১৯, ডিসেম্বর, ২০১৮, বুধবার | | ১০ রবিউস সানি ১৪৪০

ঘোষণাতেই শেষ সব তোড়জোড়

আপডেট: আগস্ট ১১, ২০১৮

ঘোষণাতেই শেষ সব তোড়জোড়

বাস মালিক নেতাদের ঘোষণা ছিল- রেষারেষি বন্ধে রাজধানীতে আর চুক্তিতে বাস চলবে না। গত বৃহস্পতিবার থেকে এ ঘোষণা কার্যকরের কথা। কিন্তু সমকালের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অধিকাংশ বাস চুক্তিতেই চলছে। সাধারণ চালক ও মালিকরা জানান, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে পরিবহন নেতারা চুক্তিতে বাস চালানো বন্ধের ঘোষণা দিলেও তা শুধুই কথার কথা।

চুক্তিতে বাস চালানো বন্ধের ঘোষণার মতো পরিবহন খাতের নৈরাজ্য বন্ধে অতীতে যত সিদ্ধান্ত তোড়জোড় করে নেওয়া হয়েছে তার অধিকাংশই কার্যকর হয়নি। গত জুনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পাঁচ দফা নির্দেশনা দিয়েছিলেন। ওই নির্দেশনা বাস্তবায়নে কোনো উদ্যোগ নেই গত দেড় মাসে। এর আগে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে সভা থেকে দেওয়া হয়েছিল ২৯ দফা নির্দেশনা। সেগুলোও কার্যকর হয়নি। পরিবহন খাতের সর্বোচ্চ ফোরাম জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল বছর দুই

আগে

৮৪টি সুপারিশ করে। এগুলোও বাস্তবায়ন হয়নি।

পরিবহন খাতের নৈরাজ্য বন্ধে সরকার, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী, মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলো অতীতে এমন বহু সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়ন হয়নি। নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে গত সপ্তাহে সড়কে নিয়ম মানতে ছিল কড়াকড়ি। নিয়ম ভাঙলেই জরিমানা, মামলা হয়েছে। শিক্ষার্থীরা ঘরে ফেরার পর পরিবহন খাতের পুরনো নৈরাজ্য ফিরে এসেছে।

ঢাকঢোল পিটিয়ে ‘ট্রাফিক সপ্তাহ’ শুরু হলেও উল্টোপথে চলা, চাঁদাবাজি, যত্রতত্র পার্কিং, বাসে বাসে প্রতিযোগিতা, যেখানে সেখানে যাত্রী ওঠানামা- পুরনো অনিয়ম সবই চলছে। গতকাল রাজধানীর জিগাতলা, শঙ্কর, আসাদগেট, ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, শাহবাগ, প্রেস ক্লাব, পল্টন, কাকরাইল, মগবাজার, এফডিসি মোড় ঘুরে এসব চিত্র দেখা গেছে।

নৈরাজ্য ঠেকাতে চলমান ট্রাফিক সপ্তাহে আইন ভঙ্গের কারণে ৩৮ হাজার ৩২৮টি মামলা করেছে পুলিশ। বিআরটিএর চার ভ্রাম্যমাণ আদালতে গত সপ্তাহে মামলা হয়েছে আরও দুই হাজার। কিন্তু ফিটনেসবিহীন বাস ও অনুমোদিত যান চলছেই।

বৃহস্পতিবার দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে কথা হয় হেমায়েতপুর-সায়েদাবাদ রুটের বাসের (ঢাকা মেট্রো-ব-১১-২৩৯৯) চালক হোসেন মিয়ার সঙ্গে। তিনি জানান, আগের মতোই চুক্তিতে বাস চালাচ্ছেন। মালিককে চার হাজার টাকা দিতে হয় প্রতিদিনের জন্য।

রুট পারমিটের শর্ত অনুযায়ী চুক্তিতে বাস চালানো অবৈধ। গত বুধবার রাজধানীর বাস মালিকদের সংগঠন ‘ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি’ ঘোষণা দেয়, আইন মেনে চলবেন তারা। আর চুক্তিতে বাস চলবে না। চালক দৈনিক মজুরি পাবেন। সমিতির এ সিদ্ধান্তের বিষয়ে হোসেন মিয়া বলেন, ‘তারা তো খালি ঘোষণাই দেয়। মালিক তো চুক্তি ছাড়া বাস দেয় না।’

তার সহকারী ওয়াসিম জানান, মালিককে দিনে চার হাজার টাকা দিতে হয়। তেল-গ্যাস বাবদ খরচ হয় আরও দুই হাজার টাকা। এ ছাড়া প্রতিদিনই গাবতলীতে ৬৫০ টাকা ও সায়েদাবাদে ৫০০ টাকা চাঁদা দিতে হয়। মালিক সমিতি, শ্রমিক সমিতি, পুলিশ ও রাজনৈতিক নেতারা চাঁদার ভাগ পান। সব মিলিয়ে দিনে সাত হাজার টাকা খরচ হয়। যাত্রীদের কাছ থেকে ভাড়া বাবদ সাত হাজার টাকার বেশি যা পাওয়া যায়, তা চালক ও হেলপার পান। সাত হাজার টাকার কম ভাড়া উঠলে বাকি টাকা পকেট থেকে দিতে হয়।

আগের মতোই চুক্তিতে চলছে ১৫ নম্বর বাস। মৎস্য ভবন মোড়ে ঢাকা মেট্রো-ব-১১-৪১৬৩ বাসটির চালক জমির হোসেন জানান, তিন ট্রিপের জন্য দুই হাজার ২০০ টাকা চুক্তিতে বাসটি চালাচ্ছেন। বাড়তি ট্রিপ হলে মালিককে বাড়তি টাকা দিতে হবে। তেল, গ্যাস, পথের চাঁদা সব খরচ তাকেই দিতে হয়। ভাড়া বাবদ যে টাকা পাওয়া যাবে তা থেকে সব ব্যয় মিটিয়ে যদি কিছু থাকে তাহলে তিনি ও হেলপার পাবেন।

বাসটির মালিক শনির আখড়ার জসিম উদ্দিন। তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে স্বীকার করেন, চুক্তিতেই বাস দিয়েছেন। সমিতির ঘোষণা ‘চুক্তিতে বাস চলবে না’ এ বিষয়ে তিনি বলেন, চুক্তিতে বাস না চালালে পোষায় না। চালক-হেলপারের বেতন, কোম্পানি, সমিতি ও পুলিশের চাঁদা দেওয়ার পর মালিকের কিছুই থাকে না। চুক্তিতে বাস চালানোর কারণে দুর্ঘটনা ঘটে, রুট পারমিটের শর্ত অনুযায়ী চুক্তিতে বাস চালানো অবৈধ, তা জেনেও কেন চুক্তিতে বাস চালাচ্ছেন? এ প্রশ্নে এই বাস মালিক বলেন, চাঁদাবাজি না থাকলে চুক্তিতে বাস চালাতেন না। চাঁদাবাজি বন্ধ না হলে চুক্তি ছাড়া লোকাল বাস চালিয়ে মালিকরা লাভবান হতে পারবেন না।

পরিবহন বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন, চুক্তিতে বাস চলায় ঢাকার সড়ক প্রাণঘাতী হয়ে উঠেছে। সমকালের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রুটভেদে রাজধানীতে দৈনিক দুই থেকে চার হাজার টাকা চুক্তিতে চালককে বাস দেন মালিকরা। এ পদ্ধতিতে বাস চালানোসহ চালককে সব ব্যয় বহন করতে হয়।

চুক্তিতে চলার কারণে চালকরা খরচ তুলতে চাপে থাকেন। যাত্রী পেতে মরিয়া থাকেন। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক সাইফুন নেওয়াজ বলেছেন, বাড়তি যাত্রী পেতে চালকরা রাস্তার বাম লেনে থাকার চেষ্টা করেন। মোড়গুলোতে ফুটপাতের যতটা সম্ভব কাছে বাস পার্ক করেন। বাসে বাসে এ রেষারেষিতে প্রাণ যায় যাত্রীর। এ কারণে গত ২৯ জুলাই জাবালে নূর বাসের চাপায় নিহত হয় দুই কলেজ শিক্ষার্থী।

নিহতদের সহপাঠীরা রাস্তায় নামার পর নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। সমিতি সিদ্ধান্ত দেওয়ার পরও বাস কেন চুক্তিতে চলছে- এ প্রসঙ্গে সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েত উল্যাহ বলেন, অনেক দিন ধরে অনিয়মটি চলে আসছে। বন্ধ হতে কিছুটা সময় লাগবে। তিনি দাবি করেন, গতকাল অনেক বাস চুক্তি ছাড়াই চলেছে। চুক্তিতে চলায় পাঁচটি পরিবহন কোম্পানির নিবন্ধন বাতিল করেছে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি। তবে সরেজমিন দেখা যায়, কাউন্টারভিত্তিতে যেসব বাস চলত শুধু সেগুলোই চুক্তি ছাড়া চলছে।

বিআরটিএর তথ্যানুযায়ী, ঢাকায় বাস রুটের সংখ্যা ২৭৯। মালিক সমিতির দপ্তর সম্পাদক গোলাম সামদানী জানিয়েছেন, বাস কোম্পানির সংখ্যা ২৭৬। এসব কোম্পানির অধীনে প্রায় দুই হাজার মালিকের সাত হাজার ৮০০ বাস চলে ঢাকায়। মালিক ভিন্ন হওয়ায় যাত্রী পেতে ব্যস্ত রাস্তায় একই কোম্পানির বাসে বাসে প্রতিযোগিতা চলে। বাস চলাচল ব্যবস্থাকে সুশৃঙ্খল করতে ‘বাস রুট রেশনালাইজ’ বা বাস নেট চালুর নির্দেশ ছিল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের। ঢাকায় বাস রুটের সংখ্যা ছয়ে নামিয়ে এনে, ‘এক রুট এক কোম্পানি’ পদ্ধতি চালুর উদ্যোগ কয়েক বছর ধরে পরিকল্পনাতে ঘুরছে। বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. শামছুল হক সমকালকে বলেন, এ পদ্ধতিতে মালিকরা তাদের বিনিয়োগের বিপরীতে সমান মুনাফা পাবেন। ঢাকার রাস্তায় শৃঙ্খলা আনতে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতেই হবে।

ঈদুল ফিতরের সময় অনেক লোকের প্রাণহানি হয় সড়কে। ঈদযাত্রায় একদিনে সড়কে মৃত্যু হয় ৫৪ জনের। দূরপাল্লার পথে বিকল্প চালক, নির্দিষ্ট দূরত্বে চালক বিশ্রামাগার চালু, চালক ও হেলপারকে প্রশিক্ষণ, সিগন্যাল মেনে যান চলাচল ও পথচারী পারাপারে জেব্রা ক্রসিং ব্যবহার এবং চালক ও যাত্রীদের সিটবেল্ট বাঁধা নিশ্চিত করার নির্দেশনা দেন প্রধানমন্ত্রী। গত ২৫ জুন মন্ত্রিসভার বৈঠক থেকে দেওয়া এ পাঁচ দফা নির্দেশনা বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয় সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান এবং নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানকে। কিন্তু দেড় মাসেও তিন মন্ত্রী বৈঠকে বসেননি। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা বাস্তবায়নে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

মোটরযান আইনে একজন চালক একটানা পাঁচ ঘণ্টার বেশি গাড়ি চালাতে পারবেন না। দিনে আট ঘণ্টার বেশি গাড়ি চালাতে পারবেন না। কিন্তু ঢাকায় চালকরা ১৬ থেকে ১৭ ঘণ্টা বাস চালান। মালিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী ‘ক্লান্তি দূর করতে’ মাদক সেবন করেন অধিকাংশ চালক।

যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, যখন দুর্ঘটনা বাড়ে আন্দোলন হয়, তখন তড়িঘড়ি করে কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সরকারের তরফ থেকে নির্দেশনা আসে। ক’দিন গণমাধ্যমে খুব আলোচনা হয়। তারপর সবাই সব ভুলে যায়। আর কোনো সিদ্ধান্তই বাস্তবায়ন হয় না। সূত্র : সমকাল।