২৩, অক্টোবর, ২০১৮, মঙ্গলবার | | ১২ সফর ১৪৪০

রাজশাহী আওয়ামী লীগের সবাই এমপি হতে চান

আপডেট: সেপ্টেম্বর ১, ২০১৮

রাজশাহী আওয়ামী লীগের সবাই এমপি হতে চান

দুই মেয়াদে দীর্ঘ ১০ বছর টানা ক্ষমতায় থাকা রাজশাহীর আওয়ামী লীগ এখন অন্তর্দ্বন্দ্ব আর কোন্দলে জর্জরিত। রাজশাহীর প্রতিটি আসনেই সৃষ্টি হয়েছে অসংখ্য গ্রুপ, উপ-গ্রুপ। সংসদ সদস্যদের সমালোচনামূলক কর্মকাণ্ডের সুযোগে এখন প্রার্থীর ছড়াছড়ি। তারা সবাই এমপি হতে চান। কিন্তু সংগঠন শক্তিশালী করতে সংসদ সদস্যরা যেমন কোনো ভূমিকা রাখছেন না, তেমনি মনোনয়নপ্রত্যাশীরাও না। জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান আসাদের মদদে প্রতিটি আসনে এসব গ্রুপের জন্ম হয়েছে বলে দাবি সংসদ সদস্যদের।

রাজশাহী-১ (তানোর-গোদাগাড়ী) আসনটি দীর্ঘ সময় ছিল বিএনপি আর জামায়াতের দখলে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আসনটি দখলে নেন বর্তমান জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ওমর ফারুক চৌধুরী। প্রথম দফায় প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন তিনি। ২০১৪ সালে জেলা আওয়ামী লীগের কমিটি হওয়ার পর থেকেই সেখানে শুরু হয় তীব্র গ্রুপিংয়ের। ‘সেভেন স্টার’ নামে পরিচিত সাতজন প্রার্থী সেখানে মনোনয়ন চান। তাদের এক দাবি- ওমর ফারুক বাদে যে কাউকে মনোনয়ন দিলে মেনে নেবেন তারা। আর ওমর ফারুক চৌধুরী বলছেন, এলাকায় ওই সাত নেতা জনবিচ্ছিন্ন।

মনোনয়নপ্রত্যাশী সাতজন হলেন- আওয়ামী লীগের জাতীয় পরিষদের সদস্য ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আতাউর রহমান, মুণ্ডুমালা পৌরসভার মেয়র ও তানোর উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি গোলাম রাব্বানি, গোদাগাড়ী পৌরসভার মেয়র ও জেলা আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক মনিরুল ইসলাম বাবু, জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি মকবুল হোসেন খান, বদরুজ্জামান রবু মিয়া, জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা মতিউর রহমান এবং জেলা কৃষক লীগের সহ-সভাপতি আবদুল ওয়াহাব জেমস। এই সেভেন স্টারের বাইরে জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক একেএম আসাদুজ্জামান আসাদ ও জেলা কৃষক লীগের সেক্রেটারি তাজবুল ইসলামও মনোনয়ন চান।

আতাউর রহমান বলেন, ‘এলাকার মানুষ প্রার্থী পরিবর্তন চায়। এখানকার বর্তমান এমপি ওমর ফারুক চৌধুরী হাইব্রিড নিয়ে চলছেন। শোকের দিন ১৫ আগস্ট তিনি বিএনপির দলীয় উপজেলা চেয়ারম্যান ইসাহাক আলীকে দলে যোগদান করিয়ে মিষ্টি বিতরণ করে আনন্দ করেছেন। রাস্তাঘাট সংস্কার করেননি। নিয়োগ বাণিজ্য করেছেন শতভাগ। তাকে বদল করে আমাদের মধ্যে থেকে যে কাউকে প্রার্থী দেওয়ার দাবি জানিয়েছি।’

এসব বিষয়ে ওমর ফারুক বলেন, ‘তাদের (সেভেন স্টার) দলীয় পরিচয় আছে। সেটা আমরাই দিয়েছি। তবে এলাকায় এবং সংগঠনে কোনো অবস্থান নেই তাদের। মনোনয়ন চাইতেই পারেন; কিন্তু আওয়ামী লীগ সেজে এমপির বিরুদ্ধে কথা বলে তারা আসলে আওয়ামী লীগের ক্ষতি করছেন।’

রাজশাহী-২ (সদর) আসনটিতে গত দুই মেয়াদে এমপি হয়েছেন আওয়ামী লীগের শরিক বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা। তবে এখান থেকে এবার দলীয় মনোনয়ন চাইতে পারেন নগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ও রাসিক মেয়রপত্নী শাহীন আক্তার রেনী, মুক্তিযোদ্ধা মীর ইকবাল এবং সাধারণ সম্পাদক ডাবলু সরকার। নগর আওয়ামী লীগ সভাপতি খায়রুজ্জামান লিটনের নেতৃত্বে নগর আওয়ামী লীগ বেশ ভালো অবস্থাতেই রয়েছে। লিটন বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর দিকে তাকিয়ে আছি। তিনি যাকে মনোনয়ন দেবেন, তার পক্ষেই সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করব।’

রাজশাহী-৩ (পবা-মোহনপুর) আসনের বর্তমান এমপি আয়েন উদ্দীন ছাড়াও এই আসনে মনোনয়ন চান আরও নয়জন। তারা হলেন- সাবেক প্রতিমন্ত্রী জিনাতুন নেছা তালুকদার, জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি বেগম আখতার জাহান, সাবেক এমপি মেরাজ উদ্দীন মোল্লা, জেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান আসাদ, যুগ্ম সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান মানজাল, সাংগঠনিক সম্পাদক আলফোর রহমান, পবা উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ইয়াসিন আলী ও কৃষক লীগ নেতা রবিউল ইসলাম বাবু। তাদের অধিকাংশই সাংসদ আয়েন উদ্দীনের বিরুদ্ধে কথা বলছেন বিভিন্ন সভা-সমাবেশে। তবে তারা সম্মিলিতভাবে এখনও তার বিরুদ্ধে মাঠে নামতে পারেননি।

জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান আসাদ বলেন, ‘বর্তমান এমপির ব্যর্থতা আছে। প্রত্যাশিত উন্নয়নের জায়গায় এলাকাকে নিতে পারেননি। নেতাকর্মীদের আস্থা অর্জন করতে পারেননি। আমাদের চেতনার বিরুদ্ধ ধারার মানুষ। এসব কারণেই মনোনয়ন পাব বলে বিশ্বাস করি।’

তবে বর্তমান সাংসদ সাবেক ছাত্রনেতা আয়েন উদ্দীন বলেন, ‘শেখ হাসিনার উন্নয়ন-অর্জনের কথা না বলে নিজ দলের বিরুদ্ধে প্রচারে নেমেছেন নেতারা। তবে তাদের পক্ষে স্থানীয় ছাত্রলীগ, যুবলীগ, আওয়ামী লীগের কেউ নেই। তাদের নিয়ে চিন্তা করছি না। মনোনয়ন পেলে অভিমান ভুলে সবাই একসঙ্গে নৌকার পক্ষে কাজ করবেন।’

রাজশাহী-৪ (বাগমারা) আসনের অবস্থা কিছুটা ভিন্ন। এখানে সাংসদ এনামুল হকের বিরুদ্ধে মাঠে রয়েছেন তাহেরপুর পৌরসভার মেয়র ও পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ এবং বাগমারা উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাকিরুল ইসলাম সান্টু। তাদের সঙ্গে রয়েছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সিংহভাগ ত্যাগী নেতাকর্মী।

মনোনয়নপ্রত্যাশী আবুল কালাম আজাদ বলেন, বর্তমান এমপির সঙ্গে ত্যাগী কোনো নেতাকর্মী নেই। ত্যাগী নেতাকর্মী যারা বাংলা ভাইয়ের বিরুদ্ধে মিছিল-সমাবেশ করে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন তারা সবাই আমাদের সঙ্গে আছেন। তাই আশা করি দলীয় সভাপতি এবার আমাকেই মনোনয়ন দেবেন।

মোবাইল ফোন বন্ধ থাকায় এ বিষয়ে সাংসদ এনামুলের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

রাজশাহী-৫ (পুঠিয়া-দুর্গাপুর) আসনটিতে বর্তমান এমপি কাজী আবদুল ওয়াদুদ দারার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে মাঠে আছেন সাতজন মনোনয়নপ্রত্যাশী। তারা সবাই একজোট হয়ে সমাবেশ করে বর্তমান এমপিকে প্রতিরোধের ঘোষণা দিয়েছেন। তারা বলছেন, বর্তমান এমপিকে মনোনয়ন না দিয়ে যেন তাদের সাতজনের মধ্যে থেকে যে কাউকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। মনোনয়নপ্রত্যাশী ওই সাতজন হলেন- রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ও সাবেক সাংসদ তাজুল ইসলাম মোহাম্মদ ফারুক, রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আবদুল মজিদ সরদার, জেলা আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক ডা. মুনসুর রহমান, জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আহসান উল হক মাসুদ, রাজশাহী জেলা যুবলীগের সহসভাপতি ওবায়দুর রহমান, আওয়ামী লীগের ধর্মবিষয়ক উপকমিটির সদস্য আবু সায়েম ও ব্যবসায়ী আসিফ ইবনে আলম তিতাস।

সাংসদ আবদুল ওয়াদুদ দারাকে ইঙ্গিত করে মনোনয়নপ্রত্যাশী আবদুল মজিদ সরদার বলেন, সাংসদ আবদুল ওয়াদুদকে যে কোনো মূল্যে এই এলাকার জনগণ প্রতিরোধ করবে। আরেক মনোনয়নপ্রত্যাশী ওবায়দুর রহমান বলেন, ২০০৮ সালে তারা এমন একজন প্রার্থীকে নির্বাচিত করেছিলেন এখন যার নাম মুখে নিতে হলে তিনবার ওজু করতে হয়।’ তবে দেশের বাইরে থাকায় এসব বিষয়ে সাংসদ কাজী আবদুল ওয়াদুদ দারার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

রাজশাহী-৬ (বাঘা-চারঘাট) আসন থেকে মনোনয়ন চান বর্তমান সাংসদ ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম ছাড়াও আওয়ামী লীগের আরও তিন নেতা। তারা হলেন- জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক লায়েব উদ্দীন লাভলু, সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য রায়হানুল হক ও বাঘা পৌরসভার সাবেক মেয়র আক্কাস আলী। একসঙ্গে তারা বৈঠকও করেছেন।

জেলা আওয়ামী লীগ নেতা অ্যাডভোকেট লায়েব উদ্দীন লাভলু বলেন, স্থানীয়ভাবে নেতৃত্ব গড়ে উঠুক, এটা আমরা চাই। বর্তমান এমপি শাহরিয়ার আলম হাইব্রিড আমদানি করেছেন। স্থানীয় আওয়ামী লীগকে বাঁচাতে এবং প্রকৃত আওয়ামী লীগের হাতে নেতৃত্ব ফেরাতে আমরা তিন মনোনয়নপ্রত্যাশী একসঙ্গে বসে আলোচনা করেছি।’

এ বিষয়ে স্থানীয় সাংসদ ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বলেন, ‘এই তিনজনের কেউ কোনো নির্বাচনে কাউকে সমর্থন করেছেন, এমন উদাহরণ নেই। তারা যে একমত হয়েছেন, তাদের এই ঐক্য অটুট থাকুক, তারা দলের প্রয়োজনে নৌকার পক্ষে সামনের দিনে পথ চললে সাধুবাদ জানাব।’