ত্রিকোণমিতির সম্পর্ক

ভোরের পাখির কিচির-মিচির শব্দে ঘুম ভাঙ্গলো মায়াবীনির। সেই ছোট্ট মায়াবীনি আজ ১৮ তে পা দিলো। ঘুম ভেঙ্গে যখন মনে পড়লো আজ তো তার জন্মদিন!! অথচ বাবা তার কপালে চুমু দিয়ে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানালো না। এমনটা তো কখনো হয়নি!! মনটা নিমিষেই খারাপ হয়ে গেলো তার। মায়াবীনি এর মা গত হয়েছে ২ বছর হলো কিন্তু তার বাবা কখনো এমন ভুল কখনো করেনি। বাবা আর মা মিলে নাকি মায়াবীনি নামটা রেখেছিলো। কিন্তু এই নামের জন্য সহপাঠীরা ব্যঙ্গ করে মিয়ার বিবি ডাকতো মায়াবীনি কে।

মায়াবীনি এর খুব রাগ হতো এটা শুনে আর মায়ের কাছে নালিশ দিতো কেন এই নাম রেখেছে। মা তখন মুচকি হেসে বলতো সময় হোক জানতে পারবি। কিন্তু মা তো চলে গেলো আর জানা হলো না। এসব ভাবতে ভাবতে কখন যে সূর্যি মামা উদয় হল টেরই পেলো না। ভাবনার যখন ছেদ হলো তখনই মনে পড়লো বাবার আবার অসুখ হয়নি তো?? নাকি মা এর কবর জিয়ারত করতে গেছে, এখনো আসেনি। বাবা কে ডাকতে যখন তার রুম এ গেলো তখন দেখতে পেলো টেবিলে তার প্রিয় কদম ফুল এ ভর্তি।মুহুর্তে তার মন খুশিতে ভরে গেলো!! ফুল গুলো যখন হাতে নিলো ঠিক তার নিচেই একটা চিঠি পেলো মায়াবীনি। অবাক হয়ে চিঠি টার দিকে তাকিয়ে ছিলো মায়াবীনি,কারন তাতে বড় অক্ষরে খামে লেখা ছিলো “মা এর পক্ষ থেকে”। কাপাঁ হাতে যখন খাম খুলল তার মায়ের হাতের লেখা চিঠি ছিলো।

আমার আদুরে মায়াবীনি,

শুভ জন্মদিন!! আজকে তোর ১৮ বয়স পূর্ণ হলো। তুই এখন বুঝতে শিখেছিস। তোর কিছু কথা জানা দরকার মা। ইচ্ছে ছিলো তোকে নিজ মুখে সব কথা জানাবো কিন্তু ভাগ্যের নির্মমতার কাছে পরাজিত আমি। তোদের ছেড়ে চলে যেতে হবে যে আমাকে। জানিস মা তুই যখন তোর নামের কারণ জানতে চাইতি তখন তোকে বলিনি আজকের দিনটির জন্য। তোকে আজকের এই দিনে পেয়েছিলাম শত ভাগ্য করে,হয়তো আমাদের জীবনের পূর্ণতার জন্য। সেদিন আকাশ যেন কালো মেঘে অন্ধকার ছেয়ে ছিলো, প্রচন্ড বৃষ্টির মাঝে আমাদের ঘরের সামনে তোর কান্নার আওয়াজ পেয়ে দরজা খুলে তোকে পেয়েছিলাম। তোকে যখন আমরা দু’জন কোলে নিয়েছিলাম মনে হয়েছিলো কোন এক স্বর্গের মায়াবী ফুল।

তোকে পেয়ে আমরা সত্যি অনেক খুশি হয়েছি, কেননা তোকে পেয়ে আমার অপূর্ণ মাতৃত্বের পূর্ণতা পেয়েছিলো। তুই কোথা থেকে এলি এ বিষয়ে আমরা খোজ নেইনি। জানিস মা এর জন্য অনেক অপরাধবোধ কাজ করতো।অনেক ভয়ে থাকতাম তুই না আবার হারিয়ে যাস। আমাদের ক্ষমা করিস তোর কাছে এতদিন এই কথা লুকাবার জন্য। জানিস মা তোর বাবা সত্যি একজন মহৎ হৃদয়ের মানুষ। আমার মতো একজন পতিতার মেয়েকে বিয়ে করেছে। আমার মতো একজন ধর্ষিতা কে নিজের স্ত্রী রূপে গ্রহণ করেছে।

আমার মা পতিতা ছিলো কে আমার বাবা সেটা কখনো জানতে পারিনি। কিন্তু আমার মা নিষিদ্ধ পল্লী থেকে ভালো স্কুলে পড়াশুনা করাতো হোস্টেলে রেখে। কিন্তু যখন আমি কলেজে তখন আমার মা কোন এক দুর্ঘটনায় মারা যায়। দিশেহারা হয়ে পড়ি আমি কারণ আমাকে দেখার মতো কেউ ছিলোনা। সামনে পরীক্ষার খরচ,হোস্টেলে থাকার খরচ সব মিলিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়ি।

তখন এক বান্ধবীর বদৌলতে একটা টিউশনি পেলাম। যেখান টিউশনি করতাম সে বাসার মালিক আমার দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে কুপ্রস্তাব দিতো। আমাকে টাকার লোভ দেখাতো, আমার সব খরচ বহন করার আশ্বাস দিতো। আমি রাজি না থাকাতে আমাকে হুমকি দিতো। কারণ সে গুন্ডা বাহিনী পুষতো। তারপরও টিউশনি ছাড়িনি কারণ আমি যে অভাগী।এক সন্ধ্যায় টিউশনি শেষে এক দল ছেলে আমাকে জোর করে মুখ বেধে নিয়ে গিয়ে সারা রাত ধর্ষণ করে।

আমাকে এতটা নির্যাতন করে যে, আমার প্রতিটি মিনিটে মনে হচ্ছিলো আমি মারা যাচ্ছি। আমার চিৎকার ঘুমড়েই নিঃশ্বেষ হয়ে গেলো। নির্যাতনের পর আমাকে নগ্ন অবস্থায় রাস্তায় ফেলে যায় নরপশুর দলগুলো। তোর বাবা ফজরের নামাজ আদায় করতে যাওয়ার সময় আমাকে রাস্তার পাশে পড়ে থাকতে দেখে বস্ত্র আবৃত করে হাসপাতালে নিয়ে যায়।

নরপশুরা আমাকে এতটাই রক্তাক্ত করে যে আমার জরায়ু কেটে ফেলতে হয়েছে। আমি কলংকিত হয়ে যখন দিশেহারা, কি করবো, কাকে মুখ দেখাবো। এর চেয়ে যে আমার মৃত্যু ভালো ছিলো। তখন তোর বাবা আমাকে আশ্বাস দেয় বাচাঁর। আমাকে মানসিক ভাবে সুস্থ করে, আমকে তার মায়ার বাধঁনে বেঁধে ফেলে। জানিস মা, তোর বাবা ও এতিম। এতিম খানায় বড় হয়েছে।

মাঝে মাঝে তাকে জিঙ্গাসা করতাম আপনার অপূর্ণ জীবনে আমার মতো মেয়েকে কে কেন জীবন সঙ্গি করলেন?? সে হেসে বলতো আমার অপূর্ণ জীবনটা তো তুমি পূর্ণ করলে। নিজেকে তখন খুব ভাগ্যবতী মনে হতো। আমি বলতাম আপনাকে তো কখনো বাবা ডাক শুনাতে পারবোনা আমি। সে বলতো ধৈর্য ধরো স্বর্গের পরী তোমার কোলে আসবে।

তার সেই মিথ্যে আশ্বাস সত্যি হলো তোকে পেয়ে। তোদের ২ জন আমাকে নতুন করে জীবনের মানে শিখালো। পূর্ণতায় ভরপুর হলো আমার জীবন। একটা সুখী পরিবার হলো, অতীতের সব কিছু মুছে গিয়েছিলো জীবন থেকে। কিন্তু সেই অতীত তোদের কাছ থেকে আমাকে ছিনিয়ে নিলো। মরণব্যাধি এইডস তিলে তিলে শেষ করে দিলো আমায়। জানিস মা, খুব কষ্ট হচ্ছে কথাগুলো লিখতে। কিন্তু সত্যিটা তোর জানা জরুরী। কারণ বাস্তবতা অনেক কঠিন মা। তোকে সব বাধা পেরিয়ে যেতে হবে নতুন আলোর আশায়। তোর বাবা কে দেখে রাখিস মা। কেননা তাকে যে আমি কিছুই দিতে পারিনি।

মায়াবীনির মা

চোখের অশ্রু যেন চিঠিটা ভিজিয়ে দিলো। মায়াবীনি চিঠি হাতে দৌড়ে চলে গেল মায়ের কবরের কাছে। গিয়ে দেখলো তার বাবাও অঝরে কাঁদছে কবরের দিকে চেয়ে। বাবার বুকে জড়িয়ে শুধু একটাই কথা বললো, তোমরাই আমার সত্যিকারের বাবা-মা। অনেক ভালোবাসি তোমাদের।

– নীল সত্ত্বা

বার্তাবাজার/এএস

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর