দল-জোটে ভোটের খেলা

নির্বাচন কমিশনের ঘোষণা অনুযায়ী, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে ডিসেম্বরে। নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এখন চলছে জোট গঠনের খেলা। আর জোট গঠনের মূল কারণ নির্বাচনে বেশি ভোট পেয়ে জয়লাভ করা। আওয়ামী লীগ এবং বিএনপিকে কেন্দ্র করে ছোট ছোট রাজনৈতিক দলগুলো জোটবদ্ধ হচ্ছে। বর্তমান রাজনীতিতে সমমনা দলের সঙ্গে নির্বাচনী জোট গঠনের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।

জোট ছাড়া আজকাল ভোট হয় না বলেই মনে হচ্ছে। উন্নত দেশ হোক আর অনুন্নত দেশ হোক সবখানেই এখন জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচনে লড়ছে রাজনৈতিক দলগুলো। একটি দল যতই উন্নয়ন করুক, মানুষের জন্য যত ভালো কাজই করুক না কেন, তবু নির্বাচন করতে হলে তাদের মনে দুশ্চিন্তা জাগে জয়ের নিশ্চয়তা নিয়ে। বাংলাদেশে ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ভারতবর্ষের বিজেপি ও কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন জোট নির্বাচন, জার্মানির বর্তমান ক্ষমতাসীন অ্যাঙ্গেলা মের্কেলও জোটবদ্ধ নির্বাচনেরই ফসল। অর্থাৎ প্রাচ্য বলি আর পাশ্চাত্য বলি, সবখানেই জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচনের রেওয়াজ চালু হয়েছে। এটা এক অর্থে ভালো লক্ষণ, আবার আরেক অর্থে খারাপও বটে। ভালো এই অর্থে, শরিক দলের চাপে নির্বাচিত সরকার যা ইচ্ছে তা করতে পারে না। তাদের সব সময় একটি সতর্কাবস্থার মধ্যে থাকতে হয়। উন্নয়ন ও জনকল্যাণমূলক কাজ করতে হয়। জোটের খারাপ দিক হলো- যেসব দলের ১ শতাংশও ভোট নেই, এককভাবে নির্বাচন করলে যাদের পরাজিত হওয়ার সম্ভাবনা শতভাগ, জামানত হারানো ভয় থাকে, সেসব দলকেও অনেক সময় বেশি গুরুত্ব দিতে হয়। ক্ষমতার ভাগ দিয়ে তাদের বশে রাখতে হয়। শরিক দলের প্রেসারে বৃহৎ দলটি সারাক্ষণ মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে থাকে। ছোট ছোট দলের নেতাদের ব্যর্থতাও বড় দলটিকে বহন করতে হয়। ছোট দলের কর্মকাণ্ডের দায়ভার বড় দলের ঘাড়ে এসে পড়ে। বর্তমানে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ভোট ও জোটের খেলা শুরু হয়ে গেছে। ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য বৃহৎ ঐক্য গঠনের দিকে মনোযোগ দিচ্ছে প্রধান দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি।

বিরোধী দলগুলোর বৃহত্তর ঐক্য গড়ার প্রক্রিয়াকে মুখে স্বাগত জানালেও ভেতরে ভেতরে দুশ্চিন্তায় আছে আওয়ামী লীগ। বিশেষ করে, এই জোটে বিএনপির অন্তর্ভুক্তির তৎপরতা দুশ্চিন্তা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। কারণ এর মাধ্যমে কোণঠাসা বিএনপি সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পাবে।

জানা গেছে, বিকল্পধারার সভাপতি বদরুদ্দোজা চৌধুরী ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন বৃহত্তর ঐক্যের যে তৎপরতা চালাচ্ছেন, তা নিয়ে আওয়ামী লীগ বেশ সতর্ক। বিশেষ করে, ঐক্যে বিএনপির অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে দলটির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রভাব কতটা পড়বে, এটা নিয়েই তাদের মূল চিন্তা। আর জামায়াতে ইসলামীকে বাদ না দিয়ে কৌশলে সঙ্গে রাখা হচ্ছে কি না, এটাও সরকারি দলের ভাবনায় আছে।

সরকারের মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও নেতাদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই একটা ধারণা বিদ্যমান যে বিএনপি ভাঙবে। বিশেষ করে, দলটির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাগারে গেলে তার দলে ভাঙন নিশ্চিত। খালেদা জিয়া কারাগারে থাকলে বিএনপি নির্বাচন বর্জন করতে পারে এবং এর ফলে দলটিতে ভাঙন ধরবে এমন ধারণাও ছিল প্রবল। কিন্তু গত আট মাসেও সে রকম কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। এই অবস্থায় বৃহত্তর ঐক্যের নামে যে তৎপরতা চলছে, তাতে বিএনপির অন্তর্ভুক্তি দলটির ভাঙন ঠেকিয়ে দেবে বলেই মনে করছেন সরকারি জোটের নেতারা। শুধু তা-ই নয়, এর মাধ্যমে বিএনপি নতুন শক্তি সঞ্চয় করার সুযোগ পাবে। শেষমেশ খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানই জোট নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, এমন আলোচনাও হচ্ছে আওয়ামী লীগ ও সরকারের মধ্যে।

এ ছাড়া জামায়াতকে বাদ দিয়ে বৃহত্তর ঐক্যের যে কথা বলা হলেও পরোক্ষভাবে জামায়াত সরকারবিরোধী জোটে থেকেই যাবে।
আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দল ইতোমধ্যে ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ ও তার স্ত্রী রওশন এরশাদও আওয়ামী লীগের সঙ্গেই থাকার আশ্বাস দিয়েছেন। ধর্মভিত্তিক দল ইসলামিক ফ্রন্ট সরকারি জোটে থাকার কথা জানিয়েছে। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) নেতৃত্বাধীন আট দলের জোটকেও কাছে টানতে চায় আওয়ামী লীগ।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নেপালে বিমসটেক সম্মেলনে অংশ নিয়ে দেশে ফিরে সংবাদ সম্মেলনে বদরুদ্দোজা চৌধুরী, কামাল হোসেনসহ অন্য নেতাদের ঐক্য প্রক্রিয়াকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। তবে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী সূত্র জানায়, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের কর্তৃত্বহীন এবং জামায়াতমুক্ত জোট হলেও সরকার এই জোটকে বেশ গুরুত্বসহকারে পর্যবেক্ষণ করছে।

জানা গেছে, গণফোরাম, যুক্তফ্রন্ট ও বিএনপির বৃহত্তর ঐক্য কিছুটা থমকে আছে। এ জন্য জামায়াতকে দায়ী মনে করা হচ্ছে। এরপরও বিএনপির নীতিনির্ধারকরা এখনো বৃহত্তর ঐক্যের আশা ছাড়েননি। শেষ পর্যন্ত যদি বড় ঐক্য গঠিত না হয়, তাহলে যারা থাকবে তাদের নিয়েই এগোবে বিএনপি।

গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন সাংবাদিকদের বলেছেন, জামায়াতে ইসলামী থাকলে তারা বিএনপির জোটে যাবেন না। অবশ্য তিনি একথাও বলেছেন, জামায়াত এখন আর কোনো নিবন্ধিত দল না। ফলে তাদের (জামায়াত) কারও সঙ্গে জোটবদ্ধ আন্দোলন বা নির্বাচনের কোনো সুযোগ নেই।

আর বিকল্পধারার নেতা মাহী বি চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেছেন, বিএনপি ২০-দলীয় জোটে জামায়াতকে রাখলে বিকল্পধারা সেই ঐক্যে থাকবে না।

এ বিষয়ে যুক্তফ্রন্টের মুখপাত্র মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, লিখিত অঙ্গীকার করে আমরা কোনো স্বাধীনতাবিরোধী চক্রের সঙ্গে ঐক্য করব না। আমরা ঐক্য করছি বিএনপির সঙ্গে, ২০ দলের সঙ্গে নয়। এখন বিএনপি কার সঙ্গে চলে, ঘোরে, এটা আমাদের দেখার বিষয় না।

এ প্রসঙ্গে বিএনপিপন্থী বুদ্ধিজীবী গণস্বাস্থ্যকেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেছেন, নির্বাচনী ঐক্যটা হবে বিএনপির সঙ্গে, জোটের সঙ্গে নয়।

You might also like