দুঃসহ সময়ে দুর্বিষহ মাহমুদ উল্লাহ

প্রথম ওয়ানডের দ্বিগুণ রান কাল। কিন্তু উন্নতির এই রেখাচিত্রে খুশি হওয়ার অবস্থা কোথায়! শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে আগের খেলায় করেন ৩; কাল আকিলা ধনঞ্জয়ার বলে বোল্ড হওয়ার আগে ৬। দুঃসহ সময়টা তাতে তো আরো দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে মাহমুদ উল্লাহর।

এ বছর ১৬ ওয়ানডেতে তাঁর মোট রান ৩৪৮। পঞ্চাশ পেরেনো ইনিংস মাত্র একটি; বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে। বাংলাদেশ দলে ‘ফিনিশার’ হিসেবে তাঁর যে ভূমিকা, সেটির সাক্ষ্য তো দেয় না ৮১.৬৯ স্ট্রাইক রেট। এ সময়ের ১৪ ইনিংসের মধ্যে পাঁচটিতে ৫০-র নিচে, আরো তিন ইনিংসে ৭৫-এর নিচে স্ট্রাইক রেট বরং দ্রুত রান তোলার চাহিদাকে করে বিদ্রূপ।

অনাগত ভবিষ্যতে সেটি আরো প্রকট হয়ে উঠতে পারে বিশ্বকাপের একটি ঘটনার কারণে। টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের তৃতীয় ম্যাচ। ৩৮৬ রান তুলে ম্যাচ একরকম জিতেই যায় ইংল্যান্ড। ৩০তম ওভারে মোহাম্মদ মিঠুনের আউটের পর ক্রিজে যান মাহমুদ উল্লাহ। উইকেটে নব্বইয়ের ঘরে থাকা ব্যাটসম্যান সাকিব আল হাসান।

শেষ ২০ ওভারে ৬ উইকেট হাতে নিয়ে প্রয়োজন ২১৭ রান। কঠিন, অবশ্যই কঠিন। কিন্তু এই টি-টোয়েন্টির যুগে তা একেবারে অসম্ভব না। অন্তত ‘কঠিনেরে ভালোবাসিলাম’ বলে চ্যালেঞ্জটা তো নেবে বাংলাদেশ! সাকিব তা নেন।

সেঞ্চুরি করেন, ক্রিস ওকসকে এক ওভারে তিন বাউন্ডারি মেরে রান রেটের সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে আউটও হয়ে যান। এরপর ক্রিজে গিয়ে মুখোমুখি প্রথম সাত বলে তিনটি চার মেরে দেন এমনকি মোসাদ্দেক হোসেনও।

কিন্তু মাহমুদ উল্লাহ খেলতে থাকেন একই তাল-ছন্দ-লয়ে। একই ঘুম পাড়ানিয়া সুরে। চ্যালেঞ্জ নেওয়ার কোনো তাড়না তাঁর ব্যাটিংয়ে দেখা যায় না। ৪৫ ওভারের শেষ বল পর্যন্ত ক্রিজে থেকে ৪১ বলে করেন ২৮ রান। অমন ম্যাচ পরিস্থিতিতে মাহমুদ উল্লাহর এমন ব্যাটিং সত্যিই ব্যাখ্যাতীত।

তাতে সেঞ্চুরিয়ান সাকিব যথার্থ কারণেই বিরক্ত হন যারপরনাই। পরের ম্যাচের একাদশ নিয়ে আলোচনায় মাহমুদ উল্লাহকে বাদ দেওয়ার কথা বলেন সহ-অধিনায়ক। অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজার অনুমোদন পায় না তা। ফলে একাদশে টিকে যান মাহমুদ উল্লাহ। ‘আমাকে আর একাদশ নিয়ে তাহলে কিছু জিজ্ঞেস করবেন না’—বলে নিজেকে দলীয় পরিকল্পনার অংশ থেকে সাময়িকভাবে গুটিয়ে নেন সহ-অধিনায়ক সাকিব।

বাংলাদেশের ড্রেসিংরুম ছোট্ট এক সংসার। একজনের কথা আরেকজনের কানে যেতে সময় লাগে না। সাকিব যে মাহমুদ উল্লাহকে বাদ দিতে চেয়েছিলেন, সে খবরও গোপন থাকে না। তাতে সুখী সংসারে যেমনটা হয়, এর প্রতিফলনে মাহমুদ উল্লাহর অভিমান হওয়া স্বাভাবিক; কিন্তু তাঁর ভেতর ভর করে জান্তব ক্রোধ।

অপেক্ষায় থাকেন শুধু ভালো একটি ইনিংসের। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে খেলেন ৫০ বলে ৬৯ রানের ইনিংস। ড্রেসিংরুমে ফিরে গ্লাভস-ব্যাট ছুড়ে অন্য সতীর্থদের উদ্দেশে বলেন, ‘আমার ব্যাটিং দেখে এখন কি হাততালি দেওয়া যায় না? নাকি শুধু বড় ক্রিকেটারদের জন্যই দিতে হয় তালি?’ ‘বড় ক্রিকেটার’ বলতে হয়তো সাকিবকেই বুঝিয়েছেন!

এই যখন অবস্থা, তখন বাংলাদেশের ড্রেসিংরুমটা আর সুখী সংসারের ছবি দেখায় না। ভালোবাসার যৌথ খামারে ভাঙনের শব্দও শোনা যায় পর্যন্ত।বিশ্বকাপের পর শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সিরিজটি মাহমুদ উল্লাহর জন্য ছিল সাকিবের ছায়া থেকে বেরিয়ে আসার বড় সুযোগ। সেটি বিশ্বকাপে ওই সতীর্থের সঙ্গে জেদাজেদির জন্যই শুধু নয়।

সাকিবের অনুপস্থিতিতে বাংলাদেশ দলকে নির্ভরতা দেওয়ার প্রয়োজনেও। কিন্তু এখন পর্যন্ত তা করতে ব্যর্থ তিনি। বাংলাদেশ ক্রিকেটের পঞ্চপাণ্ডবের একজন হিসেবে মাহমুদ উল্লাহর নাম বাকি চারজনের সঙ্গে উচ্চারিত হয় এক ব্র্যাকেটে। সেখানকার অন্য তিন ব্যাটসম্যানের মধ্যে তামিম-সাকিবের পর কাল মুশফিকও ঢুকে গেলেন ওয়ানডেতে ছয় হাজার রানের ক্লাবে।

সেখানে মাহমুদ উল্লাহর চার হাজার রানই হয়নি। তাঁর ক্যারিয়ার হাইলাইট শুধুই বড় মঞ্চে জ্বলে ওঠা—২০১৫ বিশ্বকাপের দুটি সেঞ্চুরি এবং ২০১৭ চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে দলকে সেমিফাইনালে তোলা শতরান।

২০১৯ বিশ্বকাপের আগে কোনো গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেননি মাহমুদ উল্লাহ। তাতে নাকি বিশ্বকাপ প্রস্তুতিতে বিঘ্ন ঘটবে! আয়ারল্যান্ড-ইংল্যান্ডে আড়াই মাসের সফরেও না। ‘সেঞ্চুরি করার পর কি কথা বলবেন?’— এমন প্রশ্নের উত্তরে হেসে দিয়েছেন সায়। হায়, সেঞ্চুরি! একাদশে তাঁর জায়গাই তো নড়বড়ে হয়ে যাওয়ার জোগাড়। ব্যাটিং ফর্মের কারণে, বোলিং না করার কারণে এবং ফিটনেসের কারণে।

ব্যাটিং ফর্ম যাচ্ছেতাই। ইনজুরির কারণে আয়ারল্যান্ডে ত্রিদেশীয় সিরিজ এবং বিশ্বকাপের একটি ম্যাচেও বোলিং করতে পারেননি। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে প্রথম ওয়ানডেতে করেন এক ওভার। কিন্তু কার্যকারিতায় শূন্য। এমনিতেই অবশ্য বোলার হিসেবে জাতীয় দলে তাঁর প্রয়োজন কমে প্রায় শূন্যের কোঠায়।

২০১৫ বিশ্বকাপের পর থেকে ধরলে যে ৬৮ ওয়ানডে খেলেছেন তার মধ্যে অর্ধেকেরও কম, মাত্র ৩১ ইনিংসে অফ স্পিন বোলিং করেছেন মাহমুদ উল্লাহ। এর মধ্যে ২২ ইনিংসেই অধিনায়ক তাঁকে দিয়ে তিন ওভারের বেশি বোলিং করাননি। অর্থাৎ, অলরাউন্ডার পরিচয় বাদ দিয়ে নিখাদ ব্যাটসম্যান হিসেবে মাহমুদ উল্লাহ বাংলাদেশ ওয়ানডে দলে খেলছেন অনেক দিন ধরে।

অমন একজনের ব্যাটিং ফর্ম পক্ষে না থাকলে একাদশে জায়গা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা তাই স্বাভাবিক। মাহমুদ উল্লাহর ফিটনেস নিয়েও রয়েছে প্রবল শঙ্কা। যে কারণে বিশ্বকাপে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ খেলতে পারেননি। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে এই সিরিজে বিশ্রাম নিতে পারতেন।

কিন্তু সাকিবের মতো সিনিয়র ক্রিকেটার না থাকায় অভিজ্ঞতা বিবেচনায় তাঁকে আর দেশে রেখে আসেনি বাংলাদেশ। তবে লঙ্কানদের বিপক্ষে দুটি ওয়ানডে দেখে তো মনে হচ্ছে না, মাহমুদ উল্লাহ শতভাগ ফিটনেসের ধারেকাছেও রয়েছেন। সেটি যেমন দুই ম্যাচের ব্যাটিংয়ে স্পষ্ট, তেমনি প্রথম ওয়ানডের ক্যাচ মিসেও।

বিপর্যয়ের চোরাবালিতে তাই হারিয়ে যাওয়ার শঙ্কা এই ব্যাটসম্যানের। দলের সেরা তারকার সঙ্গে বিশ্বকাপে বিতণ্ডার কারণে; আরো বেশি ব্যাটিংয়ে বাজে ফর্মের কারণে, ফিটনেসের ধোঁয়াশার কারণে। সময়ের টিকটিক কাঁটা এখন কিন্তু ঘড়ির চেয়েও দ্রুতগতিতে চলছে মাহমুদ উল্লাহ!

বার্তা বাজার/কেএ

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর