১৪, ডিসেম্বর, ২০১৮, শুক্রবার | | ৫ রবিউস সানি ১৪৪০

একজন সাদামাটা মিরাজের গল্প

আপডেট: ডিসেম্বর ৪, ২০১৮

একজন সাদামাটা মিরাজের গল্প

তোমার একজন প্রিয় প্লেয়ারের নাম বল

– মিরাজ ।

–এবার একজন অলরাউন্ডারের নাম বল

–মিরাজ ।

– যে কোন একজন পরিশ্রমী প্লেয়ারের নাম বল

–মিরাজ ।

– এবার একজন ভালো মানুষী প্লেয়ারের নাম বল তো

– মিরাজ ।

আচ্ছা, এবার আমি তোমার পছন্দের মিরাজের ভবিষ্যত বলে দেব।

– বলো ।

– খুব সুখী হবে সে (মিরাজ) জীবনে ।

ক্যাপ্টেন হবে। আইডল হবে। মান রাখবে দেশের।

বিশ্বক্রিকেট গড়াগড়ি খাবে, লুটাবে পদতলে।

সোনায় মোড়ানো মুকুট, বাহুতে আর্মব্যন্ড, কপাল জুড়বে লাল-সবুজের পতাকা!

একহাতে ঝাণ্ডা, অন্য হাতে তলোয়ার (ব্যাট) ; আমৃত্যু লড়বে।

তার একগ্রতা, নির্ঝঞ্ঝাট-মনোবাসনা হবে দেশের তরে। সকলের তরে।

মেহেদী হাসান মিরাজ। যাকে উদ্দেশ্য করে উপরের সংল্পাপগুলো। যার নামের বিশেষণে স্থান পাওয়ার যোগ্য শব্দগুলো-নির্ঝাঞ্জাট, সরলতা, নেতৃত্ব, পাগলাটে ও চনমনে। আরো অনেক বিশেষণ থাকতে পারে! তিনি বেশ নির্ঝঞ্ঝাট কিসিমের। কথায় কথায় হাসেন। যদিও কথা সাহিত্যিক হুমায়ন আহমেদের ভাষায়, ‘যারা খুব বেশি হাসে তাদের হাসি হয় কূৎসিত। কান্নাতেই নাকি সোন্দর্য্য।’ কিন্তু মিরাজের ব্যাপারটি ভিন্ন। হাসিতে তাকে দারুণ মানায়। মায়ার আবহে গড়া স্রষ্টার অপরুপ সৃষ্টি এই তরুণ। তিনি হাসেন, কখনো-সখনো গড়াগড়ি খেয়ে পড়েও যান। তার এবড়ো-থেবড়ো চাল-চলন ডাল-ভাতের মতো সাদাসিদে। মোটেও বার্মুডা ট্রায়াঙ্গাল কিংবা গ্রান্ড ক্যানিয়নের মতো রহস্যেঘেরা নয়।

মিরাজ সাদামাটা। তবে চনমনে। মাঠের বাইরে যেমন, সবুজ গালিচায়ও তেমন। ২২ গজে ব্যাটিংয়ের সময়ও তিনি ফানি ক্যারেক্টার-চার্লি চ্যাপলিন। তবে প্রতিপক্ষের বুক ঝাঁঝড়া করে দেয়া দক্ষ তীরন্দাজ। পেশাদারিত্ব কখনো-সখনো বাপ-ভাইকে হারিয়ে দেয়, এড়িয়ে চলতে বাধ্য করে। সেক্ষেত্রে ‘জিরো টলারেন্স’ মিরাজ।

২০১৬ সালে বিশ্বক্রিকেটে পা দেওয়া মিরাজকে দেখে বোঝার উপায় নেই মাত্র দুইবছর তার আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পথ চলা। সেদিন তো মুশফিক বলেই দিলেন, সে (মিরাজ) এক অদ্ভুত ক্যারেক্টার। মাঠের সময়টুকুতে তাতিয়ে রাখে সবাইকে। মাঝে-মধ্যে সিনিয়রদের পড়া দেন, আদায় করে ছাড়েন। এভাবে নয়-ওভাবে। সতীর্থের ক্যাচ মিসের পর কষ্টটা যেন তারই বুঝে লাগে। উজ্জীবিত করার তাড়নায় বারবার গিয়ে সান্তনা দেন। বোঝান, এক ক্যাচ মিসে কিছু আসে যায় না। আর খেলা চলাকালে যে বোলারই উইকেট পায় না কেন, মিরাজের উদযাপন বলে দেয় তিনই আউট করেছেন।

দুই বছরে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সঙ্গে পথচলায় তার সঙ্গী ১৮টি টেস্ট। যাতে জ্বলজ্বল করছে ৮৪ উইকেট। পেছনে ফেলেছেন আদর্শ মাশরাফিকে। ফেলার অপেক্ষায় তাইজুল-সাকিব-রাজ্জাকদের। ওই যে বলেছিলাম, ফানি ক্যারিক্টার কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে জানবাজ সৈনিক। প্রথম কাতারের যোদ্ধা। সেটা প্রমাণ করেছেন ক্যারিবিয়ানদের বিপক্ষে সবশেষ ঢাকা টেস্টেও। দুই ইনিংসে সাত-পাঁচ মিলিয়ে ১২টা বাজিয়ে ছেড়েছেন ওয়েস্ট ইন্ডিজকে। আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের প্রথম টেস্টে বিস্ময় জাগানো এই তরুণ সাত উইকেট তুলে ম্যাচসেরার পুরস্কার না পেলেও ঠিকই সবার মন জয় করে নেন। সেবার সাগরিকায় সবুজাভ উইকেটের নিচে পুঁতে রাখা বিধ্বংসী স্পিন মাইনফিল্ডের আসল নায়ক হয়ে ওঠেন মিরাজ। তার বিষাক্ত স্পিনবিষেই নীল হয়েছিল জো রুট-স্টোকসদের শরীর। ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি’র গগণবিধারী চিৎকারে জহুর আহমেদের আকশ-বাতাস মাথায় উঠেছিল। ক্যারিয়ারের প্রথম সেশনে ৬ উইকেট তুলে বিশ্বক্রিকেটে ওয়েটফুল বার্তা দিয়েছিলেন, ‘আসছি আমি। প্রস্তুত থেক বিশ্ব।’

তিনি এসেছেন। তিনি খেলছেন এবং তিনি বিশ্বজয় করছেন। যেমনটা তার হাত ধরে অনূর্ধ্ব ১৯ দল বিশ্ব কাতারে পৌঁছেছিল। পিনাক-নাঈমদের সঙ্গে দারুণ রসায়ন ঘটিয়ে বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার সুযোগ লাভ করিয়েছিলেন বাংলাদেশকে। আর তাই মাশরাফি-সাকিব যুগের অবসানে বাংলাদেশের ভবিষ্যত অধিনায়ক হিসেবে মিরাজকেই দেখতে পান অনেকে। তার মধ্যে ‘নেতৃত্বগুণ’ ব্যাপারটা আছে, যেটা জাতীয় দলের সিনিয়র অনেকের কাছে অনুপস্থিত। তাই তো বেশ কিছুদিন আগে সাকিব-তামিমের অনুপস্থিতি অনেকের ভাবনাতে আসে এই বুঝি দায়িত্ব পাচ্ছেন মিরাজ। কিন্তু সে পর্যন্ত ব্যাপারটি ব্যাট-বলে হয়নি। কিন্তু তিনি যে বাংলাদেশের আগামীর কাণ্ডারি তা জানা হয়ে গেছে অনেকের।

স্পিন বিষে প্রতিপক্ষকে বিবশ করা মিরাজ একসময় ব্যাট হাতেও ছিলেন দুর্ভেদ্য। ব্যাট চালাতে পারতেন, খেলতেন টপঅর্ডারে। মোনালিসার মতো তার ব্যাটিং নিঁখুত না হলেও দলকে ঠিকই রান এনে দিতে পারতেন সবসময়। কিন্তু ধীরে ধীরে স্পিনার বনে যাওয়ায় খানিকটা ফিকে হয়ে যায় মিরাজের আলো। ওয়ানডেতে প্রত্যাশীত পারফর্ম নেই। বয়সভিত্তিকে দাপুটে মিরাজকে ‘ব্যাটসম্যান’ স্বত্ত্বা হয়ে পড়ে রংহীন। তবে সম্প্রতি তিনি রানে ফিরেছেন। স্কোরকার্ড বলছে, লোয়ার অর্ডারে নামা মিরাজ ধীরে ধীরে সোনালী সুদিনের পথে ফিরছেন।

নাছোড়বান্দা, পরিশ্রমী মিরাজের ৮৮ পরিণত হোক ৫০০ উইকেটে! তার ব্যাটে ফুল ছন্দন ফুটুক। ব্যাট কথা বলুক দেশের তরে। ঘূর্ণি স্পিন বিষে মারা পড়ুক প্রতিপক্ষ। তার নীল নকশা, মেধায় এগিয়ে যাক বাংলাদেশ। এটাই কামনা। সবশেষে বলতে চাই ঊষার দুয়ারে হেনে আঘাত, মিরাজ আনুক রাঙা প্রভাত।