উদাহরণ হতে চায় জাতীয় ঐক্য

বাংলাদেশেররাজনীতিতে উদাহরণ সৃষ্টি করতে চায় জাতীয় ঐক্য বা বৃহত্তর ঐক্য। হানাহানি, ষড়যন্ত্র, বিরোধ-সংঘাত, বিরোধীদের দমনপীড়ন নির্ভর যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি এখানে বছরের পর বছর ধরে চলছে তার অবসান ঘটিয়ে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপনের স্বপ্ন দেখছে গঠিত হতে যাওয়া নতুন এ জোটটি।

এ লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য ভিন্ন মতাদর্শের রাজনৈতিক দলগুলো নিয়ে অনেকটা মালয়েশিয়া মডেলের নির্বাচনী জোট গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন এ জোটের নীতিনির্ধারকরা। ক্ষমতায় যেতে পারলে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করার পাশাপাশি বেকারত্ব ও দুর্নীতি দূর করা, শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টির জন্য কারজ করতে চায় তারা। একটা ঐক্যমতের সরকার প্রতিষ্ঠা করার রূপকল্প নিয়ে ভাবছেন তারা। এ জন্য অন্তত দুই বছরের জন্য বিএনপিকে তাদের কাছে ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়ার কথা বলছেন তারা। এ সময়ের মধ্যে তারা রাজনীতিতে সংস্কারমূলক কাজগুলো করে একটি মডেল স্থাপন করবেন তারা। ওই মডেলে দেশ চালানোর জন্য এরপর বিএনপির কাছে ক্ষমতা ছেড়ে দেবেন তারা।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তনের লক্ষ্যে গত বছরের শেষদিক থেকে সরকারের বাইরে থাকা রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তিদের নিয়ে জোট গড়ার প্রচেষ্টা চলে আসছে। বিকল্পধারা বাংলাদেশ, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) ও নাগরিক ঐক্য মিলে এ জন্য যুক্তফ্রন্ট নামে একটি জোট গড়ে তোলে। প্রবীণ আইনজীবী ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন যুক্তফ্রন্ট নামে ওই জোটে যুক্ত হবেন কিনা হবেন তা নিয়ে গত মাসে বেশ জল্পনা-কল্পনা চলে। এরপর গণফোরাম জানায় যুক্তফ্রন্টে যুক্ত না হলেও এ জোটের সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করবে তারা। একই সমান্তরালে রাজনৈতিক অঙ্গনে সরকারবিরোধী দলগুলোকে নিয়ে বড় পরিসরে জোট গড়ার প্রক্রিয়াও চলছিল। বিএনপিপন্থী বুদ্ধিজীবীরা এ ক্ষেত্রে অনুঘটক হিসেবে কাজ করেন। গণফোরাম, যুক্তফ্রন্টের সঙ্গে বিএনপি এক হয়ে ‘জাতীয় ঐক্য’ বা ‘বৃহত্তর ঐক্য’ নামে একটি জোট গড়ার প্রক্রিয়া চলছে।

রাজনৈতিক এ ঐক্য প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা জানান, বৃহত্তর ঐক্য গড়ার পথে অনেক দূর এগিয়েছি দলগুলোর নেতারা। একটা কাঠামোও তৈরি হয়েছে। সাধারণত এ ধরনের ঐক্য গড়ার ক্ষেত্রে দাবি নিয়ে অনেক বিতর্ক হলেও এ ক্ষেত্রে হয়নি। এ প্রসঙ্গে নাগরিক ঐক্যর আহ্বায়ক ও যুক্তফ্রন্ট নেতা মাহমুদুর রহমান মান্না গণমাধ্যমে বলেন, ‘এটার কাঠামোটা দৃশ্যমান হয়েছে, এটা একটা বিরাট অর্জন। ঐক্য গড়ার পথে অনেক দূর এগিয়েছি আমরা। ঐক্য গড়ার সময় যে প্রস্তাব নিয়ে, দাবি নিয়ে অনেক বিতর্ক হয়, আমাদের তেমন হয়নি। কারণ স্বৈরতন্ত্রের থাবা এত তীব্র যে মানুষের এখান থেকে মুক্তির আকাক্সক্ষা জোরালো হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের সমস্যা হতে পারত যদি বেগম জিয়ার মুক্তি দাবি প্রধান দাবি করতে বলত বিএনপি। এখানে তার মুক্তির দাবি প্রধান নয়, দাবিনামার মধ্যে থাকলেই হলো। কেউ কেউ আবার বলেন, আইনগতভাবেই হোক আর যেভাবেই হোক উনি মুক্তির দাবিদার।’
বৃহত্তর জোট গড়া নিয়ে আলোচনা অনেকদূর এগোলেও এ জোটের নেতারা কোনোভাবেই স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতে ইসলামীর আছে এমন কোনো জোটের সঙ্গে ঐক্য করবেন না। গত মঙ্গলবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন স্রেফ জানিয়ে দেন, জামায়াত থাকলে গণফোরাম কোনো ঐক্য প্রক্রিয়ায় যাবে না। জামায়াতকে রেখে বিএনপির সঙ্গে ঐক্য প্রক্রিয়ার ব্যাপারে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সারা জীবনে করিনি, শেষ জীবনে করতে যাব কেন? ওরা তো এখন দলও না। নিবন্ধন বাতিল করা হয়েছে।’

এ প্রসঙ্গে মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘জামায়াত নিয়ে যুক্তফ্রন্টের অবস্থান স্পষ্ট। স্বাধীনতাবিরোধীদের সঙ্গে আমাদের কোনো ধরনের ঐক্য হতে পারে না। তবে বিএনপি স্পষ্ট করে বলে নাই যে তারা জামায়াতকে ছাড়বে না। বেগম জিয়া মহাসচিবকে বলেছেন, জোটও থাকবে আবার বৃহত্তর ঐক্য হবে। কিন্তু বলে নাই জামায়াত আমাদের সঙ্গে থাকবে।’ তিনি বলেন, নির্বাচনের মাঠে তো জামায়াত নাই, তাদের নিবন্ধনও নাই। এখন ২০টা জামায়াতের নেতা যদি ধানের শীষ নিয়ে নির্বাচন করে, সেখানে আমি বলার কে?

বিএনপির সঙ্গে অন্যদের মতভিন্নতা থাকলেও আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যাতে অংশগ্রহণমূলক হয় সেটা সবাই-ই চান। এ জন্য সবাই আস্থা রাখতে পারে এ রকম নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার চান তারা। বর্তমান নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষ নির্বাচন করার যোগ্যতা নেই বলেও মনে করছেন নেতারা। এ প্রসঙ্গে মান্না বলেন, ‘নির্বাচনের আগে বর্তমান সংসদ বাতিল করতে হবে। নির্বাচনে বিচারিক ক্ষমতাসহ সামরিক বাহিনীকে দায়িত্ব দিতে হবে। এ বিষয়ে আমাদের একেবারেই অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি আছে।’

জোট গঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা জানান, ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা ঐক্যের একটা স্লোগান। এ স্লোগানকে ধরেই দলগুলো দেশে একটি গণতান্ত্রিক আন্দোলন গড়ে তুলতে চায়। তবে একসঙ্গে নির্বাচন করলে আসন ভাগাভাগি কীভাবে হবে তা নিয়ে দলগুলোর মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে। এর আগে, বিকল্প ধারার যুগ্ম মহাসচিব মাহী বি চৌধুরী জানান, নতুন জোট বিএনপির কাছে ১৫০ আসন চায়। তবে মাহমুদুর রহমান মান্না মনে করছেন, আসন আসন বণ্টনটা বড় কথা নয়, রাজনীতিতে একটা মডেল সৃষ্টি করাই আসল কথা।

তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগের লোক ভয়ে আছে, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে পাঁচ লাখ লোক মেরে ফেলবে। আমরা ক্ষমতায় গেলে এ রকম শাসনের একটা মডেল দেখাব, যেখানে কোনো হানাহানি থাকবে না। এ জন্য সিট কতটা পাব সেই বিতর্কটা করছি না। আমরা ক্ষমতার ভারসাম্যটা বড় করে দেখছি। আমরা সত্যিকার অর্থে দেশে সুশাসনের জন্য কাজ করব। আমরা কল্যাণ রাষ্ট্র করতে চাই, দেশের বেকার সমস্যা নিরসনে কাজ করে যাব। দলবাজি থেকে মুক্ত করতে হবে দেশকে।’

সরকারবিরোধী জাতীয় ঐক্য গড়ার জন্য বিএনপি ছাড় দিতেও প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গত শনিবার এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘তাদের কিছু দাবি থাকতে পারে। কোনো ভালো কিছুর জন্য তো কিছু না কিছু ছাড় দিতে হবে।’ যুক্তফ্রন্ট নেতাদের বিষয়ে বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে বিভ্রান্তি আছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আপনাদের একটা ভুল ধারণা আছে। খালেদা জিয়ার মুক্তি বুঝি চান না জাতীয় ঐক্যের নেতারা। আসলে খালদা জিয়ার মুক্তি ব্যাপারে সবাই একমত। ড. কামাল হোসেন ও বি চৌধুরী আনুষ্ঠানিকভাবে সংবাদ সম্মেলন করেই বলেছেন তার মুক্তি দেওয়া হোক।’

You might also like