প্রতারণার হাজারটা অভিযোগ থাকলেও, তার চুলটাও কেউ বাঁকা করতে পারেনি!

দেওয়ানবাগী পীরের উত্থান ঠিক কবে থেকে, সেটা নিয়ে একাধিক মত আছে। তবে মোটামুটি আশির দশক থেকেই রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে বাংলাদেশ ব্যাংক ভবনের পেছনে বড়সড় জায়গায় তার জাঁকিয়ে বসা শুরু। পীরের তো মুরিদের অভাব হয় না, দেওয়ানবাগী নিজেকে পীর হিসেবে ঘোষণা করার পরেও মুরিদের অভাব হলো না। এই দেশে বাপে খেদানো মায়ে তাড়ানো অকাজের ঢেঁকি টাইপের লোকজনের তো অভাব নেই, সেরকমই অনেকে তার মুরিদ হয়ে গেল, দুইবেলা অন্নের ব্যবস্থা তো হচ্ছে তাতে!

অনেকেই তাকে আদর করে ডাকে ‘খোদার খাসি’। শরীরের বিশাল সাইজের কারণেই এই নাম দেয়া। তবে তার ভক্ত-আশেকানদের কাছে তিনি হচ্ছেন স্রষ্টার পাঠানো বিশেষ দূত। মাথামোটা লোকগুলো তাকে নবীর মতো সম্মান করে, ক্ষেত্রবিশেষে মহানবীর চেয়েও ওপরের আসনে তুলে ফেলে(নাউজুবিল্লাহ)! ঢাকা শহরের একদম কেন্দ্রস্থল মতিঝিলে বিশাল একটা জায়গা জুড়ে তার আস্তানা, যে শহরে মানুষের পা রাখার জায়গা নেই সেখানে তিনি উটের খামার গড়ে তুলেছেন! মুরিদদের কাছে তার পরিচয়, তিনি দেওয়ানবাগী পীর মাহবুবে খোদা! তবে বেশিরভাগ লোকজন তাকে ধর্ম ব্যবসায়ী এক ভণ্ড প্রতারক হিসেবেই জানে। অবাক করার মতো ব্যাপার হচ্ছে, প্রতারণার হাজারটা অভিযোগ থাকলেও, আজ পর্যন্ত তার চুলটাও বাঁকা করতে পারেনি কেউ!

দেওয়ানবাগীর জন্ম ব্রাক্ষ্মণবাড়ীয়ায়, সম্ভবত ১৯৪৯ সালে। নিজেকে আগে কখনও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরিচয় দিতো না সে, তবে ২০০৮ সালের নির্বাচনে জিতে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকে নামের আগে দশ-বারোটা টাইটেলের সঙ্গে ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’ টাইটেলটাও যুক্ত করে নিয়েছেন তিনি। দেওয়ানবাগী পীর তো এমঅনটাও দাবী করেন যে, তার ভবিষ্যতবাণীর কারণেই নাকি বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল! আরামবাগ-কমলাপুর থেকে শুরু করে মুগদা-বাসাবো আর মতিঝিলের রাস্তার পাশে দেয়ালগুলো তার ‘আশেকে রাসুল (সা) সম্মেলনের বিজ্ঞাপনে ভরে যায়। কি হয় এসব সম্মেলনে?

কয়েকশো মাইক লাগিয়ে সেখানে দেওয়ানবাগীর মহৎ গুণাবলী প্রচার করা হয়, বাজানো হয় তার রেকর্ডেড বক্তব্য। তিনি নিজেও বক্তৃতা করেন, দাবী করেন, প্রায়শই নাকি নবীজির সাথে তার দেখা সাক্ষাত হয়! মাঝে মধ্যে আল্লাহ্‌র সাথেও তার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বাৎচিত হয়! এসব কথাবার্তা শুনলে কার মেজাজটা না গরম হবে? কিন্ত মাথায় গোবরের দলা নিয়ে বসে থাকা তার কয়েকশো মুরিদ এগুলো শুনে উল্টো উৎফুল্ল হয়ে ওঠে! দেওয়ানবাগী পীরের নামে জয়ধ্বনি দেয়!

শুধু যে ওয়াজ-বক্তৃতাই করেন দেওয়ানবাগী, এমনটা নয়। হাদীয়ার বিনিময়ে ভবিষ্যতবাণীও করতেন একটা সময়ে, ইদানিং অসুস্থ থাকায় সেটা বন্ধ আছে। দেওয়ানবাগী শরীফ থেজে তার চিন্তাভাবনাগুলো নিয়ে বইও লিখেছেন তিনি, সেসব বই পড়লে অনেকের পায়ের রক্ত মাথায় উঠে যেতে পারে, দেওয়ানবাগীকে বদ্ধ উন্মাদও ভাবতে পারেন অনেকেই। তার লেখা বই থেকে দুটো অনুচ্ছেদ শোনানো যাক আপনাদের।

১. “একদা আমি(দেওয়ানবাগী) স্বপ্নে দেখিলাম, ঢাকা এবং ফরিদপুরের মধ্যবর্তী স্থানে এক বিশাল বাগানে ময়লার স্তূপের উপর বিবস্ত্র অবস্থায় নবীজীর প্রাণহীন দেহ পড়ে আছে। মাথা দক্ষিন দিকে, পা উত্তর দিকে প্রসারিত। বাম পা হাঁটুতে ভাঁজ হয়ে খাড়া আছে। আমি তাহাকে উদ্ধারের জন্য পেরেশান হইয়া গেলাম। তাহার বাম পায়ের হাঁটুতে আমার ডান হাত দিয়ে স্পর্শ করার সাথে সাথে দেহে প্রাণ ফিরে এল। এবং তিনি আমাকে বলিলেন, ”হে ধর্মের পুনর্জীবনদানকারী, ইতিপূর্বে আমার ধর্ম পাঁচবার পুনর্জীবন লাভ করেছে।” (সূত্র: রাসূল কি সত্যিই গরিব ছিলেন-দেওয়ানবাগ থেকে প্রকাশিত)

২. “আমার অসংখ্য মুরিদান স্বপ্ন ও কাশফের মাধ্যমে আল্লাহর দীদার লাভ করেছে। আমার স্ত্রী হামিদা বেগম ও আমার কন্যা তাহমিনা এ খোদা স্বপ্নের মাধ্যমে আল্লাহকে দাড়ী গোফ বিহীন যুবকের ন্যায় দেখতে পায়।” (সূত্রঃ আল্লাহ কোন পথে : ২৩)

৩. সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি বলেন “শুধু আমি নই, আমার স্ত্রী কন্যা সহ লক্ষ্য লক্ষ্য মুরিদানও আল্লাহকে দেখেছেন” (সূত্র: সাপ্তাহিক দেওয়ানবাগ)

৪. “দেওয়ানবাগে আল্লাহ ও সমস্ত নবী রাসূল, ফেরেস্তারা মিছিল করে এবং আল্লাহ নিজে শ্লোগান দেন।” (সূত্র: সাপ্তাহিক দেওয়ানবাগ, মার্চ ১৯৯৯)

আল্লাহ নাকি রাসূল (সা) কে নির্দেশ দিয়েছেন, দেওয়ানবাগীকে সঙ্গে নিয়ে জান্নাতের পথে মিছিল করতে! দেওয়ানবাগী হুজুরের হজ করার প্রয়োজন হয় না, কারণ মহানবী তাকে স্বপ্নে দেখা দিয়ে বলেছেন, কাবা শরীফকে নিয়ে তিনি নাকি সর্বক্ষণ দেওয়ানবাগীর সঙ্গেই থাকেন! এমন উদ্ভট আর অযৌক্তিক সব কথাবার্তা শুনলে লোকটাকে পাগল বা মস্তিস্কবিকৃত হিসেবে আখ্যা দিতে পারেন অনেকেই। কিন্ত বাস্তবতা হচ্ছে, এসব কথাবার্তা বলেও দেওয়ানবাগী পীর মতিঝিলের মতো জায়গায় সফলভাবেই তার ধর্মব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন যুগের পর যুগ ধরে।

এমপি-মন্ত্রী থেকে শুরু করে বড় বড় রাজনৈতিক নেতা, আর্মি অফিসার, পুলিশের বড় কর্তা কিংবা সরকারী আমলা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরাও আছেন তার মুরিদের লিস্টে। এতসব শিক্ষিত লোকজন যখন বুঝে বা না বুঝে এই ধর্মব্যবসায় শামিল হয়ে যান, তখন করার আর কিছুই থাকে না। দেওয়ানবাগীর এসব ভণ্ডামির বিরুদ্ধে তাই কেউ জোন ব্যবস্থাও নেয় না, কারণ সব জায়গাতেই তার লোকজন আছে! উটের দুধ আর মুত্র বিক্রি করেই প্রতিবছর কোটি কোটি টাকা আয় হয় তার। লোকজন মানত করে তার দরবারে এসে, সদকা হিসেবে টাকা পয়সা থেকে শুরু করে গরু-ছাগল-মুরগী, আরও কত কিছু যে দান করে যায়, সেসবের কোন ইয়ত্তা নেই।

ইসলাম শান্তির ধর্ম, তবে এই ধর্মটাকে উপমহাদেশে ব্যবসা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছে অনেকেই। নিজের সুবিধামতো ইসলামের উল্টোপাল্টা সংজ্ঞা আর নিয়মকানুন বের করে সেই মোতাবেক ধর্মপালন করছে তারা। নিজেদের নবী-রাসূল পর্যন্ত ঘোষণা করে দিতে দ্বিধাবোধ করছে না। আর এসবের উদ্দেশ্য একটাই, মানুষজনকে ধর্মের জুজু দেখিয়ে বোকা বানিয়ে টাকার পাহাড় গড়া। ধারণা করা হয়, স্থাবর আর অস্থাবর মিলিয়ে দেওয়ানবাগী পীরের মোট সম্পত্তির মূল্যমান প্রায় কয়েক হাজার কোটি টাকা, কিন্ত দুদক কোনদিন এই অবৈধ সম্পত্তির খোঁজ পাবে না, পেলেও সেই তদন্তকে বাধাগ্রস্ত করার সব চেষ্টাই করা হবে নিশ্চয়ই। অসাধু লোকজনই যে এদেশে বেশি ক্ষমতাবান। আর তাই লালসালুর মজিদেরা হারিয়ে যায় না, তারা টিকে থাকে দেওয়ানবাগীদের মাঝেই।

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর