বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি) দক্ষিন এশিয়ার মধ্য সর্ববৃহৎ কৃষি শিক্ষার বিদ্যাপীঠ। ১৯৬১ সালের ১৮ আগস্ট বিশ^বিদ্যালয়টি ময়মনসিংহ শহরে যাত্রা শুরু করে। বর্তমানে বিশ^বিদ্যালয়ে মোট ৭১০৩ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত রয়েছে। সবার থাকার জন্য রয়েছে ১৩ টি আবাসিক হল। ছেলেদের ৯টি হলের মধ্য আশরাফুল হক হল একটি।
আমি যেহেতু আশরাফুল হক হলে থেকে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষাজীবন পার করার সুযোগ পেয়েছি তাই আমি আমার হলকেই তুলে ধরছি। আশরাফুল হক হল নাম শুনলেই মনের মাঝে শিহরণ জাগে কারণ জীবনের আনন্দঘন ও স্মৃতিকাতর দিন গুলোর কথা আজীবন মনের ডায়েরীতে লিপিবদ্ধ হয়ে থাকে। বিশ^বিদ্যালয়ে এসে পরিবার পরিজন ছেড়ে একদম নতুন ঠিকানায় নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য যে সংগ্রাম শুরু হয় তার সূচনা হয় হলে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেয়ার মাধ্যমে। নতুন পরিবেশে নতুন মানুষের সাথে পরিচয় হয় এখানে। একসাথে এক রুমে থাকা ও রাতজেগে আড্ডা দেওয়ার অভিজ্ঞতা হয় হলে। বাসার মত আলিসান খাটে একা এক রুমে না থেকে স্বল্প জায়গায় আটোঁ সাটোঁ হয়ে কোনোমতে টিকে থাকার নাম হল জীবন। তবে এর মধ্যই জীবনের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তগুলো রচিত হয়। মনের ডায়েরীতে চয়ন হয় নানান সুখ দুঃখের কবিতা ও গল্প। বন্ধুত্বের গন্ডীটা অনেকটা বড় রুপ ধারণ করে বিশ^বিদ্যালয়ে এসে। সারাদেশের মানুষের সাথে মিলবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার একটা সুযোগ এই হলের পরিবেশ। সবার জীবনের একটা সুন্দর সময় পার করে হল জীবনে এসে। সারাজীবন এই স্মৃতি বাধাই হয়ে থাকে মনের কোটরে। তেমনি আমার সকল স্মৃতিও আম্লান হয়ে থাকবে আশরাফুল হক হলের ১২৫/সি নম্বর রুমে।
আশরাফুল হক হলের নামকরণ করা হয় বাকৃবির অধ্যাপক ড. আশরাফুল হকের নামে। তিনি বিশ^বিদ্যালয়ের ফসল উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান ও ডিন হিসেবে দ্বয়িত্ব পালন করেন এবং বেশকয়েকবার তিনি বিশ^বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য হিসেবেও কাজ করেছেন। তিনি ভারতের বেনারস উত্তর প্রদেশে ১৯১৯ সালের ১৫ই মার্চ জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বিশ^বিদ্যারয়ের জন্য এক নিবেদিত প্রাণ। কৃষি অনুষদ থেকে তিনি ১৯৪৩ সালে স্নাতক ডিগ্রি, ১৯৪৭ সাথে তিনি মাস্টার্স ডিগ্রি এবং ১৯৫২ সালে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত তিনি ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের লেকচারার হিসেবে কাজ করেন। ১৯৫৬ থেকে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের রিডার এবং ১৯৬৩ থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত অক্সফোর্র্ডের বোটানি স্কুলের সিনিয়র লেকচারার পদে কাজ করেন। পরিশেষে তিনি তার জীবনের শেষ সময়টা বাকৃবিকেই সমর্পন করেন। তিনি ১৯৬৪ হতে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ কৃষি বিশ^বিদ্যালয়ের অধ্যাপক হিসেবে কাজ করেন। তিনি সাইটোজেনোটক্স এর উপর মূল্যবান গবেষনা পরিচালনা করেন এবং ১৯ টি তথ্যবহুল গবেষনা মূলক প্রবন্ধ দেশে-বিদেশে প্রকাশ করেছেন। তিনি ১৯৮২ সালের ১৯শে জানুয়ারী মৃত্যুবরণ করেন।
আশরাফুল হক হলের নির্মান কাজ শুরু করা হয় ১৯৭৯ সালে। হলটি উদ্বোধন করা হয় ১৯৮২ সালে। প্রথম হল প্রভেস্ট হিসেবে ৪ ফেব্রুয়ারী ১৯৮২ সালে নিয়োগ পান মো. রাজ্জাক আলী । এ পর্যন্ত মোট ২৪ জন শিক্ষক এই হলের প্রভোস্টের দ্বায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শাহ্জাহান কবির প্রভোস্টের দ্বয়িত্ব পালণ করছেন। জেনারেল হাউস টিউটরের দ্বয়িত্ব পালন করছেন সাইফুর রহমান এবং হাউস টিউটর হিসেবে দ্বায়িত্বরত আছেন আসাদুজ্জামান সাগর এবং মো. আরিফ সাকিল। ডেপুটি রেজিস্টার হিসেবে কর্মরত আছেন বোরহান উদ্দিন, সহকারী রেজিস্টার হিসেবে মো. ফরিদ উদ্দিন, ইমাম হিসেবে হাফেজ মাওঃ মো. জুনাইদুর রহমান। এছাড়াও আহসান উল্লাহ, এমদাদুল হক এবং মোখলেছুর রহমান অফিস স্টাফ হিসেবে দ্বায়িত্ব পালন করছেন। হল স্টাফ হিসেবে কর্মরত আছেন মোট ২৩ জন। আশরাফুল হক হলে মোট ৫ টি ব্লকে ১২০ টি আবাসিক কক্ষ রয়েছে। বর্তমানে ৫২০ জন বাকৃবিয়ান হলে শিক্ষাজীবন পার করছেন। হলে একটি বিশাল ডাইনিং, একটি গেস্ট রুম, একটি কমন রুম রয়েছে। বিনোদনের জন্য রয়েছে ইনডের গেম খেলার ব্যাবস্থা এবং দুটি টেলিভিসন সেট। হলের সামনে রয়েছে বিশাল ফুলের বাগান যা হলটির সৌন্দর্যকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। বিশাল খেলার মাঠ রয়েছে আশরাফুল হক হলের সামনে, শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন হল টুর্নামেন্টর আয়োজন করে হল জীবনকে আরও গতিময় করার জন্য। প্রতি বছর নবীনদের বরণের জন্য আয়োজন করা হয় হল ফিস্ট যা হলটিকে আরও প্রানবন্ত করে তুলে। আশরাফুল হক হলকে বলতে গেলে একটি কথাই মনে ভাসে তা হলো জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত তোমার স্মরণে কাটবে এবং আমার মনে সারাজীবন তুমি জীবন্ত ফুলের মত ফুটবে।
বার্তাবাজার/আরএইচ