২১, নভেম্বর, ২০১৮, বুধবার | | ১২ রবিউল আউয়াল ১৪৪০

রায়ের প্রতীক্ষা শেষ হচ্ছে

আপডেট: আগস্ট ২০, ২০১৮

রায়ের প্রতীক্ষা শেষ হচ্ছে

আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে চালানো গ্রেনেড হামলার ১৪ বছর পূর্ণ হচ্ছে মঙ্গলবার। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট রাজধানীর বঙ্গবন্ধু

এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের শান্তি সমাবেশে জঙ্গিরা ওই বর্বরোচিত হামলা চালায়। দীর্ঘ প্রতিকূলতা ও নাটকীয়তার পর এ ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার বিচার প্রক্রিয়া এখন শেষ পর্যায়ে। শেষ হচ্ছে প্রতীক্ষা। চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে আলোচিত এ মামলার রায় ঘোষণা হতে পারে। আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এ প্রসঙ্গে সমকালকে জানান, সেপ্টেম্বরের মধ্যে বিচারিক আদালতের রায় দেওয়া সম্ভব হবে। বিচার কার্যক্রম প্রায় শেষ পর্যায়ে। সাধারণ প্রক্রিয়ায় মামলার কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, আসামিরা অত্যন্ত ন্যক্কারজনক কাজ করেছেন। তারা বিচার প্রক্রিয়ায় কালক্ষেপণের চেষ্টাও করছেন। তাদের অপচেষ্টা অতিক্রম করে কার্যক্রম এগিয়ে যাচ্ছে। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায় ঘোষণার মধ্য দিয়ে দেশ-জাতি আরও একটি দায় থেকে মুক্তি পাবে বলেও মন্তব্য করেন আইনমন্ত্রী।

সংশ্নিষ্টরা জানান, তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় ২০০৪ সালে আওয়ামী লীগের সমাবেশে নারকীয় গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। হামলার মূল টার্গেট ছিলেন তৎকালীন প্রধান বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনা। ভাগ্যক্রমে সেদিন তিনি বেঁচে গেলেও বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ ভেসেছে রক্তের স্রোতে। প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্ত্রী ও মহিলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভানেত্রী আইভি রহমানসহ ২৪ জন নিহত হন। আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের পাশাপাশি গ্রেনেড হামলায় আহত হন সাংবাদিক-পথচারীসহ অনেকে। তাদের মধ্যে অনেকে বোমার বিষাক্ত স্পিল্গন্টার শরীরে নিয়ে যন্ত্রণাময় জীবন পার করছেন। শুরু থেকেই এ হামলার ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার ষড়যন্ত্র হয়েছে রাষ্ট্রের তৎকালীন নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের প্রত্যক্ষ মদদে। তদন্ত প্রক্রিয়া ব্যাহত করতে সাজানো হয় আলোচিত ‘জজ মিয়া’ নাটক। পরে অধিকতর তদন্তে ষড়যন্ত্রের নানা পাঠ উন্মোচিত হয়েছে। বেরিয়ে এসেছে রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে জঙ্গি হামলার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টার নীলনকশা।

আদালত সূত্র জানায়, গ্রেনেড হামলা মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের ৫২১ সাক্ষীর মধ্যে ২২৫ জন তাদের বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন। রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, সাক্ষীদের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে জড়িতদের ব্যাপারে সব তথ্য বেরিয়ে এসেছে। মামলার অন্যতম আসামি সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বিএনপি নেতা লুৎফুজ্জামান বাবরের পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন সম্প্রতি শেষ হয়েছে। আগামী ২৭-২৯ আগস্ট পরবর্তী শুনানির জন্য দিন ধার্য রয়েছে। শুনানি শেষে উভয় পক্ষের সমাপনী বক্তব্য শেষে রায় ঘোষণার দিন নির্ধারণ করবেন বিচারক। পুরান ঢাকায় ১ নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিশেষ এজলাসে চলছে এ মামলার বিচারকাজ। সপ্তাহে তিন দিন শুনানি হচ্ছে।

রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলি জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সৈয়দ রেজাউর রহমান সমকালকে বলেন, তাদের প্রত্যাশা, সেপ্টেম্বর মাসেই রায় ঘোষণা করে গ্রেনেড হামলার ঘটনায় দায়ের করা দুই মামলার বিচার নিষ্পত্তি করা হোক। ২১ আগস্টের মধ্যে বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পরিকল্পনা থাকলেও আসামি পক্ষের কালক্ষেপণের কারণে তা সম্ভব হয়নি বলে অভিযোগ করেন এই আইনজীবী। মামলায় ন্যায়বিচার পাবেন বলে প্রত্যাশা করেন তিনি।

রাষ্ট্রপক্ষের আরেক কৌঁসুলি মোশারফ হোসেন কাজল সমকালকে বলেন, বিচারিক কার্যক্রম চূড়ান্ত পর্যায়ে। মামলাটি এখন নিষ্পত্তির অপেক্ষায়। আশা করছি আগামী মাসেই রায়ের দিন ধার্য হবে।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা জানান, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমান, খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী, বিএনপি সরকারের সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু ও প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর একাধিক বৈঠক করে ২১ আগস্ট হামলার ষড়যন্ত্র করেন। আবদুস সালাম পিন্টুর ধানমণ্ডির সরকারি বাসভবন এবং কুখ্যাত হাওয়া ভবনসহ ঢাকার অন্তত ১০টি জায়গায় পরিকল্পনাকারীরা একত্র হয়। হামলার চূড়ান্ত পরিকল্পনা হয় ২০০৪ সালের ২০ আগস্ট হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী বাংলাদেশের (হুজিবি) শীর্ষ নেতা মুফতি আবদুল হান্নানের মেরুল বাড্ডার ভাড়া বাসায়। জবানবন্দিতে হান্নান বলেছেন, শেখ হাসিনাকে হত্যার পরিকল্পনা হয় হাওয়া ভবনে। জঙ্গিদের এ হামলায় সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন তারেক রহমান। আরও একাধিক সাক্ষীও আদালতে এমন তথ্য দিয়েছেন।

মামলার অন্যতম আসামি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমান বর্তমানে লন্ডনে পলাতক। তার পক্ষে রাষ্ট্র নিযুক্ত আবুল কালাম মো. আক্তার হোসেন সমকালকে বলেন, গুরুত্বপূর্ণ আসামির পক্ষে জেরা শেষ হয়েছে। যুক্তিতর্ক শেষ হলেই মামলার বিচার শেষ হবে। আরেক পলাতক আসামি হানিফ পরিবহনের মালিক মো. হানিফের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী চৈতন্য চন্দ্র হালদার সমকালকে বলেন, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মামলা। দীর্ঘদিন উভয় পক্ষের শুনানি হয়েছে। রায়ে তার মক্কেল মো. হানিফ খালাস পাবেন বলেও আশা প্রকাশ করেন এই আইনজীবী।

তদন্ত ভিন্ন খাতে নেওয়ার অপচেষ্টা :২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার পর সেদিনই পুলিশ বাদী হয়ে মতিঝিল থানায় একটি মামলা করে। পরদিন আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে মামলা করতে গেলেও তা নেয়নি পুলিশ। এমনকি এ ঘটনার জন্য আওয়ামী লীগকে অভিযুক্ত করে বক্তৃতা-বিবৃতিও দেন বিএনপি নেতারা। পুলিশের দায়ের করা মামলা ভিন্ন খাতে নিতে তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের নীতিনির্ধারকরা একটি প্রভাবশালী গোয়েন্দা সংস্থাকেও ব্যবহার করে। প্রথমে পার্থ সাহা নামে নিরীহ যুবককে আটক নির্মম নির্যাতন চালিয়ে মিথ্যা জবানবন্দি আদায়ের চেষ্টা করা হয়। পরে নোয়াখালীর সেনবাগের বাড়ি থেকে তুলে আনা হয় জজ মিয়া নামে আরেক নিরপরাধ যুবককে। প্রতিমন্ত্রী বাবরের নির্দেশনায় ১৭ দিন হেফাজতে রেখে জজ মিয়ার মিথ্যা জবানবন্দিও আদায় করা হয়। তাকে ঘিরে এ মামলা নিয়ে একের পর কল্পকাহিনী সাজান সিআইডির তৎকালীন এএসপি আব্দুর রশীদ, বিশেষ পুলিশ সুপার রুহুল আমিন ও মুন্সী আতিকুর রহমান। পরে রাজসাক্ষী হয়ে জজ মিয়া সিআইডির ষড়যন্ত্র ফাঁস করলে তদন্তের মোড় ঘুরে যায়।

জট খুলেছে যেভাবে :২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে এ মামলা পুনর্তদন্ত শুরু হয়। এ সময় একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসে। জানা যায়, শেখ হাসিনাকে হত্যা করতে এ হামলার ছক কষা হয়। হামলায় ব্যবহূত আর্জেস গ্রেনেড এসেছে পাকিস্তান থেকে। ২০০৮ সালে নতুন করে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। এতে আসামি করা হয় বিএনপি নেতা আবদুস সালাম পিন্টু, তার ভাই মাওলানা তাজউদ্দিন ও হুজিবি নেতা মুফতি হান্নানসহ ২২ জনকে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে শুরু হয় বিচার কার্যক্রম। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এলে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের ভিত্তিতে এ মামলা অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেন আদালত। ২০১১ সালের ৩ জুলাই দাখিল করা সম্পূরক অভিযোগপত্রে আসামি করা হয় আরও ৩০ জনকে। এ নিয়ে মোট আসামির সংখ্যা হয় ৫২ জন। সম্পূরক চার্জশিটের আসামিরা হলেন- তারেক রহমান, লুৎফুজ্জামান বাবর, হারিছ চৌধুরী, কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ, জামায়াতের সাবেক সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, এনএসআইর সাবেক মহাপরিচালক রেজ্জাকুল হায়দার ও আবদুর রহিম, ডিজিএফআইর এ টি এম আমিন, পুলিশের সাবেক আইজি আশরাফুল হুদা, শহুদুল হক, অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক খোদা বকস, ডিএমপির তৎকালীন উপকমিশনার ওবায়দুর রহমান, সাবেক উপকমিশনার খান সাঈদ হাসান, হুজির আমির মাওলানা শেখ ফরিদ, নায়েবে আমির মাওলানা আবদুল হান্নান ওরফে সাব্বির, মাওলানা আবদুর রউফ, খালেদা জিয়ার ভাগ্নে সাইফুল ইসলাম ডিউক, ডিজিএফআই থেকে বরখাস্ত হওয়া সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দার, ঢাকা মহানগর বিএনপি নেতা আরিফুর রহমান, হুজিবির সাবেক আমির ও ইসলামিক ডেমোক্রেটিক পার্টির আহ্বায়ক মাওলানা আবদুস সালাম, কাশ্মীরি জঙ্গি আবদুল মাজেদ ভাট ওরফে ইউসুফ ভাট, আবদুল মালেক ওরফে গোলাম মোস্তফা, সিআইডির বিশেষ সুপার রুহুল আমিন, সাবেক এএসপি মুন্সী আতিকুর রহমান, সাবেক এএসপি আবদুর রশিদ, হানিফ পরিবহনের মালিক বিএনপি নেতা হানিফ, হুজি সদস্য হাফেজ মাওলানা ইয়াহিয়া, মুফতি শফিকুর রহমান, মুফতি আবদুল হাই ও বাবু ওরফে রাতুল বাবু।

আসামিদের মধ্যে আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ এবং মুফতি হান্নান ও তার সহযোগী শাহেদুল ইসলাম বিপুলের মৃত্যুদণ্ড অন্য মামলায় কার্যকর হয়েছে। সম্পূরক চার্জশিটের আসামিদের মধ্যে পুলিশের সাবেক তিন মহাপরিদর্শকসহ আটজন জামিনে রয়েছেন। লুৎফুজ্জামান বাবর, আবদুস সালাম পিন্টুসহ ২৩ জন আছেন কারাগারে। পলাতক ১৮ আসামি হলেন- তারেক রহমান, হারিছ চৌধুরী, কায়কোবাদ, এটিএম আমিন, সাইফুল জোয়ার্দার, সাঈদ, ওবায়দুর, মুফতি শফিকুর, মুফতি হাই, রাতুল বাবু, হানিফ, মালেক, শওকত, মাওলানা তাজ, ইকবাল, মাওলানা বকর, খলিলুর ও জাহাঙ্গীর। তাদের মধ্যে তারেক ও হারিছ চৌধুরী লন্ডনে, হানিফ কলকাতায়, আমিন ও সাইফুল কানাডায়, রাতুল ও তাজউদ্দিন দক্ষিণ আফ্রিকা এবং সাইদ ও ওবায়দুর মালয়েশিয়ায় অবস্থান করছেন। বাকিদের তথ্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে নেই।

কেন দীর্ঘসূত্রতা :বিএনপি সরকারের আমলে এ মামলাকে ভিন্ন খাতে নিতে জজ মিয়া নাটক সাজিয়ে প্রায় তিন বছর পার করা হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকার এলে মামলার তদন্তে গতি পায়। ২০১১ সালে সম্পূরক চার্জশিট দাখিলের পর শুরু হয় বিচার প্রক্রিয়া। এখন পর্যন্ত ১০৮ কার্যদিবসে এ মামলার যুক্তিতর্ক উপস্থাপন হয়েছে। এর মধ্যে রাষ্ট্রপক্ষ সময় নিয়েছে ২৫ দিন। বাকি দিন গেছে আসামি পক্ষের যুক্তিতর্কে। রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ, আসামি পক্ষের আইনজীবীর মধ্যে অনেকে অপ্রয়োজনীয় ও অপ্রাসঙ্গিক জেরা করে সময় নষ্ট করেছেন। কয়েকজন আসামি একাধিক মামলায় অভিযুক্ত হওয়ায় অন্য আদালতেও তাদের হাজির হতে হয়েছে। এতেও সময়ক্ষেপণ ঘটেছে।