অবশেষে ২৬ দিন পূর্বে গণস্বাস্থ্য সমাজভিত্তিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গর্ভধারিণী মায়ের ফেলে যাওয়া প্রতিবন্ধী মেয়ে সন্তানের দায়িত্ব নিয়েছেন ‘চাইল্ড এন্ড ওল্ড এইজ কেয়ার’ এর প্রতিষ্ঠাতা মিল্টন সমাদ্দর এবং মিঠু হালদার দম্পতি। শনিবার (২০ জুলাই) আশুলিয়ার বাইশমাইলে অবস্থিত গণস্বাস্থ্য সমাজভিত্তিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রতিবন্ধী শিশু জিম কে হস্তান্তর করেন মিল্টন সমাদ্দরের নিকট।
সরেজমিন হস্তান্তর অনুষ্ঠানে গিয়ে জানা যায়, গত ২৫ জুন সাত মাসের শিশু সন্তান জিমকে নিয়ে হাসপাতালে আসেন তার মা এবং চারদিন ধরে জ্বর-কাশিতে ভুগছে বলে শিশুটিকে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। ভর্তি করানোর কিছুক্ষণ পর হাসপাতালের পাশের বেডে ভর্তি আরেক শিশুর মাকে ওই নারী বলেন, ‘ভাবি, আমার মেয়ে জিমকে একটু দেখে রাখেন। আমি মোবাইলে টাকা ভরে আসতেছি।’ এ কথা বলেই বেরিয়ে যান শিশু জিমের মা। এরপর পেরিয়ে যায় দীর্ঘ ২৬ দিন। এতদিনেও দেখা মেলেনি জিমের মায়ের।
এদিকে, ভর্তির পর থেকে চিকিৎসার খরচ মেটালেও অবুঝ শিশুটির দেখভাল নিয়ে বিপাকে পড়ে সাভারের গণস্বাস্থ্য সমাজভিত্তিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। শেষে শিশুটির মা ফিরে না আসায় পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন চিকিৎসকরা। কিন্তু এখানেও বিপত্তি দেখা দেয়। যে ঠিকানা ব্যবহার করে শিশু জিমকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল সেই ঠিকানার আসলে বাস্তবে কোনও অস্তিত্বই নেই। এমনকি ভুল ঠিকানার সঙ্গে দেয়া মোবাইল নম্বরটিও সঠিক নয়।
অপরদিকে, গত ২৬ দিন ধরে গণস্বাস্থ্য সমাজভিত্তিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নার্স, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের তত্ত্বাবধানে ছিলো শিশু জিম। শিশুটিকে যখন হাসপাতালে ভর্তি করা হয় তখন নিউমোনিয়া ও সেরেব্রাল পালসি রোগে আক্রান্ত ছিল। তবে চিকিৎসার মাধ্যমে নিউমোনিয়া থেকে মুক্তি মিললেও সেরেব্রাল পালসির জন্য আজীবন ফিজিওথেরাপির দরকার হবে জিমের জানালেন এখানের চিকিৎসকগণ।
হাসপাতালের রেজিস্ট্রার ডা. মাহবুব জোবায়ের বলেন, নিউমোনিয়া ও সেরেব্রাল পালসিতে আক্রান্ত হওয়ায় শিশুটিকে হাসপাতালে ভর্তি হয়। চিকিৎসার মাধ্যমে নিউমোনিয়া থেকে মুক্তি মিললেও সেরেব্রাল পালসির জন্য শিশুটিকে আজীবন ফিজিওথেরাপি দিতে হবে।

তিনি বলেন, সেরেব্রাল পালসির কারণে বাচ্চাটির বিভিন্ন অঙ্গে জড়তা রয়েছে, হাত-পায়ের সন্ধিস্থলগুলো শক্ত। এর কারণে সে ঠিকমতো নড়াচড়া করতে পারে না। ঘাড় থেকে সমস্যা উৎপত্তি হওয়ায় হয়তো ভবিষ্যতে সেটিও নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। ঘাড় সবসময় নিচের দিকে হেলে থাকবে তার।
তিনি আরও বলেন, এভাবে বেশি দিন হাসপাতালে থাকলে বিভিন্ন রোগ-জীবাণুতে আক্রান্ত হয়ে জিম আরও বেশি অসুস্থ হয়ে যাবে। পরে হয়তো তাকে বাঁচানো যাবে না। তাই অতি দ্রুত তাকে সরিয়ে নেয়া জরুরি। জিমের জন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত চিকিৎসা ব্যবস্থা ও বিশেষ যত্ন। যা সাধারণ কোনো হাসপাতালের পক্ষে দেয়া সম্ভব না।
এদিকে, বিগত দিনগুলিতে শিশু জিমকে নিয়ে হিমশিম কগেয়েছে সাভারের গণস্বাস্থ্য মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের শিশু বিভাগ। বাচ্চাটির দেখাশোনা করা, কাপড় বদলানো, সময় মতো খাবার খাওয়ানোর জন্য হাসপাতালের এক বা একাধিক কর্মচারীকে সার্বক্ষণিক ব্যস্ত থাকতে হতো।
এব্যাপারে হাসপাতালের মেডিকেল কর্মকর্তা ডাঃ মাহে মনির জানান, শিশুটিকে আমরা নিজেদের মতো করে যে যেভাবে পেরেছি সাহায্য করেছি। মা না থাকায় আমরাই যতটুকু পেরেছি, দেখেশুনে রেখেছি।
এমন অবস্থায় ঢাকার চাইল্ড এন্ড ওল্ড এইজ কেয়ার প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা মিল্টন সমাদ্দর প্রতিবন্ধী শিশুটির ব্যাপারে জানতে পেরে মানবিক কারণে শিশুর দায়িত্ব নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। সব দিক বিবেচনা করে অবশেষে কর্তৃপক্ষ মিল্টন সমাদ্দর এর নিকট শিশুটিকে হস্তান্তর করেন।
এব্যাপারে গণস্বাস্থ্য সমাজভিত্তিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডাঃ মিজানুর রহমান বলেন, বেশ কিছু পরিবার যারা আগে শিশুটিকে নেয়ার জন্য আবেদন করেছিলেন, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল। কিন্তু প্রতিবন্ধী হওয়ায় জিমকে দত্তক নিতে চায়নি কোনো দম্পতি। এজন্য ‘চাইল্ড এন্ড ওল্ড এইজ কেয়ার’ এর প্রতিষ্ঠাতা মিল্টন সমাদ্দর এবং মিঠু হালদার দম্পতির নিকট আমরা প্রতিবন্ধী শিশু জিমকে তুলে দেয়াটা যৌক্তিক ভেবে সেটাই করেছি।
বার্তাবাজার/এসআর