তারিকুল ইসলাম সোহাগ, নীলফামারী প্রতিনিধি: গর্জে উঠা তিস্তা নদী রুদ্রমুর্তি ধারন করতে চলেছে। নদীর উথালপাতাল ঢেউ আর শোঁ-শোঁ শব্দ নদীর পাড় কাঁপিয়ে তুলেছে। নির্ভরযোগ্য সুত্র মতে ওপারে গোজলডোবা তিস্তা ব্যারাজের জলকপাট খুলে দেয়ায় উজানের ঢল বৃদ্ধি পাওয়া ভারত তাদের অংশে জারি করেছে হলুদ সতর্কতা।
এতে করে উজানের ঢলে তিস্তা নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করেছে। বৃহ¯পতিবার জেলার ডিমলা উপজেলায় ডালিয়ায় তিস্তা ব্যারাজ পয়েন্টে নদীর পানি ২০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। ওই পয়েন্টে নদীর পানির বিপদসীমা ৫২ দশমিক ৬০ সেন্টিমিটার।
এতে জেলার ডিমলা ও জলঢাকা উপজেলার নদীতীরবর্তী ১৫ গ্রাম প্লাবিত হয়ে পড়েছে। উজানের ঢলে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় চর ও চর বেস্টিত গ্রামের বসবাসরত পরিবারগুলোকে নিরাপদে সরে উঁচুস্থানে আশ্রয় নিতে বলা হয়েছে।
এদিকে তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধিতে নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলার শৌলমারী বান পাড়ায় শ্রোতের আঘাতে ডানতীর গ্রাম রক্ষা বাধে ভাঙ্গন দেখা দেওয়ায় ওই এলাকার ২ হাজার পরিবার ও ডিমলা উপজেলার চরখরিবাড়ি এলাকার স্বেচ্ছাশ্রম বাঁধটি হুমকীর মুখে পড়ায় ওই চরে বসবাসকৃত ৩ হাজার পরিবার আতঙ্কের মধ্যে পড়েছে।
নীলফামারীর ডিমলা উপজেলা তিস্তাপাড়ের আছির মাঝি ও হারুন মাঝি জানান,উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ী ঢলে বুধবার রাত ১১টা থেকে নদীর পানি হুহু করে বাড়তে থাকে। বৃহস্পতিবার দুপুরের পর নদীর পানি আরো বৃদ্ধি পেয়ে নদীর আশেপাশের চর গ্রামগুলোতে বানের পানি ঢুকে প্লাবিত করছে।
ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যাপূর্বভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র সূত্র জানায়, বৃহস্পতিবার সকাল ৬টায় নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করে। এ সময় বিপদসীমার দুই সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হলেও বেলা ১২ টায় বিপদসীমার ৭ সেন্টিমিটার উপরে চলে যায়।
এর পর বিকাল তিন টায় পানি বেড়ে বিপদসীমার ২০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে থাকে। এতে প্লাবিত হয় তিস্তা ব্যারাজের উজান ও ভাটির চর ও নদীতীরবর্তী গ্রাম গুলো।
ডিমলা ও জলঢাকা উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের জন প্রতিনিধিরা জানায় তিস্তার বন্যায় ডিমলা ও জলঢাকা উপজেলার পূর্বছাতনাই, খগাখড়িবাড়ি, টেপাখড়িবাড়ি, খালিশাচাঁপানী, ঝুনাগাছ চাঁপানী, ডাউয়াবাড়ি, গোলমুন্ডা, শৌলমারী, কৈমারী সহ ১০ ইউনিয়নের তিস্তা অববাহিকার ১৫টি চর ও গ্রাম তিস্তার বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে। ওই সকল এলাকায় বসবাসকারীদের নিরপদে উঁচু স্থানে সরে থাকার জন্য বলা হয়েছে।
এদিকে তিস্তা পানি বৃদ্ধিতে নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলার শৌলমারী বান পাড়ায় ডানতীর প্রতি গ্রাম রক্ষা বাধে ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। ওই এলাকার বাসিন্দা মনির উদ্দিনের ছেলে আশরাফ আলী ও দিদার রহমান জানায়, পরিবার পরিজন নিয়ে খুবেই ভয়ের মধ্যে আছি, এই বাধ ভেঙ্গে শুধু এই বান পাড়ায় নয়, ডাউয়াবাড়ি, শৌলমারী ও কৈমারী ইউনিয়নের ২০ হাজারেরও বেশি পরিবারের ঘরবাড়ি তিস্তা নদীতে পরিনত হবে।
আমরা নিজেরাই বাঁশ ও কাঠ ফেলে বাধের ভাঙ্গন ঠেকাতে চেস্টা করছি। ছাবেদ আলী ও জহুরুল হক অভিযোগ করে বলেন, বাধ ভাঙ্গন রোধে পানি উন্নয়ন বোড কোন পদক্ষেপ গ্রহন করেনা। পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী হাফিজুল হকের কাছে ভাঙ্গন রোধের জন্য বলা হলে জিও ব্যাগের বালু ভরে তারা ভাঙ্গন রোধের ব্যবস্থা নেবেন।
কিন্তু মুখে বললেও তারা কাজ করেনা। ফলে আমরা নিজেরাই বাঁশ ও কাঠ ফেলে বাধের ভাঙ্গন রোধের চেষ্টা করছি। এব্যাপারে পানি উন্নয়ন বোর্ড নীলফামারী জোনের এসডি হাফিজুল হক জানায় বানপাড়া বাঁধ ৬০ মিটার পর্যন্ত ভাঙ্গন পাওয়া গেছে।
আমরা ১২০ মিটার পর্যন্ত এই ভাঙ্গন রোধের চেষ্টা করছি। তবে এ বাধটি প্রকল্পের মাধ্যমে স্থায়ীভাবেরক্ষার জন্য পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। যা আগামী সেপ্টেম্বর থেকে এর কাজ শুরু হবে বলে আশা করা যায়।
অপর দিকে ডিমলা উপজেলার চরখড়িবাড়ি এলাকায় স্বেচ্ছাশ্রমে নির্মিত বাঁধটি তিস্তার পানি তোড়ে ভাঙ্গনের মুখে পড়ায় ওই এলাকার ৩ হাজার পরিবার আতঙ্কের মুখে পড়েছে।
বাঁধটি রক্ষার্থে বৃহস্পতিবার উপজেলা পরিষদ হতে ১০ লক্ষ টাকার বরাদ্দ দেয়া হয় বলে ইউপি চেয়ারম্যান ময়নুল হক জানান। তিনি ওই বাধের ভাঙ্গন রোধে লোকজন নিয়ে কাজ করছেন বলে জানায়।
ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, উজানের ঢল ও বৃস্টিপাতের কারনে আমরা সর্তকাবস্থায় রয়েছি। বৃহস্পতিবার তিস্তা নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করে ২০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পরিস্থিতি মোকাবেলায় ব্যারাজের সবকটি জলকপাট খুলে রাখা হয়েছে।