বাড়ছে গুজব আতঙ্ক

গুজব কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে তা জীবন দিয়ে উপলব্ধি করেছে বাংলাদেশ। ২০১৩ সালের মার্চ মাসে যুদ্ধাপরাধী দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর রায়কে কেন্দ্র করে তাকে ‘চাঁদে দেখা যাওয়ার’ গুজব রটিয়ে সারা দেশকে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিয়েছিল জামায়াত-শিবির।

স্মরণকালের ভয়াবহতম সেই গুজবকে কেন্দ্র করে ব্যাপক সহিংসতা চালায় জামায়াত-শিবির কর্মীরা। কুসংস্কারাচ্ছন্ন ও ধর্মান্ধ মানুষকে সেই গুজব বিশ্বাস করাতে সমর্থ হয়েছিল দুর্বৃত্ত চক্রটি। থানা, সরকারি কার্যালয়, পুলিশ ফাঁড়িসহ বিভিন্ন স্থানে ভেঙে, আগুন দিয়ে পুড়িয়ে নৈরাজ্য চালিয়েছিল তারা। গুজবকে কেন্দ্র করে সে সময় নজিরবিহীন সহিংসতায় সারা দেশে ৬৭ জন প্রাণ হারিয়েছিলেন বলে বিভিন্ন গণমাধ্যম তথ্য দিয়েছিল। অথচ সাঈদীকে চাঁদে দেখা যাওয়ার গুজব সাঈদী নিজেই বিশ্বাস করেননি। জামায়াত-শিবির কর্মীরাও সেটাকে ‘কুফরী’ (আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস না রাখা) বলে মানেন। কিন্তু গুজব রটিয়ে ঠিকই স্বার্থসিদ্ধি উদ্ধার করেছে কায়েমী স্বার্থবাদী গোষ্ঠী।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ভুয়া ছবি প্রকাশ করে গুজব রটিয়ে ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছিল রামুর বৌদ্ধপল্লীতে। ২০১২ সালের ঘটনা সেটি। সেবার বৌদ্ধপল্লী ও শত বছরের প্রাচীন মন্দির পুড়িয়ে ফেলা হয়েছিল স্রেফ গুজবকে কেন্দ্র করে। ২০১৬ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে এবং ২০১৭ সালের শেষদিকে রংপুরের পাগলাপীরে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের ঘরবাড়িতে সাম্প্রদায়িক হামলা, আগুন, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনার পেছনেও ছিল ওই একই ধরনের গুজব। সর্বশেষ নিরাপদ সড়কের দাবিতে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের নজিরবিহীন আন্দোলনের শেষদিকেও নজিরবিহীন গুজব সরকার, আইনশৃংখলা বাহিনী ও আন্দোলনকারীদের মাঝে ব্যাপক বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছিল। আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের আটকে রাখা, ছাত্রীদের ধর্ষণ করা এবং কয়েকজন শিক্ষার্থীর মৃত্যুর গুজব রটিয়ে ফায়দা লুটতে চেয়েছিল সংঘবদ্ধ দুর্বৃত্ত চক্র। বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের দিয়ে ধানমন্ডি আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে হামলার চেষ্টা চালিয়েছিল। গুজবকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালিয়েছিল দুর্বৃত্তরাও।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তথ্য-প্রবাহে বাধা সৃষ্টি, বাকস্বাধীনতা হরণ, গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রাম দমন-পীড়ন, সাম্প্রদায়িক শক্তির বিকাশ, সামাজিক ভারসাম্য লুপ্ত হলে ‘গুজব’-এর মতো ব্যাধি সহজেই জায়গা করে নেয়। এ ছাড়া প্রত্যেক জাতীয় নির্বাচনের আগে ও পরে এ দেশের মানুষকে নানা ধরনের গুজব মোকাবেলা করতে হয়। গুজবকে কেন্দ্র করে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা, রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা চালায় দুর্বৃত্ত চক্র। দেশি-বিদেশি নানা মহল তাদের স্বার্থ কায়েমের জন্য এসব গুজব রটায়। রাষ্ট্র বা সরকারের নানা দুর্বলতার সুযোগে গুজবও জায়গা করে নেয় মানুষের মাঝে। ফলে যে কোনো ভয়ানক পরিস্থিতি তৈরি হতে সময় লাগে না।

আগামী জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ফের ‘গুজব আতঙ্ক’ ছড়িয়ে পড়ছে সরকার, বিভিন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠী ও সাধারণ মানুষের মাঝে। বিশেষ করে ইন্টারনেটে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় এসব মাধ্যমে গুজব ছড়ানো সহজ হয়ে গেছে। বিগত কয়েক বছরে সব গুজবই ছড়িয়েছে ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউবসহ বিভিন্ন ভার্চুয়াল মাধ্যমের সাহায্যে। অপ্রতিরোধ্য এ মাধ্যমগুলোই এখন গুজব রটানোর ক্ষেত্রে দুর্বৃত্তদের প্রধান হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করতে মূলত দেশের বাইরে থেকেই বিভিন্ন চক্র ভার্চুয়াল মাধ্যমগুলোকে ব্যবহার করছে গুজব ছড়ানোর কাজে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে বর্তমানে সারা বিশ্বেই ‘ফেক নিউজ’ বা গুজব আতঙ্ক হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন দেশে নির্বাচনী প্রচারণার হাতিয়ারও হয়ে উঠছে এটি। ২০১৬ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের জয়ের পেছনে ফেক নিউজ বড় একটি ফ্যাক্টর হয়ে উঠেছিল। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় যত ঘনিয়ে আসছে দেশে ‘গুজব আতঙ্কও’ দিন দিন বেড়ে চলেছে। এ আতঙ্ক যে কেবল ক্ষমতাসীন দলেরই তা নয়। ক্ষমতার বাইরে থাকা অন্যান্য রাজনৈতিক দলের জন্যও এ আতঙ্ক অনেকটা দৈত্যসমান। বিশেষ করে বিএনপির মতো বৃহৎ দলটিও গুজব আতঙ্কে রয়েছে। দলটির সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, দেশের সমস্ত গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে সরকারের হাতে। ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও সরকার বা রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব আরোপ হচ্ছে। সর্বত্র আড়ি পাতছে রাষ্ট্র। তাই বিরোধীপক্ষের বিরুদ্ধে গুজব ছড়িয়ে ফায়দা হাসিলের সুযোগ সরকারেরই বেশি। আর এদিকে দেশে গুজবের প্রবাহ বন্ধ করার লক্ষ্যে একটি বিশেষ সেল তৈরির পরিকল্পনা করেছে বলে খবর এসেছে গত মঙ্গলবার। সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এই সেলের মূল দায়িত্ব হবে গণমাধ্যম এবং ফেসবুক, টুইটার বা ইউটিউবের মতো সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে যেসব গুজব ছড়ানো হয় তার উৎস অনুসন্ধান করা এবং তথ্য যাচাই-বাছাই করে আসল ঘটনা জনসাধারণকে জানিয়ে দেওয়া।
রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে মঙ্গলবার ‘গুজব : গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমের ভূমিকা’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেন, যারা ষড়যন্ত্রের রাজনীতি করে, তারাই গুজবের জন্ম দেয়। রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে মিথ্যাচার হচ্ছে। গুজব রটনা ও মিথ্যাচারের প্রধান কারখানা হচ্ছে বিএনপি-জামায়াত ও সাম্প্রদায়িক জঙ্গি চক্র। প্রকাশ্যেই আমি এই অভিযোগ দিচ্ছি এবং তথ্য দিয়ে তা প্রমাণ করব।

তিনি মুক্তিযুদ্ধ, ধর্ম, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং কোরআনের বাণী নিয়ে মিথ্যাচার করে যাচ্ছে বলে বিএনপি-জামায়াতকে দোষারোপ করেন এবং সাম্প্রদায়িক-জঙ্গিচক্রের কালা থাবা থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে রক্ষা করার কথা বলেন। এ ব্যাপারে সরকারিভাবে গুজব শনাক্তকরণ ও নিরসন কেন্দ্র স্থাপন করা দরকার বলে তিনি অভিমত দেন। এ নিয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা ও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করা হবে বলেও জানান তিনি।

সভায় তথ্য প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম সোশাল মিডিয়া পর্যবেক্ষণ করে গুজব চিহ্নিত করতে আগামী ১৫ দিনের মধ্যে তথ্য অধিদপ্তরকে একটি ‘ইমিডেয়েট রেসপন্স ওয়ার্কিং টিম’ গঠনের নির্দেশনা দেন।

গতকাল সচিবালয়ের সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তারানা হালিম বলেন, গুজব শনাক্তকরণ ও নিরসন কেন্দ্র গঠন করা হলে মাত্র তিন ঘণ্টায় গুজব ছড়ানো ব্যক্তিকে শনাক্ত করা সম্ভব হবে এবং গণমাধ্যমকে জানিয়ে দেওয়া হবে। তিনি জানান, এ বিষয়ে গুজব শনাক্তকরণ ও নিরসন সেল কাজ করবে। প্রতিটি টিমে ৭ জন করে তিন শিফটে কাজ করবে।

নির্বাচনের আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম একটা গুজবের কারখানা হয়ে যায় মন্তব্য করে তিনি বলেন, এ মাধ্যমের প্রতি আসক্তের কারণে একটি প্রজন্ম যে স্ট্যাটাসই আসুক না কেন- তাকে সত্য বলে ধরে নেয়। তাই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, তথ্য মন্ত্রণালয়ের পিআইডিতে আমরা একটি টিম করব। যারা ২৪ ঘণ্টা সোশ্যাল মিডিয়া পর্যবেক্ষণে রাখবে। গুজব চিহ্নিত হওয়ার তিন ঘণ্টার মধ্যে তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে সরকারি-বেসরকারি টিভি চ্যানেল, রেডিও এবং সব সংবাদ মাধ্যমে লিখিত প্রেসনোট পাঠানো হবে।

You might also like