জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে র্যাগিংয়ের নামে জুনিয়র শিক্ষার্থীর কান ফাটিয়ে দিয়েছেন একই হলের এক সিনিয়র শিক্ষার্থী। সোমবার দিবাগত (২৩ জুলাই) রাত ১টায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের গণরুমে এ ঘটনা ঘটে। এতে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে নবীন শিক্ষার্থীরা। ফলে গতকাল তারা নিজ হলে অবস্থান না করে রাত কাটিয়েছিল বাইরে।
ঘটনায় ভুক্তভোগী ছাত্রের নাম মো. ফয়সাল আলম (গণিত-৪৮)। তাকে থাপ্পড় মেরে কানের পর্দা ফাটিয়ে দেন শিহাব (মাকের্টিং-৪৭) নামের এক সিনিয়র শিক্ষার্থী।
ভুক্তভোগী ঐ শিক্ষার্থী জানান, ‘রাত ১টায় শিহাব (মাকের্টিং-৪৭), শাকিল (ইতিহাস-৪৭), নীরবসহ (ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং-৪৭) সহ আরো ২০-২৫ জন শিক্ষার্থী গণরুমে এসে আমার পরিচয় জিজ্ঞাসা করে।সর্দিজনিত কারণে গলায় সমস্যা থাকায় পরিচয় দেয়ার সময় হলের নাম জোরে কেন বলতে পারিনি এজন্য আমাকে মুরগী হতে বলে। আমি চার-পাঁচ বার মুরগী হওয়ার পরে তারা আমাকে গণরুমের জানালার গ্রিলের সাথে ঝুলে থাকতে বলেন। আমার এক হাতের তালু সামান্য কাটা থাকায় ঝুলতে অস্বীকৃতি জানালে শিহাব এসে আমার কানের উপর সজোরে থাপ্পর দেয়। এতে আমার কানে প্রচন্ড যন্ত্রনা শুরু হওয়ার এক পর্যায়ে কান থেকে রক্ত ঝরতে থাকে। অবস্থা বেগতিক দেখে গণরুমের বন্ধুরা আমাকে বিশ্বিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারে নিয়ে যায়। পরবর্তীতে এনাম মেডিকেল থেকে প্রাথমিক চিকিৎসা নেয়ার পর আমার পরিবার আমাকে বাসায় নিয়ে আসে।’
এ ঘটনার সুষ্ঠুবিচার চেয়ে ঐ শিক্ষার্থী আরো জানান,‘এ ঘটনার পর থেকে নীরবসহ বেশ কয়েকজন ফোনে আমাকে হুমকি দেয় যাতে আমি কাউকে এ বিষয়ে কোন কিছু না জানাই। তারা আমাকে হলে থাকতে বারণ করে। আমি ঘটনার সুষ্ঠ তদন্তের মাধ্যমে সঠিক বিচার চাই, যাতে পরবর্তীতে এ ধরনের অনাকাঙ্খিত ঘটনার শিকার কোন শিক্ষার্থীকে আর না হতে হয়। আমি আগামীকাল ক্যাম্পাসে প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ জানাবো।’
এ বিষয়ে শিহাবকে (মার্কেটিং-৪৭) মুঠো ফোনে একাধিবার কল দেয়া হলেও তার নাম্বারটি বন্ধ পাওয়া যায়।
ঘটনার দায় স্বীকার করে নীরব (ফিন্যান্স এন্ড ব্যাংকিং-৪৭) জানান,’ অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে ঘটনাটি ঘটে গেছে। কথা না শুনায় আমাদের এক সহপাঠী তার (ফয়সাল) গায়ে হাত তুলে। তবে বিষয়টি এত মারাত্মক হবে তা আমরা বুঝতে পারিনি।’ হুমকি দেয়ার বিষয়ে তাকে (নীরব) প্রশ্ন করা হলে সে বিষয়টি এড়িয়ে যায়।
এ বিষয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের প্রভোস্ট প্রফেসর ড. ফরিদ আহমেদ জানান, ‘আমি বিষয়টি জেনেছি। আজ রাত সাড়ে সাতটায় জরুরি মিটিং ডাকা হয়েছে। আবাসিক শিক্ষক, ওয়ার্ডেনসহ সবাইকে নিয়ে বসবো। সবার সাক্ষাৎকার নিয়ে প্রাথমিক রিপোর্টের ভিত্তিতে সঠিক বিচার নিশ্চিত করবো যাতে কেউ ভবিষ্যতে এরকম কাজ করতে সাহস না পায়।’
এদিকে উক্ত ঘটনার পর গত রাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের নবীন (৪৮ ব্যাচের) শিক্ষার্থীদের কাউকে হলে অবস্থান করতে দেখা যায় নি। আতঙ্কিত হয়ে তারা কেউ কেউ অন্য হলগুলোতে রাত কাটিয়েছে আবার কেউ কেউ সারারাত শহীদ মিনার, সেন্ট্রাল ফিল্ডসহ বিভিন্ন স্থানে নির্ঘুম থেকে রাত কাটিয়েছে।
তবে রাত আনুমানিক ৪টার দিকে ৪৭ ব্যাচের শিক্ষার্থীরা তাদের ফোন করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে হুমকি দিয়ে তাদের কয়েকজনকে হলে আনিয়েছে বলে জানান নাম প্রকাশ না করা শর্তে কয়েকজন নবীন শিক্ষার্থী। তারা আরো জানান, ‘প্রথম বর্ষে সকল শিক্ষার্থীকে অলিখিত নিয়মে গণরুমে থাকতে হয়। সেখানের সিনিয়র শিক্ষার্থীরা আদব কায়দা বা ক্যাম্পাসের নিয়ম কানুন শিখানোর নামে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন (র্যাগিং) করে। কিন্তু গত পরশুদিনের ঘটনা আমাদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করেছে। আমরা হলে অবস্থান করতে ভয় পাচ্ছি।’
বার্তাবাজার/কে.জে.পি