২০, আগস্ট, ২০১৮, সোমবার | | ৮ জ্বিলহজ্জ ১৪৩৯

বাস মালিকের দোষ চোখে পড়ে না

আপডেট: আগস্ট ১২, ২০১৮

বাস মালিকের দোষ চোখে পড়ে না

পরিবহন খাতের নৈরাজ্যসহ বিভিন্ন সংকটে শুধু চালকের দোষ-ত্রুটি-অযোগ্যতা আলোচনায় আসে। গাড়ির ফিটনেস বা রুট পারমিট না থাকার বিষয়গুলো নিয়ে তেমন আলোচনা হয় না বলে এসব অপরাধে অপরাধী মালিকরা পার পেয়ে যান। অথচ মালিকেরই দায়িত্ব, নিয়োগের আগে চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্স যাচাই এবং গাড়ির কাগজ হালনাগাদ করা।

সংশ্লিষ্টরা জানান, সরকারি নির্দেশনা কখনই মানেন না পরিবহনকর্মীরা। ফিটনেস ও রুট পারমিটবিহীন গাড়ির তালিকা তৈরি করে বিআরটিএ থেকে দফায় দফায় মালিকদের সময় বেঁধে দেওয়া হয় কাগজপত্র হালনাগাদের। ঘোষণা আসে, নির্ধারিত সময়ে কাগজ হালনাগাদ না করলে রেজিস্ট্রেশন বাতিল হয়ে যাবে। কিন্তু পরিবহন মালিকরা অভিজ্ঞতা থেকে ধরেই নেন, এ ধরনের আলটিমেটাম বাস্তবে কার্যকর হবে না। তাই তারাও পাত্তা দেন না। সর্বশেষ দৃষ্টান্ত হচ্ছে, ১০ বছরের মেয়াদোত্তীর্ণ গাড়ির তালিকা করা হয়েছে। কিন্তু ব্যবস্থা নিতে পারেনি কর্তৃপক্ষ।

২০১০ সালের পর থেকে অন্তত ১০ বার মেয়াদোত্তীর্ণ গাড়ির নথিপত্র হালনাগাদে সংশ্লিষ্টদের তাগিদ দেওয়া হয় বিআরটিএর পক্ষ থেকে। কিন্তু এসব তাগিদ গায়েই মাখেননি শক্তিধর সিন্ডিকেটধারী পরিবহন মালিকরা। ৮ বছর আগে ফিটনেসবিহীন গাড়ির সংখ্যা ছিল ৮০ হাজার ৬১৫টি, বর্তমানে ৫ লাখ। ¯্রফে ঢাকা শহরেই ফিটনেসবিহীন গাড়ি ২ লাখ ১৬ হাজার। মাঝে একাধিকবার ফিটনেসবিহীন গাড়ির জন্য ধার্যকৃত জরিমানা পর্যন্ত মওকুফ করে দেয় সরকার। কিন্তু যে লক্ষ্যে সরকার এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তা পূর্ণ হয়নি। এখন চলছে বিশেষ ট্রাফিক সপ্তাহ। এবার নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের কারণে ট্রাফিক সপ্তাহ গুরুত্বের সঙ্গে পালন করা হচ্ছে। গতকাল এ কর্মসূচি বাড়িয়ে দশদিন করা হয়েছে। ট্রাফিক সপ্তাহ চলাকালে কাগজপত্র না থাকা যানবাহন বরাবরের মতোই সড়কে নামছে না। ওদিকে বাস মালিকরা প্রতিবারের মতো এবারও আরও সময় চাইছেন।

জানা গেছে, ২০১০ সালে প্রথম ফিটনেসবিহীন যানের তালিকা করে বিআরটিএ। সে সময় গাড়ির রেজিস্ট্রেশন নম্বরসহ তালিকা পাঠানো হয় ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কাছে। পরে প্রতি বছরই তালিকা হালনাগাদ করা হয়। সর্বশেষ, গত মার্চে এ সংক্রান্ত নোটিশে ৩০ এপ্রিলের সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয় ফিটনেস নবায়নে। এ রকম মেয়াদোত্তীর্ণ গাড়ির সংখ্যা প্রায় ৫৫ হাজার। এর মধ্যে সরকারি বিভিন্ন সংস্থারও তিন সহস্রাধিক গাড়ি রয়েছে। পৃথক বিজ্ঞপ্তিতে সরকার রুট পারমিট নবায়নে এ বছরের ২৫ মে পর্যন্ত সময় বেঁধে দেয়। নোটিশে জানানো হয়, বৈধ রুট পারমিট ছাড়া গাড়ি চালালে মালিক ও চালক উভয়ের জন্য জেল-জরিমানার কথা। ১৯৮৩ সালের সড়ক আইনের ৫২ ধারা অনুযায়ী শাস্তির কথা তুলে ধরা হয় সেখানে। কিন্তু গত বৃহস্পতিবার খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেল-জরিমানার কথা বলেও লাভ হয়নি। এসব গাড়ি চলছে নবায়ন ছাড়াই।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, গাড়ি নবায়ন না করার মূল কারণ বছরের পর বছর জমে থাকা বিপুল অঙ্কের জরিমানা। আর ফিটনেসের শর্তাদি পূরণ। এ সংক্রান্ত শর্তাদি পূরণ ও জরিমানা প্রদান করে গাড়ির কাগজপত্র হালনাগাদ করতে যে পরিমাণ অর্থ সচরাচর ব্যয় হয়, সেই টাকায় আরেকটি পুরনো গাড়ি ক্রয় করা যায়। এছাড়া এসব গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণেও বিপুল পরিমাণ খরচ রয়েছে। আর তাই প্রতিবারের মতো অভিযান শিথিল করতে বিআরটিএ ও ডিএমপির কাছে সময় চাওয়া হয় যানমালিকদের পক্ষ থেকে। গত ৬ আগস্ট বাস-ট্রাক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, সরকারের কাছে আরও এক মাস সময় চাওয়ার। এর পর গত ৮ আগস্ট সড়ক পরিবহন সমিতি সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময় চাওয়ার কথা গণমাধ্যমকর্মীদের জানায়। অথচ চলতি বছরেই বহুবার পত্রিকায়-টিভিতে গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে বিআরটিএ; একাধিকবার বেঁধে দেওয়া হয় নির্দিষ্ট সময়সীমা। চলতি বছর এ সংক্রান্ত নোটিশ প্রচার হয় ১১ জানুয়ারি, ২৯ মার্চ, ৭ জুন, ২৭ জুন, ২১ মে, ৩১ জুলাই ও ৪ আগস্ট। প্রতিবারই বলা হয়েছে, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাগজপত্র হালনাগাদ না করলে গাড়ির রেজিস্ট্রেশন বাতিল করা হবে। কিন্তু সেই ঘোষণাই সার, বাস্তবে বাতিল হয়নি।

বুয়েটের অধ্যাপক ড. শামছুল হক আমাদের সময়কে বলেন, পরিবহন খাতে বর্তমানে যে বিশৃঙ্খলা চলছে, এর জন্য একতরফাভাবে চালকদের বিরুদ্ধে বলা হলেও শুধু তারাই দোষী নন। কর্তৃপক্ষ-মালিক-শ্রমিক সবারই দায়িত্ব আছে।

এ বিষয়ে বিআরটিএর চেয়ারম্যান মশিয়ার রহমান আমাদের সময়কে বলেন, যানবাহনের ফিটনেস বা রুট পারমিট খেলাপি গাড়ি চলাচল করতে পারবে না। এর মধ্যে ১০ বছর অতিক্রান্ত গাড়ির তালিকা করা হয়েছে। সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহ বলেন, টার্মিনাল থেকে ফিটনেসবিহীন বাস বের করতে দেওয়া হবে না। আগামী ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ভাঙাচোরা বাস মেরামত করে চলাচল উপযোগী করতে হবে।