২০, নভেম্বর, ২০১৮, মঙ্গলবার | | ১১ রবিউল আউয়াল ১৪৪০

শিশুদের ওপর কোরবানি কতোটা প্রভাব ফেলে?

আপডেট: আগস্ট ২০, ২০১৮

শিশুদের ওপর কোরবানি কতোটা প্রভাব ফেলে?

খাদেমুল ইসলাম সাহেবের একমাত্র ছেলে মুত্তাকিম, বয়স মাত্র ১১ বছর। বেশ হাসিখুশি ছেলে, নিজের মনে লেখাপড়া, ছবি আঁকা, খেলাধুলার মতো কাজগুলো সে বেশ মনোযোগ দিয়েই করে। কিন্তু এই কোরবানির ঈদ এলেই মুত্তাকিমের জন্য বড় সমস্যা শুরু হয়। কোরবানির পশু জবাই আর রক্তপাত সে দেখে সহ্য করতে পারে না। তার মন বিক্ষিপ্ত হয়, এলোমেলো ব্যবহার শুরু করে, দেখে মনে হতে থাকে কোনো বিষয়ে ভয়ে কুঁকড়ে আছে সে। তার কাছে এই ব্যাপারটি অনেকটাই বীভৎসতার মতো। সেটা বুঝতে পেরে মুত্তাকিমের পরিবারের সদস্যরা তাঁকে ঈদের সময়ে দেশের বাইরেও পাঠিয়ে দিয়েছে কয়েকবার। আশেপাশে এত পশু জবাই আর রক্তের বন্যার বিভীষিকা থেকে তাঁকে দূরে রাখার জন্য।

এটা শুধু মুত্তাকিমের ক্ষেত্রেই ঘটেনি। দেশে অনেক শিশুর কাছে কোরবানি এক ভীতিকর অভিজ্ঞতার নাম। কিন্তু ধর্মের একটি অনুসঙ্গ হিসেবে আমাদের কেনা প্রাণীগুলোকে আমরা কোরবানি করি। এমনকি যে ছোট শিশুদের আমরা হানাহানি, রক্তপাত, বীভৎসতা থেকে দূরে রাখি যাদের কোমল মনে সেগুলোর কোনো প্রভাব না পড়ে। অথচ তাদের সামনেই কোরবানি দেওয়া হচ্ছে। এটা তাদের মনে কেমন প্রভাব পড়ে তা আমরা অনেকেই কখনো ভেবে দেখিনি।

ঈদুল আযহায় কোরবানি ওয়াজিব, অবশ্যই পালনীয়। ইসলাম ধর্মে কোরবানির নির্দিষ্ট কিছু পদ্ধতিও আছে। মধ্যপ্রাচ্যেসহ বিশ্বজুড়ে ইসলামী পদ্ধতিতে পশু জবাই করা হলেও বাংলাদেশের মতো যত্রতত্র পশু জবাই নিষিদ্ধ। সাধারণত কোরবানির আগে কোন কসাইখানাতে টাকা দেওয়া হলে (একভাগ, দুইভাগ বা সাতভাগ এই অনুপাতে) তারাই পশু জবাই করে বাড়িতে মাংস পৌঁছে দেয়। সেখানে আর বাইরের কেউ পশু কাটাকাটির মতো দৃশ্য দেখতে পায় না, পরিবেশও থাকে পরিচ্ছন্ন। ইসলামী শরীয়তও বজায় থাকে।

শিশুদের মনস্তাত্ত্বিক জগৎটা ভিন্ন। তারা কোমল হয়, তাদের চোখে সবই পবিত্র, খোলা চোখে তারা পৃথিবীটাকে দেখে। কিন্তু সেখানে অরাজকতা বা সহিংসতা তাদের মধ্যে ক্ষিপ্ত আর সহিংস মনোভাব তৈরি করে দেয়। তারা ভয় পায়, বড়দের সম্পর্কে তাদের মনোভাব নেতিবাচক হয়। পরিবার আর সমাজব্যবস্থাকে সে সহিংসই মনে করে।

আরেকটি বিষয় উল্লেখ করার মতো। সাধারণত কোরবানির পশু ঈদের কয়েকদিন আগে কেনা হয়। বাড়ির শিশুদের সেই পশুর সঙ্গে মিশতে দেওয়া হয়, পশুকে তারা নিজ হাতে খাওয়ায়, আদর করে, নিজের মতো করে সাজায়। কিন্তু ঈদের দিন তাদের চোখের সামনে সেই পশুটিকে জবাই করা হয়। শিশুদের মনে অবশ্যই এর প্রভাব পড়ে। একটি শিশুমন যার সঙ্গে আনন্দময় সম্পর্ক তৈরি করেছিল, তার এমন পরিণতি তার জন্য মেনে নেওয়া কঠিন। মনের ওপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া হতে বাধ্য।

আমাদের শহর-গ্রামগুলোতে রাস্তায় ফেলে প্রকাশ্যে যে কোরবানি হয়, তা দেখে দেখে আমরা অভ্যস্ত। বিশেষ করে শহরাঞ্চলের ক্ষেত্রে বলা হয়ে থাকে যে, সেখানে জায়গা কম থাকে বলে বাধ্য হয়ে অনেকে রাস্তায় কোরবানির কাজটা সেরে নেয়। কিন্তু অন্যান্য আধুনিক দেশগুলো যেভাবে কোরবানির আনুষ্ঠানিকতা পালন হয়, এদেশ বা এই উপমহাদেশে আলাদা কসাইখানা নির্মাণে আসলে বাধাটা কোথায়? সেই বীভৎস হত্যার দৃশ্য আমরা, আমাদের শিশুরা না হয় না ই দেখলাম। ভালোবাসা, মমতার পশুকে শিশুদের কাছ থেকে আলাদা করেই আল্লাহর উদ্দেশ্যে কোরবানি করা হোক।