসান হোসেনকে নিয়ে গোলাকান্দাইল মধ্যেপাড়া এলাকায় ক্রিকেট খেলা দেখতে যায়। নাগেরবাগ বউবাজার এলাকার হওয়ায় গোলাকান্দাইল মধ্যে পাড়া এলাকার সৌরভসহ তার ছোট ভাই সিয়াম, বিদুৎ, ইকরাম, শাওন, রোহান, আলামিন, নিরব, আরমান, ইমন, সাকিব, হৃদয়, ইয়ামিন, ফাহিম, মাসুম, মোস্তাকিমস আরো বেশ কয়েকজন সন্ত্রাসী হৃদয় হাসান শুভ ও জিসান হোসেনকে জোরপুর্বক উঠিয়ে গোলাকান্দাইল হাট সংলগ্ন বালুর মাঠে নিয়ে রড ও কাঠ দিয়ে পিটিয়ে সমস্থ্য শরীর থেতলে দেয়। পরে সেখান থেকে তুলে এনে সৌরভের অফিস কক্ষে দুই দফা পেটানো হয়। সেখান থেকে কৌশলে পালিয়ে যায় হৃদয় হাসান শুভ। এক পর্যায়ে প্রকাশ্যে দিবালোকে জিসানকে প্রায় ১০ ফুট উচুঁ থেকে মাটিতে বেশ কয়েকবার আঁচরে ফেলা হয়।
পরে বালুর মাঠে গুরুতর অবস্থায় ফেলে রেখে চলে যায় সন্ত্রাসীরা। খবর পেয়ে পরিবারের লোকজন তাকে মুমুর্ষ অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন। ঘটনার পরের দিন শুক্রবার সকালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় জিসান মারা যায়। ঘটনার পর থেকেই হত্যার সঙ্গে জড়িতর এলাকায় মহড়া দিয়ে আতঙ্কের সৃষ্টি করে। ভয়ে কেউ প্রতিবাদ করার সাহস টুকুও পাচ্ছেনা। উল্লেখিতদের বিরুদ্ধে ছাত্রলীগের নাম ভাঙ্গিয়ে এলাকায় চাঁদাবাজি, ছিনতাই, জমি দখলসহ সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের অভিযোগ রয়েছে বলেও জানিয়েছেন এলাকাবাসী। এদিকে, আহত হৃদয় হাসান শুভ’র খোজ নিতে তার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তারাও সন্ত্রাসীদের ভয়ে আতঙ্কিত হয়ে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে গেছে।
প্রত্যক্ষদর্শী ফুলজান বেগম বলেন, ”উদ্ধারের সময় আহত জিসান বলছিলো আমার কোন অপরাধ নেই, আমাকে অন্যায় ভাবে পিটিয়ে ও আঁচরে আহত করা হয়েছে। পায়ে ধরেও রেহাই পাইনি আমি”। কথা গুলো বলার সময় আমিসহ আশ-পাশের লোকজন কান্না ধরে রাখতে পারেনি।
নিহত জিসান হোসেনের চাচি সুমি বেগম জানান, গোপাল হোসেনের ছেলে ইমন হোসেন, জিসান হোসেন ও মেয়ে মীম আক্তার রয়েছে। গোপাল হোসেন কান্দাপাড়া এলাকার ইইসরাফিল হাজীর বাড়িতে চাকুরি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন । গত তিন বছর আগেও বড় ছেলে ইমন হোসেন রুপসী এলাকায় ট্রাক চাপায় নিহত হয়। ছোট ছেলে জিসানকে হত্যা করার পর এখন বাবা গোপাল হোসেনসহ পরিবারের লোকজন হত্যার ভয়ে এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন। খুনিরা প্রভাবশালী হওয়ায় তারা গরীব ও অসহায় বলে মামলা মোকদ্দমা করতে সাহস পাচ্ছেননা। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে নিয়ে জিসানের লাশ জুরাইন কবরস্থানে দাফন সম্পন্ন করা হয়। ছেলে জিসানকে হারিয়ে বাবা গোপাল হোসেন ও মা রিনা বেগম পাগলের মতো হয়ে গেছে। ঠিক মতো কথা বলতে পারছেননা বাবা-মা। ছেলে হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমুলক শাস্তি দাবি করছেন তারা।
ভুলতা পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ ইন্সপেক্টর শহিদুল ইসলাম বলেন, নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা দিলে আমরা ব্যবস্থা নিতে পারি।