১৯, নভেম্বর, ২০১৮, সোমবার | | ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৪০

চট্টগ্রাম পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনাল নির্মাণের ইকুইপমেন্ট সংগ্রহে দরপত্র আগামী মাসেই

আপডেট: নভেম্বর ৫, ২০১৮

চট্টগ্রাম পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনাল নির্মাণের ইকুইপমেন্ট সংগ্রহে দরপত্র আগামী মাসেই

মুহাম্মাদ হুমায়ুন চৌধুরী, চট্টগ্রাম প্রতিনিধি, ০৫ নভেম্বর২০১৮ঃ বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে টার্মিনাল নির্মাণ হয়, কিন্তু সেই টার্মিনালে জাহাজ থেকে পণ্য হ্যান্ডেলিংয়ের জন্য ইকুইপমেন্ট যুক্ত হয় না। চট্টগ্রাম বন্দরের ক্ষেত্রে এই অভিযোগটি শতভাগ সত্য। নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের ইকুইপমেন্ট এসেছে প্রায় ১১ বছর পর। তবে কর্ণফুলীর তীরে বর্তমানে চলমান পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালে এমনটা হবে না। আগামী বছরের ডিসেম্বরে টার্মিনাল নির্মাণ ও ইকুইপমেন্ট যুক্ত একইসাথে করতে চায় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ।
কর্ণফুলী নদীর তীরে চিটাগং ড্রাইডক ও বোট ক্লাবের মধ্যবর্তী এলাকায় নির্মাণ হতে যাওয়া পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল (পিসিটি) নির্মাণের কাজ চলছে কিছুটা ধীর গতিতে। বিমানবন্দরমুখী রাস্তার উভয় পাশে চলছে পাইলিংয়ের কাজ। ড্রাইডক থেকে বোট ক্লাবের সামনে পর্যন্ত রাস্তাটি সোজা করার কাজ চলছে। লালদিয়ায় ইনকনট্রেন্ড কনটেইনার টার্মিনালের পেছনে রেড ক্রিসেন্টের বেস অফিস, ওমেরা অয়েল, সামুদ্রিক মৎস্য অধিদপ্তর ও কাস্টমস হাউসের অফিসকে স্থানান্তর করার কথা থাকলেও এখনো তা করা যায়নি। কিন্তু তারপরও নির্ধারিত সময়ে (আগামী বছরের ডিসেম্বর) প্রকল্পের কাজ শেষ করার লক্ষ্যমাত্রার কথা বলছেন রিয়ার এডমিরাল হিসেবে গতকাল পদোন্নতি পাওয়া চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান জুলফিকার আজিজ।
তবে ধীর নয়, কাজ সঠিক গতিতেই এগুচ্ছে জানিয়ে রিয়ার এডমিরাল জুলফিকার আজিজ বলেন, ‘বর্ষার পর কাজে গতি এসেছে, এই মৌসুমটা দ্রুত কাজ চলার পর আগামী বর্ষায় আবার একটু ধীর হতে পারে।
তাহলে কি আপনার টার্গেট অনুযায়ী আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ হবে? এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘পরিবেশ পরিস্থিতির কারণে যদি ডিসেম্বরে শেষ না হতে না পেরে সেক্ষেত্রে হয়তো দুই থেকে তিন মাস বিলম্ব হতে পারে, এর বেশি নয়।’
কিন্তু চট্টগ্রাম বন্দরের ইতিহাসে টার্মিনালের কাজ শেষ হলেও ইকুইপমেন্ট আসতে এক যুগের বেশি সময় পার করে দেয়। পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালের ক্ষেত্রেও একই পরিস্থিতি অপেক্ষা করছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি টার্গেট নিয়ে কাজ করি। তাই পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালের নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার সাথে সাথে যাতে ইকুইপমেন্টও যুক্ত হয় সেই উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আগামী মাসেই ইকুইপমেন্টের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হবে। দরপত্র যাচাই-বাছাই করে কার্যাদেশ দিয়ে হয়তো জানুয়ারি পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। আর ইয়ার্ডের নির্মাণ কাজের সাথে সাথে এসব ইকুইপমেন্টগুলোও প্রস্তুত হয়ে যাবে।’
পিসিটি প্রকল্পের আওতায় চারটি কিউ গ্যান্ট্রি ক্রেন রয়েছে জানিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রধান প্রকৌশলী (যান্ত্রিক) নাজমুল হক বলেন, ‘একটি গ্যান্ট্রি ক্রেন নির্মাণ করতে প্রায় ১২ মাস সময় লাগে। এছাড়া অন্য উপকরণগুলো ছয় থেকে আট মাসের মধ্যে নির্মাণ করা সম্ভব। আর সেই হিসেব করে আগামী মাসে গ্যান্ট্রি ক্রেনের জন্য এবং জানুয়ারি মাসে অন্য উপকরণগুলো কেনার জন্য দরপত্র আহ্বান করার কথা রয়েছে।’
টার্মিনাল ও ইকুইপমেন্ট একই সাথে চালু করা না গেলে পণ্য হ্যান্ডেলিংয়ে গতি আসবে না জানিয়ে শিপ হ্যান্ডেলিং ও বার্থ অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান এ কে এম শামসুজ্জামান রাসেল বলেন, ‘বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে আমাদের প্রত্যাশা থাকবে টার্মিনাল নির্মাণের সাথে সাথে যাতে ইকুইপমেন্ট যুক্ত হয়ে যায়। তবেই এর সুফল আসবে।‘
চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনার পরিবহনে শীর্ষ কোম্পানিগুলোর মধ্যে অন্যতম এমএসসি শিপিং। অবস্থানগত কারণে পিসিটি গুরম্নত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে জানিয়ে এমএসসি শিপিং কোম্পানির সিনিয়র ম্যানেজার (অপারেশন) আজমির হোসাইন চৌধুরী বলেন, ‘নদীর এ পয়েন্টে ড্রাফট (গভীরতা) ভাল। তাই তুলনামূলকভাবে বেশি ড্রাফটের জাহাজ এখানে ভিড়তে পারবে। ফলে এই টার্মিনাল দিয়ে কনটেইনার হ্যান্ডেলিংও বেশি হবে। এজন্য টার্মিনাল ও ইকুইপমেন্ট একইসাথে চালু করতে হবে।’
পিসিটি শুধু একটি টার্মিনাল নয়, একটি বন্দরও জানিয়ে জুনিয়র চেম্বার ইন্টারন্যাশনাল চিটাগংয়ের সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন বলেন, ‘যেহেতু একই এলাকায় একাধিক বন্দরের নামকরণ হতে পারে না তাই টার্মিনাল নামকরণ করা হয়। পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালও প্রায় একটি বন্দর। চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে দিন দিন পণ্য হ্যান্ডেলিং বাড়ছে, তাই দ্রুত এর ইকুইপমেন্ট সংগ্রহের উদ্যোগ নিতে হবে।’
জানা যায়, পিসিটির অধীনে চারটি কিউ গ্যান্ট্রি ক্রেন (৪০ টন), চারটি স্ট্র্যাডেল কেরিয়ার (৪০ টন), ৪টি রিচ স্ট্যাকার (৪৫ টন), ৮টি রাবার টায়ার্ড গ্যান্ট্রি ক্রেন (৪০ টন), ৮টি ফর্ক লিফট ও একটি রেল মাউন্টেন্ড গ্যান্ট্রি ক্রেন রয়েছে। প্রায় ১৮০০ কোটি টাকা ব্যায়ে বন্দরের নিজস্ব অর্থায়নে ডিপিপি (সরাসরি সংগ্রহ পদ্ধতি) পদ্ধতিতে তা বাসত্মবায়িত হচ্ছে। ২৬ একর জায়গার নতুন এ টার্মিনালে চারটি জেটি হচ্ছে। এরমধ্যে তিনটি জেটি ( প্রতিটি ২০০ মিটার দীর্ঘ) হবে কনটেইনার হ্যান্ডেলিংয়ের জন্য এবং বাকি একটি জেটি হবে ডলফিন জেটি (২২০ মিটার দীর্ঘ)। বন্দরের মূল জেটির সাথে পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালের কনটেইনার পরিবহনের জন্য পৃথক রেললাইন, লোকোমেটিভ ও বগি থাকবে। ট্রেনগুলো কিছুড়্গণ পর পর কনটেইনার নিয়ে বন্দরের মূল জেটিতে যাতায়াত করবে।
উল্লেখ্য, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ গত বছর সাড়ে ২৬ লাখ একক কনটেইনার হ্যান্ডেলিং করে। ২০১৬ সালে সাড়ে ২৩ লাখ, এর আগের বছর ২০১৫ সালে ২০ লাখ একক কনটেইনার হ্যান্ডেলিং করে। এবার এ সংখ্যা ৩০ লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে। বন্দরের প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রাখতে নতুন টার্মিনালের বিকল্প নেই।