আজ বৃহস্পতিবার বিকাল ৪:৪৪, ১৯শে অক্টোবর, ২০১৭ ইং, ৪ঠা কার্তিক, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, ২৮শে মুহাররম, ১৪৩৯ হিজরী

কী বার্তা পেল বাংলাদেশ?

নিউজ ডেস্ক | বার্তা বাজার .কম
আপডেট : অক্টোবর ১৩, ২০১৭ , ৬:৪১ অপরাহ্ণ
ক্যাটাগরি : ক্রিকেট,খেলাধুলা
পোস্টটি শেয়ার করুন

মুহাম্মদ মেহেদী হাসান: টেস্টের মত ওয়ানডেতেও সাউথ আফ্রিকার সামনে কঠিন পরীক্ষা দিতে হবে বাংলাদেশকে। রঙিন পোশাকে নামার আগে একমাত্র প্রস্তুতি ম্যাচে সেই বার্তাটাই মিলেছে। চ্যালেঞ্জটা কতটা নিতে প্রস্তুত টাইগাররা? যেখানে টপঅর্ডারে রান নেই, মিডলঅর্ডারের ওপর বিশাল চাপ, শক্তির জায়গা স্পিন যেন পলায়নপর, আর পেসে মিলছে ঠিকানাবিহীন চিঠি।

ওয়ানডে সিরিজের আগে আশা-নিরাশার দোলাচলে বেশি করে চোখে পড়ছে ঘাটতির জায়গাগুলোই। টেস্টের লজ্জা পর্ব শেষে ওয়ানডে-আশার সলতেটাও দপ করে জ্বলে তুলতে নিজেদের ঘাটতিগুলো নিশ্চিতভাবেই পুষিয়ে নিতে হবে।

আত্মঘাতী টপঅর্ডার
গত কয়েকবছর ধরেই বাংলাদেশের টপঅর্ডারে ব্যাটিংয়ের মশালটা এক কাঁধে বইছেন তামিম ইকবাল। মাঝে সৌম্য সরকারের ক্ষণিক ঝলক আশার পালে গতি এনেছিল। কিন্তু তরুণ সৌম্যর নিজেকে ফেরানোর যুদ্ধের সময়ে তামিমের চোটে ছিটকে যাওয়া, মহা-দুশ্চিন্তায় ফেলেছে টাইগার দলকে।

শুরুটা নির্ধারণ করে দেয় পুরো ইনিংসের গতিপথ। অথচ বাংলাদেশকে এমন দুজনের মাধ্যমে ইনিংস শুরু করতে হচ্ছে যারা একেবারেই ছন্দে নেই। ইমরুল টেস্টে মোটামুটি চলনসই হলেও ওয়ানডের ভার বইতে বরাবরই হোঁচট খেয়েছেন। অমিত সম্ভাবনার সৌম্য সেখানে নিজেকে হারিয়ে খুঁজছেন। টেস্টে ব্যর্থতার পর প্রস্তুতি ম্যাচে ইমরুল ২৭ ও সৌম্য ৪ রানে শঙ্কাটা আরও বাড়িয়েছেন। কিন্তু সাউথ আফ্রিকা সিরিজে এই দুজনের ওপরই আস্থা রাখতে হচ্ছে। তামিম হয়ত পুরো ওয়ানডে সিরিজই চোটের দুর্ভাগ্যে কাটা পড়তে যাচ্ছেন।

টপঅর্ডারে লিটনকে দিয়ে চেষ্টা করার সম্ভাবনা আছে। প্রস্তুতিতে ৮ রান করেছেন। টেস্ট ৭০ রানের একটা ইনিংস খেলে এই উইকেটরক্ষক-ব্যাটসম্যান অবশ্য দাবিটা জানান দিয়ে রেখেছেন। হুট করে নেমেই তিনি নিশ্চয় এলাহিকাণ্ড ঘটিয়ে ফেলবেন না!

দীর্ঘসময় পর রঙিন পোশাকে ডাক পাওয়া মুমিনুল হককে দিয়েও চেষ্টা করানো যেতে পারে। কিন্তু হাথুরুসিংহে ম্যানেজমেন্ট আর যাই হোক, দেশের ক্রিকেটে সময়ের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যানটিকে রঙিন পোশাকের ক্রিকেটার মানতে নারাজ।

টপঅর্ডার দুশ্চিন্তা তাই বাংলাদেশকে ভোগাতেই যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে, যদি সুযোগ পাওয়ারা দারুণকিছু করে না বসেন।

যত চাপ মিডলঅর্ডারে
মিডলঅর্ডারের মূল কাজটা থাকে ভাল শুরুটা টেনে নিয়ে রানের চাকা ধরে রাখা। টাইগার দলের সবচেয়ে অভিজ্ঞ অংশটিই খেলেন মিডলঅর্ডারে। মুশফিক, সাকিব, মাহমুদউল্লাহ। কিন্তু টপঅর্ডার টানা ব্যর্থ হতে থাকায় তাদের ওপর চাপের প্রদাহ বাড়ছে। এতে তারা নিজেদের স্বাভাবিক খেলাটাও খেলতে পারছেন না কখনও কখনও। কখন আবার যখন প্রতিরোধ গড়ছেন, তারা বিদায় নিলেই হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ছে লোয়ার মিডলঅর্ডারের ব্যাটিং। সেটা মাথায় রেখে ঝুঁকি নিয়ে রানের গতি বাড়াতে মন দিতে পারছে না মিডলঅর্ডার।

একদিকে টপের ব্যর্থতায় নির্ভার ব্যাটিংয়ের সুযোগ নেই, অন্যদিকে লোয়ারের দুর্বলতায় ঝুঁকির সুযোগ সীমিত হয়ে আসা, মিডলঅর্ডার যেন দুই অর্ডারের চাপে স্যান্ডউইচ হওয়ার দশায়!

তারপরও মিডলঅর্ডারেই মূল ভরসাটা রাখতে হবে। দলের ব্যাটিং মেরুদণ্ডের শুরুর অংশে আছেন ফর্মে থাকা মুশফিকুর রহিম। টেস্টে মেলে ধরতে পারেননি। দলের ব্যর্থতা, অধিনায়কত্ব ঘিরে অব্যাহত সমালোচনা তার মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটিয়ে থাকতে পারে। মাশরাফী দলে যোগ হওয়ায় নির্ভার হয়েই নামতে পারছেন মুশফিক।

আরেক ভরসা সাকিব আল হাসান টেস্ট সিরিজে স্বেচ্ছা নির্বাসনে ছিলেন। এটা তো স্বীকৃতই যে, তার বদলে দুজন খেলোয়াড় খেলিয়েও সাকিবীয় সার্ভিসটা পাওয়া হয় না বাংলাদেশ দলের। ওয়ানডে সিরিজে তার ফেরাটা নিশ্চিতভাবেই বড় সংযোজন। প্রস্তুতি ম্যাচে দলের বিপর্যয়ে ৬৮ রানের ইনিংস সর্বোচ্চ অবদান রেখে নিজেকে ঝালিয়েও নিয়েছেন।

বল হাতে অবশ্য পাঁচ ওভার হাত ঘুরিয়েও সাফল্য আসেনি। তবে তিনি চ্যাম্পিয়ন ক্রিকেটার, জানেন কিভাবে নিজের সেরাটা মাঠে টেনে আনতে হয়। টেস্টে বাইরে থাকায় দল যেভাবে তার অভাব বোধ করেছে, তাতে যেমন সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে, সাকিবও হয়ত পারফরম্যান্স দিয়েই সেটা মিটিয়ে দিতে চাইবেন।

মিডলের আরেক অভিজ্ঞ মাহমুদউল্লাহ রানেই আছেন। কিন্তু ততটা ধারাবাহিক নন। ম্যাচের চেহারা বদলে দেওয়া পারফরম্যান্সের সামর্থ্য তার আছে নিশ্চিতভাবেই। লোয়ার অর্ডারে নাসির বা মিরাজদের নিয়ে মাহমুদউল্লাহ যদি তেমন কোন চেহারা পাল্টে দেওয়া পারফরম্যান্স দিয়ে বসেন, সেটি দলকে বেশ সাহায্য করবে।

স্পিন যেন পলায়নপর
স্পিন বরাবরই বাংলাদেশের শক্তির জায়গা। সেটি মূলত দেশের মাটিতে। বাইরেও একেবারে খারাপ নয়। সাকিবের অনুপস্থিতিতে সেটির জারিজুরি ফাঁস হয়ে পড়েছিল! স্পিনারদের কাজ হয়ে পড়েছিল কেবল বল করতে হবে তাই যেন করে যাওয়া, কোনও প্রত্যাশা নেই।

পলায়নপর সেই ভাবটা কাটার সুযোগ এসেছে। অভিজ্ঞ সাকিব ফিরেছেন। মিরাজ সুযোগ পেলে, সঙ্গে নাসির-মাহমুদউল্লাহর কার্যকরী কয়েকটি ওভার; স্পিনেও অনেককিছু পাওয়ার সম্ভাবনা আছে বাংলাদেশের।

পেসে ঠিকানাবিহীন চিঠি
দেশের বাইরে খেলা। সাউথ আফ্রিকার পিচ। সবুজ, বাউন্সি পিচ। মানসিকভাবে প্রস্তুত হয়েই গিয়েছিল বাংলাদেশ। কিন্তু প্রোটিয়ারা একেবারেই ম্যাড়ম্যাড়ে পিচে স্বাগত জানিয়েছে। অনেকটা দেশের মাটির মত পরিস্থিতি। তাতেও মোস্তাফিজ-তাসকিনরা যেন লাইন-লেন্থই ভুলে বসলেন। এতটা বাজে বোলিং তারা কখনও কখনও দেশের মাটির ধুলোওড়া পিচেও করেন না! একটি তিনদিনের প্রস্তুতি ম্যাচে সিরিজ শুরু করে দুটি টেস্ট, পরে আরেকটি ওয়ানডের প্রস্তুতি ম্যাচ, এখনও মানিয়েই নিতে পারছেন না পেসাররা।

মোস্তাফিজ-রুবেলরা তরুণ। পেস আক্রমণে তারা হয়ত নেতার অভাবে ভুগছিলেন, অথবা সঠিক নির্দেশনার অভাবে! মাশরাফী ফেরায় তাদের মনোজগতে খানিকটা হলেও ইতিবাচকতা ফেরার কথা। টেস্টে পেস দুর্দশার মাঝে মোস্তাফিজ যা একটু লড়েছেন। ওয়ানডেতে রুবেলের ওপর ভরসা রাখা যায়। প্রস্তুতি ম্যাচে মাশরাফী দুই উইকেট নিয়ে আশা দিচ্ছেন ঘুরে দাঁড়ানোর। সূত্র মিলে গেলে সাদা বলে হয়ত অন্যরকম বাংলাদেশেরই দেখা পাওয়া যাবে। নয়ত ডুবতে থাকার সিরিজে তল খুঁজে পেতে যেয়ে আরও অনেকটাই ডোবার শঙ্কা উঁকি দিচ্ছে!

তাহলে কী একেবারেই কোন আশা নেই? আছে। ভালোভাবেই আছে। সেজন্য রসদ নিতে খুব বেশি অতীতে সময়-ভ্রমণ করতে হবে না। গত দুবছরের নতুন বাংলাদেশের যে জয়গান, সেই পারফরম্যান্স থেকেই মশাল জ্বালিয়ে নেওয়ার টোটকা মিলতে পারে। তরুণদের শক্তি আর সঙ্গে যোগ হচ্ছে মাশরাফী টনিকও।

তরুণদের অবদান
গত দুবছরে বদলে যাওয়া বাংলাদেশের যে স্লোগান তাতে অভিজ্ঞদের কথা যেমন আসবে, নিশ্চিতভাবেই আসবে তরুণদের নামও। ভারত বধে মোস্তাফিজ, ইংল্যান্ড বধে মিরাজ, এমনকি এই সাউথ আফ্রিকাকে ঘরের মাটিতে ওয়ানডে সিরিজে হারানোর সময় সৌম্য চমকে দিয়েছিলেন ব্যাট হাতে।

তিনজনই এই সিরিজে আছেন। যোগ হয়েছে আগামীর তারকা মোহাম্মদ সাইফউদ্দিনও। তরুণ পেস-বোলিং অলরাউন্ডারের কাছে অনেক প্রত্যাশা থাকবে। বোলিংটা কার্যকর, ব্যাটিংয়ে ঝড় তুলতে পারেন। যদি ব্যাটে-বলে লেগে যায় তার বা অন্য তরুণ সদস্যদের, টেস্ট সিরিজের ধূসর পারফরম্যান্স তো আড়াল করে দেওয়া সম্ভবই। সেইসঙ্গে মিটতে পারে দীর্ঘদিনের আক্ষেপ, একজন পেস অলরাউন্ডার না পাওয়ার আক্ষেপ।

বদলে যাওয়া দিনরাত্রি
একদিন দুদিন নয়, মাঠের পারফরম্যান্সে বাংলাদেশের কলিকাল ছিল দীর্ঘ সময়জুড়ে। ছোটখাটো ঝলক আর অল্পবিস্তর ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সেই সীমাবদ্ধ থাকতে হয়েছে। সেদিন বদলেছে। দেশের মাটিতে টানা পাঁচ সিরিজ জয়, যাতে আছে ভারত, পাকিস্তান ও এই সাউথ আফ্রিকাও। বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল, সবশেষ চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির সেমিফাইনাল, শ্রীলঙ্কায় সিরিজ ড্র; বদলে যাওয়া অনেক পারফরম্যান্সই আছে।

দুটো টেস্টের পারফরম্যান্সে তো আর সেই সাফল্যগুলো ঢেকে যেতে পারে না। ওয়ানডেতে ঘুরে দাঁড়াতে তাই বদলে যাওয়া নিজেরাই নিজেদের আত্মবিশ্বাসের রসদ হতে পারে।

মাশরাফী টনিক
সবশেষে যেটি থাকে, ওয়ানডে দলটার এই বদলে যাওয়ার পেছনের আসল কারিগর; অধিনায়ক মাশরাফী। একটা দল হিসেবে খেলেই বাংলাদেশ বদলে যাওয়া বাংলাদেশ। যাতে ছোট-বড় অবদান সবারই আছে। কিন্তু মাঠে দলটাকে দল হিসেবে পরিচালনার ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে করতেই তো মাশরাফী-বটবৃক্ষের বেড়ে ওঠা। মাশরাফী টনিকেই যে অনেকটা কাজ এগিয়ে যায় বর্তমান দলটার।

সেই মাশরাফী নিজের ঢংয়েই থাকবেন, সেটি বুঝিয়ে দিয়েছেন প্রস্তুতি ম্যাচেই। টস জিতে ব্যাটিং না নেওয়ার হাহাকার সঙ্গী ছিল টেস্ট সিরিজজুড়ে। ওয়ানডে সিরিজের প্রস্তুতিতে মাশরাফী ব্যাটিং নিলেন প্রথম সুযোগেই। ইঙ্গিত মেলে ওয়ানডে সিরিজটা মাশরাফীর মত করেই এগোবে। থাকবে না মাঠের বাইরের নানা আলোচনার রসদ।

এরপরও কথা থাকে। খেলা সাউথ আফ্রিকার বিপক্ষে, তাদেরই মাটিতে। পেশাদারিত্বের দিক থেকে যারা আমাদের চেয়ে যোজন-যোজন এগিয়ে। যে দলে আছেন আমলা-ভিলিয়ার্সদের মত অভিজ্ঞরা, মার্করাম-রাবাদার মত তরুণ পরীক্ষিতরা। সব মিলিয়ে প্রোটিয়ারাও নিশ্চয় ছেড়ে কথা বলবে না। ভেঙেচুড়ে দিতে চাইবে সব। ওয়ানডে সিরিজে তাই কঠিন সময় অপেক্ষা করছে হয়ত। আলোর পিঠের আঁধারের মতই আবার থাকছে সম্ভাবনার হাতছানিও। এখন দেখার বাংলাদেশ দল নিজেদের সামর্থ্যটা মাঠের পারফরম্যান্সে রূপান্তর করে বদলে যাওয়ার আরেকটি পতাকা উড়িয়ে দিতে পারেন কিনা।-চ্যানেল আই