আজ মঙ্গলবার রাত ৪:০৯, ১৭ই অক্টোবর, ২০১৭ ইং, ২রা কার্তিক, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, ২৫শে মুহাররম, ১৪৩৯ হিজরী

এই পারুলি সেই পারুলি

নিউজ ডেস্ক | বার্তা বাজার .কম
আপডেট : মার্চ ২৩, ২০১৭ , ৯:০৭ অপরাহ্ণ
ক্যাটাগরি : সফলতার গল্প
পোস্টটি শেয়ার করুন

এক সময় যাত্রী ছাউনির এক কোণে আস্তাকুড়ের মধ্যে পড়ে থাকতো সে। ছেঁড়া জামাকাপড় পড়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াতো। কেউ কোনো খোঁজ খবর নিতো না। খেতেও দিতো না। রোগে-শোকে ভুগলেও কেউ এগিয়ে আসতো না। তার শারীরিক অবস্থা ছিল সংকটাপন্ন। মানসিক ভারসাম্যহীন এই তরুণী নিজের নাম পারুলি বলে দাবি করলেও তার কথাবার্তা ছিল অসংলগ্ন। আর এখন সেই পারুলি সবার সঙ্গে কথা বলছেন, হাসছেন, পরিবারের অনেকের নামও বলতে পারছেন। পুরোপুরি সুস্থ।

শুধু মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার পুকুরিয়া যাত্রী ছাউনির এই পারুলি নয়, বান্দরবানের অন্তর, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাইজুল, ময়মনসিংহের সাহিদা, ফুলপুরের ঝর্ণা, নোয়াখালীর আরিফ, রাজধানীর পল্টনের আদুরীও এখন পুরোপুরি সুস্থ!

মানসিক ভারসাম্যহীনদের সুস্থ করার মধ্য দিয়ে যিনি সুখ খুঁজে পান তিনি হলেন ব্যাংকার শামীম আহমেদ। পাগল খুঁজে বেড়ান তিনি, পাগল খুঁজে ভালো করাই তার নেশা। নেশার টানে ছুটে বেড়ান দেশের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত। কখনো বান্দরবান, কখনো মানিকগঞ্জ, কখনো নোয়াখালী, কখনো বা ময়মনসিংহ। আবার ছুটে যান সাভার। রাস্তায় পড়ে থাকা মানসিক ভারসাম্যহীনদের পরম মমতায় আগলে ধরেন। তাদের সেবা ও চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ করে পরিবারের হাতে তুলে দেন।

এ ব্যাপারে তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ব্যাপক প্রচারণা চালাচ্ছেন। এভাবে তারা একটি গ্রুপ গঠন করেছেন। এ গ্রুপের সহায়তায় এগিয়ে যাচ্ছেন শামীম আহমেদ। তিনি বলেন, শুরু থেকেই আমার বন্ধু ও অফিস কলিগ আলী সাব্বির আমাকে সহায়তা করছেন। এছাড়া, ফেসবুকের মাধ্যমে কিছু বন্ধু এ কাজে মানসিক, লজিস্টিক সাপোর্ট ও সহযোগিতা করছেন। ফেসবুক বন্ধুদের অনুপ্রেরণা আমাকে সত্যিই মুগ্ধ করে।

শামীম আহমেদ আরও বলেন, একজন ভিক্ষুক আমাদের কাছে টাকা অথবা কিছু খাবার চাইতে পারে। কিন্তু একজন পাগল কিছু চাইতে পারে না। তারা খুবই অসহায়। ফেসবুকের মাধ্যমে আমি আমার কাজের প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছি। আমরা যদি সবাই রাস্তায় পড়ে থাকা মানুষের পাশে এগিয়ে আসি তাহলে হয়তো একদিন একজন মানুষও রাস্তায় পড়ে থাকবে না।

শামিম আহমেদের চেষ্টায় মানিকগঞ্জের অঙ্গাতপরিচয়ের মানসিক ভারসাম্যহীন তরুণী পারুলি অনেকটাই স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছে। দুই মাস আগে যিনি ছেঁড়া জামাকাপড় পড়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াতেন, আজ তিনি পেয়েছেন নতুন জীবন। ঢাকার জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট হাসপাতালে চিকিৎসার পর পারুলিকে ঢাকার আদাবর এলাকার জরিনা বেগম নামে এক নারীর তত্বাবধায়নে রেখে সম্পূর্ণ সুস্থ করেছেন ব্যাংকার শামিম আহমেদ।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শামিমের কাজের খবর ছড়িয়ে পড়লে তার এক পরিচিতজন ওই তরুণীর সন্ধান দেন শামিমকে। খবর শোনামাত্র বন্ধু সাব্বিরকে নিয়ে ছুটে যান মানিকগঞ্জের পুকুরিয়া বাসস্ট্যান্ডে। এরপর ঘিওর থানা পুলিশের অনুমতি নিয়ে পারুলিকে উদ্ধার করে তাকে ভর্তি করান ঢাকার মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট হাসপাতালে। এমন মহত কাজে পারুলিকে ঢাকায় নিতে শামিমকে অ্যাম্বলেন্স দিয়ে সহযোগিতা করেন ঘিওরের পশ্চিম শাহিলী একতা সমাজকল্যাণ সংস্থা।

বাড়ির ঠিকানা সঠিকভাবে বলতে না পারলেও পারুলির গ্রামের বাড়ি পিরোজপুর জেলার মঠবাড়িতে বলে মাঝে মাঝে বলেন তিনি। এখন পারুলিকে পরিবারের সদস্যদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য নিয়ে যাচ্ছেন শামিম আহমেদ।

ব্রহ্মণবাড়িয়া সন্তান শামিম আহম্মেদ। দীর্ঘ ১১ বছর ধরে যমুনা ব্যাংকের ঢাকা হেড অফিসে আছেন। সেখানে তিনি আইসিটি ডিভিশনে সিনিয়র এক্সিকিউটিব অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। চাকরির পাশাপাশি এ রকম মহত কাজের শুরু ২০১৫ সালের ১৭ আগস্ট। নিজ বাড়ি থেকে অফিসে যাবার পথে পল্টন মোড়ে মানসিক ভারসাম্যহীন এক তরুণীকে দেখতে পান। ছেঁড়া কাপড়ে জড়ানো অবস্থায় থাকা মানসিক ভারসাম্যহীন ওই তরুণীর নাম জানা ছিল না। প্রথমদিন তিনি তাকে কিছু কিছু খাবার কিনে দিতেন। এরপর অফিসে গিয়ে সহকর্মী আলী সাব্বিরের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন। এরপর সিদ্ধান্ত নেন ওই তরুণীকে চিকিৎসা করাবেন। যোগাযোগ করেন জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট হাসপাতালের কর্মকর্তাদের সঙ্গে। এরপর পল্টন থানা পুলিশের সহায়তায় ২০১৫ সালের জুলাই মাসে তাকে ভর্তি করান মানসিক হাসপাতালে। তখনো মানসিক প্রতিবন্ধী ওই তরুণীর পরিচয় তাদের জানা ছিল না। শামিদের দেয়া আদুরী নামেই তাকে ভর্তি করা হয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে। কয়েকদিনের চিকিৎসাতেই আদুরী অনেকটা সুস্থ হয়ে উঠেন। ফিরে আসতে শুরু করেন স্বাভাবিক অবস্থায়। এরপর তার কিছু কিছু কথার সূত্র ধরে ফেসবুক ও পোস্টারিংয়ের মাধ্যমে খুঁজে পাওয়া যায় আদুরীর বাবাকে। আদুরী ফিরে পান তার বাবা-মাসহ আত্মীয়স্বজনদের। পরে পরিবার জানায় আদুরীর আসল নাম জবা।