আজ শুক্রবার রাত ২:১৪, ২৪শে নভেম্বর, ২০১৭ ইং, ১০ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, ৪ঠা রবিউল-আউয়াল, ১৪৩৯ হিজরী

নূরের চোখের সামনেই গুলিতে খুন হয় তার বাবা

নিউজ ডেস্ক | বার্তা বাজার .কম
আপডেট : সেপ্টেম্বর ১৬, ২০১৭ , ১২:০৪ অপরাহ্ণ
ক্যাটাগরি : আন্তর্জাতিক
পোস্টটি শেয়ার করুন

মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বুলেটে চোখের সামনে খুন হয় তার বাবা। তার মাসহ পরিবারের অন্যদের ঘরে ঢুকিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। জীবন বাঁচাতে দুই বছরের ভাই আনসকে নিয়ে অজানার উদ্দেশে বেরিয়ে পড়ে নূর করিম। কাঁধে তুলে নেয় ছোট ভাই আনসকে। পাড়ি দেয় বন-জঙ্গল, পাহাড় ও ছোট-বড় পাঁচটি নদী।

মর্মান্তিক এ ঘটনার কথা জানা যায় সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করা রাখাইনের এক শিশুর কাছ থেকে। আট বছরের নূর করিম তার ছোট্ট এ জীবনে ঘটে যাওয়া মর্মন্তুদ ঘটনা জানায় রাইজিংবিডির এ প্রতিবেদককে। জানায় মিয়ানমারে তার পরিবারের সদস্যদের নির্মম হত্যা ও ছোট ভাইকে নিয়ে তার পালিয়ে আসার ঘটনা।

মিয়ানমারের সেনাবাহিনী গত শনিবার তাদের পুরো গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়। ছোট্ট নূরের সামনেই ঘরের আঙ্গিনায় প্রথমে গুলি ও পরে গলা কেটে হত্যা করা হয় তার বাবা ইব্রাহিমকে। আগুনে পুড়িয়ে মারা হয় তার মা করিমনকে।

এরপর জীবন বাঁচাতে ছোট ভাই আনসকে কাঁধে নিয়ে সাতদিন বন-জঙ্গল ও নৌকায় নদী পার হয়ে অন্য গ্রামবাসীর সঙ্গে শুক্রবার দুপুরে টেকনাফের হোয়াইক্যং ইউনিয়নের লম্বারবিল সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে সে। কাঁদায় মাখামাখি শরীর বলে দেয় কতটা কঠিন ও দুর্বিষহ অবস্থা সয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে সে।

নূর করিম জানায়, গত শনিবার সকালে তাদের গ্রামে সেনারা ঢুকে প্রথমে তার বাবাকে গুলি করে এবং গলা কেটে হত্যা করে। এরপর মাসহ আরো সাত নারীকে একটি ঘরের ভেতরে নির্যাতন করে আগুনে পুড়িয়ে দেয়। এ সময় সে তার দুই বছর বয়সী ভাই আনসকে নিয়ে পালিয়ে যায় সে।

নূর করিমেআরো জানায়, ‘জীবন বাঁচাতে গ্রামবাসীর সঙ্গে ছোট ভাইকে কাঁধে নিয়ে সাতদিন হেঁটে বাংলাদেশ সীমান্তে প্রবেশ করে সে। এই সময় বিশাল বন-জঙ্গল, পাহাড় ও ছোট-বড় পাঁচটি নদী পাড়ি দিতে হয়েছে। সাতদিন শুধু কলা গাছ ও পানি ছাড়া আর কিছুই খেতে পারেনি। এক প্যাকেট বিস্কুট ছিল তা ছোট ভাইকে খাইয়েছে। বাঁচার জন্য ছোট ভাইকে কাঁধে নিয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে।

দুবছরের ছোট্ট আনস কোনো কিছু বলতে পারে না। তার চোখে-মুখে শুধু ক্ষুধার জ্বালা। মিয়ানমার বাহিনীর হত্যাযজ্ঞের শিকার মা-বাবা যে আর ফিরবেন না সে কথা বোঝার বয়স এখনো তার হয়নি। শুধু নূর-আনস নয়, তাদের মতো আরো অনেক শিশু ও তাদের পরিবারের সদস্যরা রাখাইনে ভয়ানক পরিস্থিতির শিকার। তাদের জীবনে নেমে এসেছে অমবস্যার অন্ধকার। নির্মমভাবে নিহত হচ্ছে কেউ, কেউবা পালিয়ে আসছে আহত হয়ে। সব সহায় সম্পদ রেখে জীবন বাঁচাতে কোনো রকমে জানটা নিয়ে অনেক কষ্ট করে সীমান্ত অতিক্রম করে প্রবেশ করছে বাংলাদেশে। আশ্রয় নিচ্ছে কক্সবাজারের বিভিন্ন স্থানে।

শুক্রবার টেকনাফ হোয়াইক্যং সীমান্তের লম্বারবিল দিয়ে অনুপ্রবেশ করা রোহিঙ্গাদের মধ্যে বেশিরভাই ছিল শিশু। তাদের অনেকে হারিয়েছে মা; আবার অনেকে হারিয়েছে মা-বাবা দুজনকেই।

মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর দমন অভিযানে রোহিঙ্গা গ্রামগুলো কীভাবে জনশূন্য হয়ে পড়ছে, সেই বিবরণ এসেছে পালিয়ে আসা মানুষের কথায়। উখিয়ায় পাহাড়ের ঢালে গড়ে ওঠা নতুন শরণার্থী ক্যাম্পের রোহিঙ্গাদের কথায় উঠে এসেছে নিজের দেশে মৃত্যুর মুখ থেকে পালিয়ে আসার বর্ণনা।

গত সপ্তাহে কক্সবাজারে ঢোকার পর টেকনাফের হোয়াইখ্যং ইউনিয়নের লম্বাবিল এলাকায় একটি স্কুলে আশ্রয় নিয়েছেন মংডুর তুলাতলী থেকে আসা মো. ফারুক। তিনি জানিয়েছেন, তাদের এলাকার হাজার দেড়েক মানুষকে এক জায়গায় জড়ো করে নির্বিচারে গুলি চালায় সেনাবাহিনী।

ফারুকের হিসাবে, সেখানেই অন্তত আটশ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। যারা গুলিবিদ্ধ হয়েও বেঁচে ছিলেন, কিন্তু তাদেরকে পরে আগুনে পোড়ানো হয়। জীবন্ত মানুষসহ অনেক ঘরে আগুন দেয়া হয়। এর মধ্যে দুই একজন পুড়তে পুড়তে পালিয়ে বাংলাদেশ আসতেও পেরেছে বলেছে জানান তিনি।

কাউয়ার বিল থেকে এসে উখিয়ায় বালুখালি শরণার্থী ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছেন মো. ইউনূস। মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর হাতে নিজের চাচাকে খুন হতে দেখেছন তিনি। ইউনূস জানান, সেনাবাহিনী এসে তার চাচাকে ঘর থেকে বের করে গাড়ির সঙ্গে বাঁধে। গাড়ি চালিয়ে আধা কিলোমিটারের মত টেনে নিয়ে যাওয়ার পর তাকে গুলি করা হয়।

সত্তরোর্ধ্ব মোহাম্মদ সিদ্দিকের চার ছেলে এক মেয়ে। ডমরুর থামি থেকে বাংলাদেশে আসার পথে প্রায় ১৫দিন পাহাড়ে জঙ্গলে ঘুরতে হয়েছে তাকে। উপার্যনক্ষম বড় দুই ছেলের মৃত্যু তিনি দেখেছেন নিজের চোখে। সেনাবাহিনী ঘর পুড়িয়ে দিয়েছে, কিন্তু বাপ-দাদার ভিটায় শয্যা হবে না- এ তিনি ভাবতেও পারছিলেন না।

সিদ্দিক জানান, মেয়ে জামাইয়ের মৃত্যু হয়েছে জানতে পারলেও এতটা পিছুটান থাকতে না। মেয়ে তার স্বামীকে ছাড়া আসতে চাইছিল না। তাই আসার পথে কোনো একটি নিরাপদ রোহিঙ্গা গ্রাম খুঁজেছিলেন, যেখানে থেকে যাওয়া যায়। কিন্তু ১৫ দিন ঘোরাঘুরি করেও কোনো রোহিঙ্গা গ্রামকে নিরাপদ থাকতে দেখেননি এই বৃদ্ধ। শেষমেষ জনস্রোতে মিশে ঢুকে পড়েন বাংলাদেশে।

সিদ্দিকের বড় ছেলে আব্দুল বারীর বয়স ছিল ৩৫ বছর। পাঁচ ও দুই বছরের দুটি মেয়ে আছে তার। মেজ ছেলে জোবায়েরের বয়স ছিল ২৫। তারও একটি ছেলে রয়েছে। দুই ছেলের মৃত্যু শোকের সঙ্গে এখন নাতি-নাতনিদের ভবিষ্যত নিয়ে শঙ্কিত সিদ্দিক। জীবনের সব সম্পদ আর সঞ্চয় এক দিনে হারিয়ে এই বয়সে তাকে অন্য দেশে মাথা গোঁজার ঠাঁই আর খাবারের সন্ধানে ছোটাছুটি করতে হচ্ছে।

রিম্যাতংয়ের বদরুল ইসলাম জানান, গ্রামের অনেকের তার বাবাকেও গুলি করে হত্যা করেছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। তিনি জানান, যে যেভাবে পেরেছে পালিয়েছে। কেউ বোন ফেলে এসেছে, কেউ বাবাকে ফেলে এসেছে।
নাপড়ার বিম্মাতা এলাকার আনু মিয়া জানান, তার ঘরে আগুন দিয়েছে তারই এক প্রতিবেশী। তিনি বলেন, মিয়ানমার সরকার রাখাইনের মগদের (বৌদ্ধ) উসকে দিচ্ছে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে। রোহিঙ্গাদের বাড়ি-ঘর দখল এবং আগুন দেওয়ার আগে লুটপাটের সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে। গ্রামে হামলা শুরুর সময়ই বাড়ির পাশের জঙ্গলে পরিবার নিয়ে আশ্রয় নিতে পারায় প্রাণ বাঁচাতে পেরেছেন বলে জানান আনু।

তিনি বলেন, গত দুই সপ্তাহে কত লোককে হত্যা করা হয়েছে তার সঠিক সংখ্যা নিরূপণ করা কঠিন। কোনো কোনো পরিবারের সবাই মারা গেছে। কেউ কেউ বেঁচে থাকলেও কোথায় আছে, সেটা পরিবারের অন্যরা হয়ত জানে না। প্রাণ বাঁচতে সবাই কোনোরকমে পালিয়ে এসেছেন। পথে আসতে আসতে বহু রোহিঙ্গা গ্রাম জনশূন্য ও ধ্বংসস্তূপ দেখেছেন তারা।

গত ২৪ আগস্ট রাতে রাখাইনে ৩০টি পুলিশ পোস্ট ও একটি সেনা ঘাঁটিতে আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি হামলা করেছে এ অভিযোগ করে সেখানে অভিযান শুরু করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী।

অভিযানের নামে হত্যা, ধর্ষণ, বাড়িঘরে আগুন দেওয়াসহ নানা নির্যাতন অব্যাহত রেখেছে সেনাবাহিনী। প্রাণ বাঁচাতে সীমান্ত অতিক্রম করে করে দলে দলে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে থাকে রোহিঙ্গারা। প্রতিদিনই মিয়ানমার থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নিচ্ছে হাজার হাজার রোহিঙ্গা। পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা বলছেন, মিয়ানমারের নিরাপত্তাবাহিনী রোহিঙ্গাদের নির্বিচারে গুলি চালিয়ে হত্যা করছে।

জাতিসংঘের তথ্যমতে, গত ২২ দিনে ৪ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে। তবে স্থানীয় সূত্র মতে এই সংখ্যা ৫ লাখের উপরে।