টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলায় কর্তৃপক্ষের নজরদারী না থাকায় উপজেলার সাড়ে চারলক্ষ মানুষের মুখ ও দাতের চিকিৎসা চলছে হাতুরে ডাক্তার দিয়ে। কিছু ঔষধের দোকানদার, স্কুলছাত্র, ডিপ্লোমাধারী টেকনেশিয়ান ছাড়াও কিছু স্বশিক্ষিতরা ডাক্তার সেজে রোগীর চিকিৎসা দিয়ে আসছে। ফলে একদিকে মানুষ না জেনে সেবার বদলে কৌশলে প্রতারিত হচ্ছে। অপরদিকে অপচিকিৎসার ফলে রোগীরা হেপাটাইটিস সহ এইডস এর মতো জটিল রোগে হুমকিতে পরছে।
সরেজমিনে জানা যায়, উপজেলার রাজনৈতিক অস্থিরতা, দলবাজি, স্বজনপ্রীতি, আইনের অপপ্রয়োগ ও কর্তৃপক্ষের নজরদারির অভাবে ঘাটাইলে বে-আইনীভাবে যত্রতত্র ডেন্টাল কেয়ার গড়ে উঠেছে। এভাবে গড়ে ওঠা ঘাটাইল পৌর এলাকায় ১২টি ডেন্টাল কেয়ার রয়েছে তাছাড়াও পাকুটিয়া-১, ধলাপাড়া-২, গারোবাজার-৫, সাগরদিঘী-৪, জোড়দিঘী-২, দেওপাড়া-১, হামিদপুর-১টি সহ প্রায় ৩০টি ডেন্টাল কেয়ার রয়েছে। এসব ডেন্টাল কেয়ারের নামধারী ডাক্তাররা চিকিৎসার নিয়মনীতি ও আইনের তোয়াক্কা না করে চোখ ধাধানো আকর্ষনীয় ব্যানার ও সাইনবোর্ড টাঙ্গিয়ে তারা ডাক্তার না হয়েও নামের আগে ডাক্তার ও নামের পরে সার্জন, বিশেষজ্ঞ, প্রযুক্তিবীদ, প্রশিক্ষক সহ বিভিন্ন অভিজ্ঞতার মিথ্যা পদবী লিখে প্রকাশ্যে মানুষের সাথে প্রতারনা করে আসছে। এভাবে গত দুই যুগ ধরে মানুষকে অপচিকিৎসা দিয়ে আসলেও এসব ডেন্টাল ক্লিনিকের বিরুদ্ধে কোন অভিযান নেই কর্তৃপক্ষের।
এ বিষয়ে আরও জানা যায়, ৩০টি ডেন্টাল ক্লিনিকের মধ্যে ঘাটাইল পৌর এলাকায় অবস্থিত মা ডেন্টাল কেয়ারের ডাক্তার মোঃ রুহুল আমিন বাবু ও পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় ডেন্টাল মেডিক এর ডাক্তার নাহিদ আল নোমান ও ডাক্তার কামরুল হাসান রাজিব একমাত্র বি.ডি.এস. (ই.উ.ঝ) ডিগ্রীধারী পাশকরা ডাক্তার। এই তিনজন ব্যতিত আর কেউ পাশ করা ডাক্তার না। তাদের মধ্যে অনেকেই সরকারী অথবা বেসরকারী ম্যাটস থেকে শুধুমাত্র ডি.এম.টি.ডি অর্থ্যাৎ ডিপ্লোমা পাশ করে টেকনশিয়ান। অনেকে ঔষধের দোকানদার, স্কুলের ছাত্র এবং অনেকে ৪র্থ শ্রেণি, ৮ম শ্রেণি পাশ করা নামধারী ডাক্তার বলে জানা যায়।
বিধিতে বলা আছে ডিপ্লোমা পাশধারী টেকনেশিয়ানরা সরাসরি চেম্বার খুলে জটিল রোগের কোন চিকিৎসা দিতে পারবেনা। দাঁত উঠানো, দাঁত বাধানো, রুট ক্যানেল, জি আই ফিলিং, মারকারী ফিলিং, লাইট কিউরফিলিং, ক্যাপ, ব্রীজ এবং আকাবাকা দাঁত সোজা করার মতো স্পর্শকাতর চিকিৎসা দেয়ার কোন অনুমতি নাই টেকনিশিয়ানদের। তারা শুধুমাত্র বড়দের দাঁত ওয়াস করতে পারবে। ছোট বাচ্চাদের দুধ দাত ওঠাতে পারবে এবং দুধ দাতের ফিলিং অর্থ্যাৎ গর্ত ভরাট করতে পারবে। সেইসাথে ওয়াল হাউজিং অর্থ্যাৎ রোগীকে পরামর্শ ও সহযোগীতা দিতে পারবে। টেকশিয়ানরা এই ৪টি চিকিৎসা দেয়া ছাড়া অন্য কোন চিকিৎসা দেয়ার অনুমতি নেই তাদের। কিন্তু ঘাটাইল উপজেলায় আইনের প্রয়োগ না থাকায় কর্তৃপক্ষের নজরদারীর অভাবে কিছু অসাধু লোক অভিজ্ঞ জ্ঞান ও শিক্ষা ছাড়াই নিজেকে বড় ডাক্তার দাবী করে চিকিৎসার নামে অপচিকিৎসা দিয়ে আসছে। এসব অপচিকিৎসার প্রেক্ষিতে বহু মানুষ তার মহা মূল্যবান দাঁত সময়ের আগেই অকালে হারাচ্ছে ফলে ভূক্তভোগীদের হাজারো অভিযোগ উঠেছে এসব নামধারী ডাক্তারের বিরুদ্ধে।
এসব বিষয়ে গলগন্ডা গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা হাবিবুর রহমান বীর বিক্রমের ছেলে আতিকুর রহমান জানায়, আমার ১টি দাতের সমস্যা দেখা দেয়ায় ঘাটাইল আলমক্কা ডেন্টাল কেয়ারে ওয়াশ করতে গিয়েছিলাম। ডাক্তার বিধি অনুযায়ী দাত ওয়াস না করে দাতকাটা মেশিন দিয়ে ওয়াশ করে দেয়ায় বর্তমানে মুখের সকল দাতেই সমস্যা আরও প্রকট আকারে দেখা দিয়ছে। পরে এ বিষয়ে অভিযোগ করতে গিয়ে জানতে পারী তিনি কোন ডাক্তার না ।
খরাবর গ্রামের হোটেল শ্রমিক ও রেস্তোরার সভাপতি মুক্তার হোসেন জানায় আমার দাঁতের সমস্যা দেখা দেয়ায় আলমক্কা ডেন্টালে গেলে সোহেল রানা ৩২টা দাত রুট ক্যানেল করে দেয়। এভাবে গত ৭ বছরে পর পর ৩ বার রুট ক্যানেল করে দিলেও এখনো ২টা দাতের সমস্যা রয়েই গেছে।
এ বিষয়ে উপজেলার পৌর এলাকাধীন ডেন্টাল মেডিক এর ডাক্তার আব্দুল্লাহ আল্ মামুন জানায় ঘাটাইল উপজেলার ডেন্টাল রোগীরা অদক্ষ ডাক্তারদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। তাদের কোন অভিজ্ঞ জ্ঞান ও শিক্ষা ছাড়াই তারা শুধু ডেন্টাল ম্যাটেরিয়াল ও ঔষধ হাইপাওয়ার এন্টিবায়োটিক এর জোরে তারা রোগীদের চিকিৎসার নামে অপচিকিৎসা করে যাচ্ছে। যা রোগীরা সাময়িক ব্যাথা অনুভব হলেও নিজেদের অজান্তে পরবর্তীতে মুখ ও দাতের জটিল রোগের সম্মুখিন হচ্ছে।
মুখে ক্যান্সার হওয়ার বিষয়ে মা ডেন্টাল এর ডাক্তার রুহুল আমিন (বাবুর) নিকট জানতে চাইলে তিনি জানান, কিছু অদক্ষ লোকের অপচিকিৎসার ফলে এন্টিবায়োটিক রেজিটেন্স গ্রো-করা থেকে শুরু করে ষ্টেরিলাইজেশন না থাকায় যন্ত্রাপতি জীবানুমক্ত না করে ঐ যন্ত্রাপতি বিভিন্ন রোগীর মুখে ব্যবহারের ফলে রোগীরা হেপাটাইটিস সহ এইডস এর মতো জটি রোগের হুমকিতে রয়েছে। ফলে মুখে ক্যান্সার সহ জটিল রোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।
দন্ত চিকিৎসকের বিষয়ে জানতে চাইলে ঘাটাইল উপজেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পঃ পঃ কর্মকর্তা সাইফুর রহমান খান বলেন আমাদের হাসপাতালে কোন দন্ত চিকিৎসক (ডেন্টাল সার্জন) নেই। টেকনিশিয়ান দ্বারা ডেন্টাল ইউনিট পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে বে-সরকারীভাবে কয়জন ডাক্তার আছে বা চিকিৎসা চলছে তা আমার জানা নাই।
বার্তাবাজার/এসআর