মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইর উপজেলার ৫ টি মৌজায় ভূমি জরিপের নামে চলছে টাকার খেলা। জমির পরিমাণ ও দাগ খতিয়ান ঠিক রাখতে ও ক্ষতি হওয়ার ভয়ে জরিপ দলের লোকজনকে টাকা দিতে বাধ্য হচ্ছেন জমির মালিকরা। অভিযোগ উঠেছে গত তিন মাসে খতিয়ান প্রতি এক হাজার থেকে লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করে তিন থেকে চার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন দিয়ারা অপারেশন নরসিংদী উপ-আঞ্চলিক (ক্যাম্প) ও উপজেলা সেটেলমেন্ট অফিসের জরিপকর্মীরা। এ নিয়ে এলাকাবাসীর মধ্যে চাঁপা ক্ষোভ বিরাজ করছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের এপ্রিল মাস থেকে উপজেলার রিফায়েতপুর, দক্ষিন জামশা, বায়রা ও বিনোদপুর ছোট খন্ড মৌজা ও জুন মাস থেকে উপজেলার চর সিঙ্গাইর মৌজায় ডিজিটাল পদ্ধতিতে ভূমি জরিপের কাজ শুরু হয়। চর সিঙ্গাইর মৌজায় দিয়ারা অপারেশন নরসিংদী উপ-আঞ্চলিক (ক্যাম্প) কার্যালয় ও বাকি ৪টি মৌজায় উপজেলা সেটেলম্যান্ট অফিসের জরিপকর্মীরা ভূমি জরিপের কাজ করছেন। চর সিঙ্গাইর মৌজাকে ৯টি, রিফায়েতপুর মৌজাকে ৯টি, দক্ষিন জামশা মৌজাকে ৮টি, বায়রা মৌজাকে ১০টি ও বিনোদপুর ছোট খন্ড মৌজাকে ৩টি সিটে ভাগ করা হয়েছে। প্রতিটি সিটে একজন সার্ভেয়ারের নেতৃত্বে একজন সর্দার আমিন, একজন বদর আমিন ও একজন চেইনম্যানসহ ৫টি মৌজায় মোট ১৫৬ জন জরিপকর্মী ভূমি জরিপকাজে নিয়োজিত রয়েছে। ইতিমধ্যে রিফায়েতপুর দক্ষিন জামশা মৌজায় মাঠ জরিপের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। বাকি তিনটি মৌজায় জরিপকাজ চলমান রয়েছে।
গত এক সপ্তাহে এই প্রতিবেদকের সাথে কথা হয় অন্তত ৫০ জন জমির মালিকের। তারা জানান, জমির রেকর্ডভুক্ত করতে তাদের সবারই কমবেশি টাকা খরচ হয়েছে। কারো টাকা ছাড়া কাজ হয়নি। সিঙ্গাইর পৌরসভার আজিমপুর মহল্লার বাসিন্দা নুরুল হক জানান, চর সিঙ্গাইর মৌজার ৫ নং সিটে তিনিসহ তার ভাই-বোনের দেড় একর জমি রয়েছে। জমির দখল ও মালিকানা সংক্রান্ত সব কাগজপত্রে কোনো সমস্যা নেই। জমি রেকর্ডভুক্ত করতে গেলে দশ হাজার টাকা দাবি করেন দিয়ারা অপারেশন নরসিংদী উপ-আঞ্চলিক (ক্যাম্প) কার্যালয়ের সার্ভেয়ার জানে আলম।
টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে জমি রেকর্ডভুক্ত করতে নানা টালবাহানা শুরু করে। পরে চার হাজার টাকা দেওয়ার পর জমি রেকর্ডভুক্ত করতে রাজি হন সার্ভেয়ার জানে আলম। একই গ্রামের কৃষক আওলাদ হোসেন জানান, ১৪ শতাংশ জমির জরিপকাজের জন্য চার হাজার টাকা দাবি করে ৯ নং সিটের সার্ভেয়ার হারুন অর রশিদ। পরে দুই হাজার টাকা দেওয়ার পর তার জমি রেকর্ডভুক্ত করা হয়। শুধু তারা দুজনই নন, জমির দখল ও মালিকানা সংক্রান্ত সব কাগজপত্র সঠিক থাকলেও নানা অজুহাতে উপজেলার গোলাড়া গ্রামের রুহুল আমীনের কাছ থেকে আড়াই হাজার, শাহীনুর রহমানের কাছ থেকে এক হাজার, মোক্তার খানের কাছ থেকে এক হাজার, ছোবান মিয়ার কাছ থেকে দুই হাজার, আজিমপুর গ্রামের নুরুল হকের কাছ থেকে পাঁচ হাজার, আওলাদ হোসেনের কাছ থেকে দুই হাজার, ফজল মিয়ার কাছ থেকে তিন হাজার, হযরত আলীর কাছ থেকে তিন হাজার, কাজী আলী হোসেনের কাছ থেকে চার হাজার, আব্দুস সালামের কাছ থেকে চার হাজার টাকা হাতিয়ে নেন জরিপকর্মীরা।
গোলড়া গ্রামের মাবিয়া বেগম জানান, তার স্বামী ফজল মিয়া ক্রয় ও পৈতৃক সূত্রে সাড়ে ২৬ শতাংশ জমির মালিক। মালিকানা সংক্রান্ত সব কাগজপত্র সঠিক থাকার পরও জমি রেকর্ডভুক্ত করতে পনের হাজার টাকা দাবি করেন সার্ভেয়ার শফিকুর রহমান। দাবিকৃত টাকা না দেওয়ায় তার স্বামীর জমি রেকর্ডভুক্ত না করে তাকে হয়রানী করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
এমন অভিযোগ সম্পর্কে সার্ভেয়ার শফিকুর রহমান ও জানে আলম বলেন, জমির রেকর্ডভুক্ত করতে কোনো টাকা পয়সা নেওয়া হয়না। কাজ শেষে কেউ যদি খুশি হয়ে কিছু দেন, তাহলে সেটা নেই। টাকা ছাড়া কোনো কাজ হয়না এমন অভিযোগ সত্য নয়। তবে এই প্রতিবেদককে আর্থিক সুবিধা দেওয়ার বিনিময়ে এ নিয়ে সংবাদ প্রকাশ না করার জন্য অনুরোধ করেন তারা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক জমির মালিক জানান, খতিয়ান প্রতি নিম্নে এক হাজার টাকা থেকে শুরু করে লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করছেন জরিপকর্মীরা। কারো কাছ থেকে আরো বেশি টাকা নেওয়া হচ্ছে। টাকা ছাড়া কোনো কাজ হয়না। উপজেলার ৫ টি মৌজায় ডিজিটাল ভূমি জরিপের নামে জরিপদলের লোকজন এপর্যন্ত তিন থেকে চার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে জানান তারা।
দিয়ারা অপারেশন নরসিংদী উপ-আঞ্চলিক (ক্যাম্প) কার্যালয়ের রাজস্ব অফিসার মুহাম্মদ আবু তাহের বলেন, জরিপকর্মীদের বিরুদ্ধে ঘুষ নেয়ার ঢালাও অভিযোগ সঠিক নয়। স্থানীয় দালাল চক্র আমাদের কথা বলে টাকা নিয়ে থাকতে পারে।
উপজেলা সহকারি সেটেলমেন্ট অফিসার (এএসও) আব্দুল কুদ্দুস জানান, ডিজিটাল ভূমি জরিপ কাজের জন্য টাকা পয়সা নেওয়ার কোনো বিধান নাই। জরিপকাজের জন্য কারো বিরুদ্ধে টাকা নেওয়ার সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী অফিসার রাহেলা রহমত উল্লাহ জানান, ভূমি জরিপে কিছু অনিয়মের কথা লোকমুখে শুনেছি। কেউ লিখিত অভিযোগ দেয়নি। অভিযোগ পেলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বার্তাবাজার/কে.জে.পি