আজ মঙ্গলবার সকাল ৬:১৫, ১৭ই অক্টোবর, ২০১৭ ইং, ২রা কার্তিক, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, ২৬শে মুহাররম, ১৪৩৯ হিজরী

অবহেলা-অযত্ন নয়; আসুন ভালোবাসা দিয়ে তাদের পাশে দাঁড়াই!

নিউজ ডেস্ক | বার্তা বাজার .কম
আপডেট : মার্চ ২১, ২০১৭ , ১০:৩৮ অপরাহ্ণ
ক্যাটাগরি : সম্পাদকীয়
পোস্টটি শেয়ার করুন

আমি যখন ক্লাস ফাইভে পড়ি; তখন আমাকে বেশ কয়েক মাস লজিং থাকতে হয়েছিলো! হেড মাস্টার ছিলেন আব্বার ছাত্র; তিনি আমাকে আবু বেপাড়ির বাড়িতে লজিং রেখে দিয়েছিলেন। বৃত্তির কোচিং চলছিলো তখন; বাড়ি থেকে প্রতিদিন দুইবেলা যাতায়াত করা সম্ভব ছিলো না।

আবু বেপাড়ির বাড়ির বারান্দার রুমে থাকতাম আমি। মাঝে মধ্যেই বারান্দায় খেলা করতে দেখতাম একজন অদ্ভূত টাইপের বাচ্চাকে! চাপা মুখ, চিবুক, ঘাড় ও চোখ ছোট ছোট! এলাকার সবাই তাকে ‘পাগলীবুড়ি’ নামে ডাকতো! আবু বেপাড়ির নাতনী সে। সবাই বলতো বুড়ির সাথে নাকি জিন-পরি আছে!

বুড়ি হাটতে পারতো না; কথা বলতে পারতো না; খাবারও খেতে পারতো না! বুড়ির মা কোলে করে মাঝে মধ্যে বেড়াতে নিয়ে আসতো নানা বাড়িতে। তাদের বাড়ি আবু বেপাড়ির বাড়ি থেকে চার পাঁচ বাড়ির পরে।

আমরা কোচিং করতে যেতাম ওই বাড়ির ওপর দিয়ে। মাঝে মধ্যে দেখতাম; বুড়িকে রশি দিয়ে বেধে রেখেছে তার মা। এলাকার অন্যান্য পোলাপানেরা খুব জ্বালাতন করতো ওই বুড়িকে! দেখলেই পাগলী বলে ক্ষ্যাপাতো; বকাঝকা করতো। বুড়ির মাও বুড়িকে তেমন আদর যত্ন করতো না। ময়লা জামা কাপড়েই রাখতো সব সময়।

এক শুক্রবারে বাড়িতে গিয়ে আব্বাকে ওই অদ্ভূত বাচ্চার কথা জানালাম। ওই বাচ্চার সাথে জিন-পরি আছে সেটাও বললাম। ছোট ছোট চোখ আর চ্যাপটা মুখের ওই বুড়ির কথা শুনে আব্বা আমাকে বললেন, তার সাথে কোনো জিন-পরি নাই। সে ‘ডাউন সিনড্রোম’ শিশু। তাকে যেনো দেখলেই আদর করি; তার সাথে ভালো ব্যবহার করি!

তারপর থেকে এসব অদ্ভূত শিশু দেখলে আমার মায়া হয়। আমি তাদের সাথে কথা বলি; সময় দেই! কারণ আব্বা বলেছিলেন ডাউন সিনড্রোম কোন রোগ নয় তাই এটি নিরাময় হবার কোন সুযোগ নেই। স্রেফ তাদের ভালোবাসার প্রয়োজন!

আজ ২১ মার্চ বিশ্ব ডাউন সিনড্রোম দিবস। ১৮৬৬ সালে ব্রিটিশ নিউরোলজিস্ট জন ল্যাংডন ডাউন সর্বপ্রথম এই বিষয়টি বর্ণনা করেন। তাই তাঁর নামানুসারে এই লক্ষণের নাম দেওয়া হয়েছে ডাউন সিনড্রোম।

সারা পৃথিবীতে প্রায় ৭০ লাখ ডাউন সিনড্রোম লোক রয়েছে। সে হিসেবে বাংলাদেশে দুই লাখ ডাউন সিনড্রোম ব্যক্তি বসবাস করছে। তারা কেউ আমাদের ভাই, কেউ বোন, কেউ বন্ধু কিংবা স্বজন!

মানুষের শরীরে প্রত্যেকটি কোষে ক্রোমোজোম সংখ্যা ৪৬টি। এর মধ্যে ২৩টি ক্রোমোজোম বাবা এবং অন্য ২৩টি ক্রোমোজোম মা এর কাছে থেকে আসে, যা জোড়ায় জোড়ায় দেহকোষ তৈরি করে। ডাউন সিনড্রোম ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রতিটি দেহকোষে ২১তম ক্রোমোজোমে একটি অতিরিক্ত ক্রোমোজোম পাওয়া যায়। অর্থাৎ ২১তম ক্রোমোজোমে তিনটি ক্রোমোজোম থাকে, যাকে ‘ট্রাইসোমি ২১’ বলা হয়। এভাবে ডাউন সিনড্রোম ব্যক্তির শরীরে প্রত্যেকটি কোষে ক্রোমোজোম সংখ্যা দাড়ায় ৪৭টি। সাধারণত চাপা মুখ, চিবুক, ঘাড় ও চোখ ছোট হয় ডাউন সিনড্রোম শিশুদের।

সঠিক যত্ন, পুষ্টিকর খাবার, স্পিচ ও ল্যাংগুয়েজ এবং ফিজিক্যাল থেরাপি দিলে ডাউন সিনড্রোম শিশুরা অন্য স্বাভাবিক শিশুর মত পড়ালেখা করতে পারে। সচেতনতা ও ভালোবাসা দিয়ে ডাউন সিনড্রোম শিশুদের সমাজে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।

অবহেলা-অযত্ন নয়; আসুন ভালোবাসা দিয়ে তাদের পাশে দাঁড়াই!

লেখক : সহসম্পাদক, কালের কণ্ঠ