মা না ফিরলে ভাত খাবে না তুবা

ঘাতকরা কেড়ে নিয়েছে মাকে। টানা তিন দিন মায়ের দেখা পায় না তাসমিন তুবা। প্রথম দিকে মগ্ন ছিল পুতুলখেলায়, এখন তার মাকে চাই। মাকে ছাড়া সে খাবে না। বারবার বলছে, ‘মা কখন আসবে? মা কেন আসছে না? মা না এলে আমি ভাত খাব না।’

সোমবার (২২ জুলাই) সারা দিন মায়ের অপেক্ষায় থেকে চার বছরের তাসমিন মাঝেমধ্যেই ভেঙে পড়ছিল কান্নায়। তার বড় ভাই ১১ বছরের তাহসিন আল মাহিন অন্তত বুঝতে পারে, তাদের মা আর কোনো দিন ফিরবেন না। তবে বোনকে সান্ত্বনা দেওয়ার অবস্থা তার নেই। শোকে-দুঃখে সে নির্বাক। একই অবস্থা তাদের আত্মীয়দেরও।

উন্মত্ত মানুষের বর্বরতায় আকস্মিক মা-হারা ছেলেমেয়ে দুটিকে কী বলে প্রবোধ দেবেন, তার ভাষা খুঁজে পাচ্ছিলেন না তারা। ছেলেধরা সন্দেহে তাদের মা তাসলিমা বেগমকে (৪০) গত শনিবার (২০ জুলাই) ঢাকার উত্তর-পূর্ব বাড্ডা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গণপিটুনিতে হত্যা করা হয়।

রোববার (২১ জুলাই) লক্ষ্মীপুরের রায়পুরার সোনাপুর গ্রামের বাড়িতে পারিবারিক কবরস্থানে তাসলিমাকে দাফন করা হয়েছে। তাসমিন ও তাহসিন এখন সেখানেই নানির বাড়িতে আছে।

প্রসঙ্গত, গত শনিবার সকালে মেয়ের ভর্তির বিষয়ে খোঁজ নিতে বাড্ডা উত্তর-পূর্ব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যান তাসলিমা বেগম। বছরের মাঝামাঝিতে ভর্তির তথ্য নিতে যাওয়ায় স্কুলের গেটে থাকা কয়েকজন অভিভাবক সন্দেহবশত তাকে প্রধান শিক্ষিকার কক্ষে নিয়ে যান। এর মধ্যেই ছেলেধরা আটকের গুজব ছড়িয়ে পড়ে। অতিদ্রুত কয়েক শ উন্মত্ত মানুষ স্কুলের গেট ভেঙে ভেতরে আসেন। তাঁরা প্রধান শিক্ষিকার কক্ষে ঢুকে দেয়ালে তাসলিমার মাথা ঠুকতে থাকেন। একপর্যায়ে লাথি-ঘুষি দিতে দিতে টেনেহিঁচড়ে নিচে নামিয়ে বেধড়ক লাঠিপেটা করেন। প্রায় আধা ঘণ্টা পর পুলিশ তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিলে চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন। নিহত তাসলিমার বাড়ি লক্ষ্মীপুরের রায়পুরের সোনাপুর গ্রামে। ঢাকার মহাখালী ওয়্যারলেস গেটে মায়ের সঙ্গে থাকতেন। দুই বছর আগে তার বিবাহবিচ্ছেদ হয়। তিনি ১১ বছরের ছেলে ও ৪ বছরের এক মেয়ের মা।

ভিডিটি প্রকাশিত হওয়ার পর নড়েচড়ে বসেছে গোটা দেশ।তুবার আহাজারিতে সকলের চোখের কোনে জমেছে জল।তবে মানুষগুলো তো এখনও মানুষ হলো না।মানুষ হত্যার মিছিলটা দিন দিন আরো লম্বা হচ্ছে।

এমন সময় তাই রবি ঠাকুর আর বিদ্যাসাগরকে বড্ড মনে পড়েছে।রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘এই দুর্বল, ক্ষুদ্র, হৃদয়হীন, কর্মহীন, দাম্ভিক, তার্কিক জাতির প্রতি বিদ্যাসাগরের এক সুগভীর ধিক্কার ছিল।’ বাঙালি দুর্বল, বাঙালি হৃদয়হীন, বাঙালি কর্মহীন, বাঙালি দাম্ভিক, বাঙালি তার্কিক! এটা রবীন্দ্রনাথের আমলে ছিল, এটা এই আমলেও আছে। এই জাতির প্রতি বিদ্যাসাগরের ধিক্কার ছিল, এই সমাজের প্রতি ধিক্কার তুলে নেবার কোনো কারণ নেই! রবীন্দ্রনাথই বলেছিলেন, রেখেছ বাঙালি করে মানুষ করোনি। বাঙালিকে জননী বাংলাদেশ তখনো মানুষ করেনি, এখনো মানুষ করেনি।

বার্তাবাজার/এএস

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর