১৪, ডিসেম্বর, ২০১৮, শুক্রবার | | ৫ রবিউস সানি ১৪৪০

স্বপ্ন পূরণের গল্প

আপডেট: ডিসেম্বর ৬, ২০১৮

স্বপ্ন পূরণের গল্প

নিজের কথা বলে চললেন আলাউদ্দিন সোহেল। বাবা ব্যবসা করতেন কিন্তু ব্যবসায় বড় ধরনের লোকসান হয়ে যাওয়ার পরে আর ঘুরে দঁাড়াতে পারেননি। বাড়িতে সামান্য কিছু জায়গা-জমি রয়েছে ওগুলো দেখাশোনা করেন। টানাটানির সংসারে আমিই বড় ছেলে। এসএসসি পরীক্ষার পর থেকে পরিবারের ওপরে বসে না থেকে নিজেই কিছু একটা করার চিন্তা মাথায় ঘুর ঘুর করত এবং তখন থেকে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যাই করি না কেন নিজেই কিছু করবো ও নিজের পরিচয়ে পরিচিত হব। ২০০৯ সাল থেকে ২০১৫ সাল পযর্ন্ত কোচিং, মৎস্য খামার, মাকেির্টং ইত্যাদি ব্যবসা করেছিলাম, কিন্তু মূলধনের জোগান না থাকায় একটি ব্যবসাও আলোর মুখ দেখতে পারেনি। সবকটি ব্যবসায় লোকসান হওয়ার পরও আমি কখনো হতাশ হতাম না সব সময় ঘুরে দঁাড়ানোর চেষ্টা করতাম। এর ধারাবাহিকতায়Ñ

২০১৫ সালের ২০ জুলাই থেকে ওকে শপ বিডি নামে ই-কমাসর্ ব্যবসার আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করি। যদিও আমি মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়ছি কিন্তু ছোটবেলা থেকে আইটি নিয়ে কাজ করার প্রতি ছিল আমার প্রবল ইচ্ছে। সেই সুবাদে টুকটাক আইটি নিয়ে জানার চেষ্টা ছিল এবং কিছু ধারণাও ছিল। তখন সময়টা ছিল ২০১৫ সালের জুলাই মাসেরই মধ্যে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম ই-কমাসর্ ব্যবসা করব। আমার মনে হয়েছিল অল্প ইনভেস্টমেন্ট দিয়ে ই-কমাসর্ ব্যবসা করা আমার জন্য একদম পারফেক্ট। কিন্তু ওই সময়ে আমার কাছে মূলধন ছিল মাত্র ৫০০০ টাকা। সেই ৫০০০ টাকা মূলধন নিয়ে আবার নতুন করে নেমে পড়লাম ই-কমাসর্ ব্যবসায়। তখন আমি থাকতাম চট্টগ্রামে শুরু হলো আমার সংগ্রাম, দোকানে দোকানে ঘুরতে শুরু করলাম এবং দোকানদারদের সঙ্গে বলতে থাকি আমার একটা ই-কমাসর্ কোম্পানি আছে অনলাইনে পণ্য বিক্রি করে। তাদের পণ্যগুলো আমরা বিক্রি করতে চাই, কিন্তু আমরা ছবি তুলে নিয়ে আমাদের ওয?েবসাইটে আপলোড করব যদি বিক্রি হয় তাহলে টাকা দিয়ে কিনে নিয়ে যাবো। কিন্তু আমার এই আবদারে কেউ রাজি হয়েছিল আবার কেউ কেউ রাজি হতো না। কিন্তু আমার চেষ্টা কখনো থেমে থাকেনি, সঙ্গে আমার দুই বোনও আমাকে খুব ভালো সাপোটর্ দিতে থাকে। কেউ প্রোডাক্ট ডেসক্রিপশন লেখে আবার কেউ প্রোডাক্ট বিক্রির বিভিন্ন আইডিয়া দিয়ে। প্রথম ১ বছর তেমন একটা বিক্রি হতো না, এমনকি মাঝেমধ্যে অফিসের খরচই উঠে আসত না। এর মধ্যে ২০১৬ সালের প্রথম দিকে ই-ক্যাবের প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট শ্রদ্ধেয় রাজীব আহাম্মেদ ভাইয়ার সঙ্গে পরিচয় হয় এবং ভাইয়ার পরামশের্ চট্টঙ্গ্রাম থেকে ঢাকায় অফিস নিয়ে আসি। ঢাকায় আসার পর ৪ জন কমীর্ নিয়োগ দিলাম এবং পুরোদমে কাজে নেমে গেলাম, সঙ্গে কঠোর পরিশ্রম করা শুরু করলাম, এরপর থেকে আলহামদুলিল্লাহ আমার ই-কমাসর্ ব্যবসা খুব ভালো চলতে থাকে।

কিন্তু হঠাৎ ২০১৭ সালের ১৩ এপ্রিল বড় ধপ্রণর একটি দুঘর্টনার সম্মুখীন হই, ডাকাত দল অফিসের তালা ভেঙে অফিসের সব ল্যাপটপ এবং মূল্যবান ইলেক্ট্রনিক্স ডিভাইসসহ অফিসের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে গিয়েছিল। ওকে শপ বিডি ওই একটি দুঘর্টনায় ৭০% ইনভেস্টমেন্ট হারিয়ে ফেলে এবং চরম পযাের্য় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। কারণ ল্যাপটপের হাডির্ডস্কে ওকে শপ বিডির মহা মূল্যবান ডাটাসহ ক্রেতা-পরিবেশকদের তথ্য সংরক্ষিত ছিল যার আর কোনো রকম তথ্য অন্য কোথাও সংরক্ষিত ছিল না। মানসিকভাবে ভেঙে পড়লেও মনোবল শক্ত ছিল বলে আল্লাহর অশেষ রহমত এবং সবার দোয়া সঙ্গে ছিল বলে পরের ১ বছরে ওকে শপ বিডিকে ভালো একটি অবস্থানে নিয়ে আসা সম্ভব হয়েছে। ঠিক এই সময়ে ওকে শপ বিডিতে ১৫ জন কমীর্ কাজ করছেন। এর সঙ্গে আরও একটি অজর্ন বাংলাদেশ ইয়ুথ এন্টারপ্রাইজ অ্যাডভাইস অ্যান্ড হেল্পসেন্টার (বি’ইয়া) কতৃর্ক নিবাির্চত সেরা দশজন তরুণ উদ্যোক্তার একজন। পরিশ্রম, সততা, ধৈযর্ এবং মনোবল শক্ত রেখে লেগে ছিলাম বলে এতখানি পথ পাড়ি দিতে পেরেছি।

ওকে শপ নিয়ে আমার স্বপ্ন : ২০২১ সালের মধ্যে ওকে শপ বিডির একমাত্র লক্ষ্য হচ্ছে বাংলাদেশের প্রতিটা গ্রামে গ্রামে সাধারণ মানুষের মধ্যে পণ্যসেবা পৌঁছে দেয়া, নতুন নতুন পণ্যের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়া এবং তার সঙ্গে শতভাগ ক্রেতাদের বিশ্বাস অজর্ন করা। এবং বাংলাদেশের বেকার সমস্যা সমাধানে কমপক্ষে ২০০ জন নারী-পুরুষের কমর্সংস্থান সৃষ্টি করা। তার সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত স্বপ্ন বাংলাদেশের সেরা ১০টা ই-কমাসর্ কোম্পানির মধ্যে ওকে শপ বিডির অবস্থান তৈরি করা। ২০৩০ সালের মধ্যে কমপক্ষে ৭টি দেশে ওকে শপ বিডির সেবা চালু করা।

নতুনদের উদ্দেশ্যে : নতুন যারা ই-কমাসর্ ব্যবসায় আসতে চায় তাদের জন্য বলতে চাই ই-কমাসর্ ব্যবসা নিয়ে অন্তত ৬ মাস পড়াশোনা করুন। এবং আপনি যে আইডিয়া নিয়ে চিন্তা করছেন সে আইডিয়া নিয়ে আর কেউ কাজ করতেছে কিনা, বা আপনার কম্পিটিটর কারা ভালো করে অ্যানালাইসিস করুন। যদি কম্পিটিটর থাকে তা হলে আপনার পণ্য বা সেবা অন্যদের থেকে আলাদা করুন এবং মানুষ কেন আপনার থেকে পণ্য বা সেবা নেবে তা নিশ্চিত করতে হবে। ১০ বছর পরে নিজেকে কোথায় দেখতে চান তা এখন থেকে ঠিক করে নিতে হবে। ব্যবসাটাকে মন থেকে ভালোবাসতে হবে। প্রতিদিন সময় দিয়ে লেগে থাকতে হবে। একবার ফেল করলে বারবার চেষ্টা করুন মনে রাখবেন একবার ফেল করা মানে সফলতার দিকে এক ধাপ এগিয়ে যাওয়া। গ্রন্থনা : আলামিন হোসেন সূত্র : যায়যায়দিন।