১৪, ডিসেম্বর, ২০১৮, শুক্রবার | | ৫ রবিউস সানি ১৪৪০

আ.লীগের রাজনীতিকদের ‘বৃদ্ধাশ্রম’ গণফোরাম

আপডেট: নভেম্বর ২৯, ২০১৮

আ.লীগের রাজনীতিকদের ‘বৃদ্ধাশ্রম’ গণফোরাম

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে হিড়িক চলছে রাজনৈতিক নেতাদের দল বদলের। কাঙ্ক্ষিত দলে মনোনয়ন না পেয়ে অনেক নেতা যোগ দিচ্ছেন অন্য দলে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের মনোনয়নবঞ্চিতরা যাচ্ছেন প্রতিপক্ষ বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্টে।

অন্যদিকে বিএনপি থেকে যোগ দিচ্ছেন আওয়ামী লীগে ও দলটির বর্তমান মিত্র বিকল্পধারার নেতৃত্বে গঠিত যুক্তফ্রন্ট্রে। দল বদলের রাজনীতিতে সবচেয়ে আলোচিত আওয়ামী লীগের সাবেক শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেনের গড়া দল গণফোরাম।

দেশের প্রাচীন ও প্রধান দল আওয়ামী লীগ ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের পরিকল্পনা থেকে তরুণদের প্রাধান্য দিচ্ছে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিভিন্ন সংসদীয় আসনে মনোনয়নও দেওয়া হচ্ছে সে আলোকে। এতে দলের মনোনয়ন থেকে বাদ পড়ছেন জ্যেষ্ঠ অনেক নেতা। দলের গঠনতন্ত্রবিরোধী কর্মকাণ্ড এবং এক এগারোর সেনাসমর্থিত সরকারের আমলে বিতর্কিত ভূমিকায় কোণঠাসা দলের কয়েক নেতা। জ্যেষ্ঠ এসব নেতার মধ্যে কয়েকজন গণফোরামে যোগ দিয়েছেন। আরো কয়েকজনের গণফোরামে যোগ দেওয়ার ‘গুজব’ আছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, ক্ষমতালিপ্সা থেকেই এমনটি হচ্ছে। গণফোরামও হয়ে উঠছে রাজনীতিবিদদের, বিশেষ করে আওয়ামী লীগের নেতাদের ‘রাজনৈতিক বৃদ্ধাশ্রম’ ও বঞ্চিতদের শেষ ঠিকানা। বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনী আইনের পরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে মনোনয়ন পাওয়ার লোভে সহজেই রাজনৈতিক দল পরিবর্তনের ঘটনা ঘটছে।

নির্বাচনী আইনে বিধান ছিল, কোনো রাজনৈতিক দল থেকে নির্বাচনে অংশ নিতে ওই দলে কমপক্ষে তিন বছর থাকতে ও কাজ করতে হবে। ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ওই বিধান বিলোপ করায় এবারের নির্বাচনের আগমুহূর্তে প্রার্থিতা প্রত্যাশীদের রাতারাতি দল বদলের জোয়ার। মনোনয়নের নিশ্চয়তা কোনো দল বা জোটে মিলবে প্রত্যাশীদের অনেকে এখন এ হিসাব কষতে ব্যস্ত। এরই মধ্যে অঙ্ক মিলে যাওয়ায় নিজ দল ছেড়ে অন্য শিবিরে যোগ দিচ্ছেন তারা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘অনেকে আদর্শকেন্দ্রিক রাজনীতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন। তারা মূলত রাজনীতি করছেন নিজের স্বার্থে। নিজের স্বার্থে রাজনীতি করেন বলেই নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারা, জয় পাওয়া ও অন্য কোনো স্বার্থে তারা সম্পূর্ণ বিপরীত বিশ্বাসের রাজনৈতিক দলে যোগ দিতে পারছেন।’

গণফোরামের অনেক নেতাকর্মী একসময় কোনো না কোনোভাবে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। আওয়ামী লীগে ‘মূল্যায়নহীন, কোণঠাসা’ নেতারা ‘ক্ষোভ’ নিয়ে বিভিন্ন সময় দলটিতে যোগ দেন। একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের মনোনয়নবঞ্চিত কয়েকজনের গণফোরামে যোগ দেওয়া ও যোগ দিতে পারেন বলে রটনা রাজনীতিতে দারুণ আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।

আওয়ামী লীগের মনোনয়ন না পেয়ে গণফোরামে যোগ দেন অধ্যাপক আবু সাইয়িদ। পাবনা-১ আসনে এবার আওয়ামী লীগের মনোনয়ন আশা করেও পাননি। গত সোমবার গণফোরামে যোগ দেন তিনি। আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী আবু সাইয়িদ ওই দলের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেন।

১৯৯৬ সালের নির্বাচনে পাবনা-১ আসনে জামায়াতের শীর্ষনেতা ও যুদ্ধাপরাধের দায়ে ফাঁসির রায় কার্যকর হওয়া মতিউর রহমান নিজামীকে হারিয়ে সংসদ সদস্য হন সাইয়িদ। ২০০১ সালের নির্বাচনে পরাজিত হন। জরুরি অবস্থার সময় সংস্কারপন্থি হিসেবে চিহ্নিত সাইয়িদ দলীয় পদ হারানোর পর ২০০৮ সালের নির্বাচনে মনোনয়নও পাননি।

মনোনয়ন পেতে গণফোরামে যোগ দেন মেজর জেনারেল (অব.) আমছা আমীন। কুড়িগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের নেতা আমছা আমীন দলের প্রার্থী হিসেবে ২০০১ সালে কুড়িগ্রাম-২ আসন থেকে নির্বাচন করে পরাজিত হন। তিনি জেলা পরিষদের প্রশাসকেরও দায়িত্ব পালন করেন।

সাবেক অর্থমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের প্রয়াত নেতা শাহ এ এম এস কিবরিয়ার ছেলে অর্থনীতিবিদ ড. রেজা কিবরিয়া একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হতে গণফোরামে যোগ দিয়েছেন। ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারির নির্বাচনে (যা পরে হয়নি) তিনি হবিগঞ্জ-১ আসনে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্যপদে প্রার্থী ছিলেন। এক এগারোর সময় সংস্কারপন্থিদের দলে থাকায় তরুণ এ নেতাও আওয়ামী লীগে কোণঠাসা ছিলেন।

আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক পরিকল্পনামন্ত্রী এ কে খন্দকারেরও গণফোরামে যোগ দেওয়ার কথা চলছে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে অংশ নিয়ে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০১৪ সালে তার বই ‘১৯৭১ : ভেতরে বাইরে’ প্রকাশিত হয়। এতে প্রকাশিত কিছু তথ্যের কারণে ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ আনেন আওয়ামী লীগের নেতারা।

একসময় আওয়ামীপন্থি হিসেবে পরিচিত ও একুশে টেলিভিশনের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুস সালামও সম্প্রতি গণফোরামে যোগ দিয়েছেন।

তথ্যমতে, গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল হোসেন একসময় আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ছিলেন। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের জন্য দলের ভেতরে কোণঠাসা হতে থাকেন তিনি। ১৯৯২ সালের মার্চে আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভায় ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন ড. কামাল। ১৯৯৩ সালের ২৯ আগস্ট গঠন করেন গণফোরাম।

দলটির সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসীন মন্টুও আওয়ামী লীগের সাবেক নেতা। একসময় তিনি আওয়ামী লীগের ঢাকা মহানগরের সভাপতি ও যুবলীগ নেতা ছিলেন। ১৯৮৬ সালে আওয়ামী লীগের হয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়ে জয়ী হন তিনি।

গণফোরামের আরেক নেতা সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদও ছাত্রলীগের সভাপতি হিসেবে ডাকসুর ভিপি নির্বাচিত হন। তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক। আওয়ামী লীগের টিকেটে নির্বাচন করেন মৌলভীবাজারে।