২০, আগস্ট, ২০১৮, সোমবার | | ৮ জ্বিলহজ্জ ১৪৩৯

পর্যটন ফাঁদ!

আপডেট: আগস্ট ১০, ২০১৮

পর্যটন ফাঁদ!

ঘুম থেকে উঠে ব্যালকনিতে দাঁড়ালেই সূর্যের রক্তিম আভা এসে মুখে পড়ছে। রাতে আবার নিয়ন আলোর শহর। এই শহরের মধ্য দিয়ে সরু ক্যানেল বয়ে চলেছে। সারি সারি নৌকা নিজ গন্তব্যে এগিয়ে যাচ্ছে। দু’ধারে অজস্র ছোট ছোট ফুলের বাগান, এসব বাগান থেকে যেন স্বর্গীয় প্রশান্তি আছড়ে পড়ছে শহরের অলিতে-গলিতে। অপূর্ব নির্মাণ শৈলীতে তৈরি সেতুগুলো দুই পাশের জন-জীবনকে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। জিওভ্যানি বোনাজনের চিত্রকর্মে ইতালির ভেনিস শহর এভাবেই ফুটে উঠেছে।

জিওভ্যানি বোনাজন একজন চিত্রশিল্পী, যিনি জলরঙের জীবন্ত ছবি আঁকেন। প্রতিদিন ভেনিস শহরের আনাচে-কানাচে ঘুরে বেড়ান। শহরে আসা বিভিন্ন পর্যটকদের সঙ্গে কথা বলেন, গল্প করেন, তাঁর আঁকা ছবিগুলো দেখান। তিনি এই শহরে আসা পর্যটকদের পছন্দও করেন। তবে তিনি অন্যদের সঙ্গে একমত হয়ে খুব স্পষ্ট ভাবেই বলেছেন, ‘পর্যটন শিল্পই তাঁর শহরকে হত্যা করছে।’ টাইম ম্যাগাজিনের প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে।

বোনাজন বলছিলেন, সম্প্রতি ভেনিসের মেয়র লুগি ব্রগনারো প্রায় এক সপ্তাহ ব্যস্ত সময় কাটান। তিনি এসময় অতিরিক্ত পর্যটদের ভেনিসে আসা কমাতে চেকপোস্ট স্থাপনের অনুমতি প্রদান করেন এবং কার্যক্রম শুরু করেন। তিনি ভেনিসের আসার বিভিন্ন পয়েন্টগুলো বন্ধ করে দিতে বলেন। একটা নিয়মের মধ্য দিয়ে ভিনিসে আসতে হবে বলে তিনি জানান। কারণ অতিরিক্ত পর্যটকদের ফলে ভেনিসের সরু রাস্তাগুলো জনকীর্ণ হয়ে পড়ে। ঝুঁকিপূর্ণ জায়গাগুলোতে তারা ভিড় জমায়, অবস্থান করে। এতে ভেনিসের সৌন্দর্যের বিপরীতে ঘিঞ্জি কোনো শহরের দেখা মেলে। এমন উদ্যোগ নিলেও বোনাজন হতাশ হয়ে বলেন, অবশ্যই পর্যটকদের নিয়ন্ত্রণ করা উচিত, কিন্তু পর্যটকদের নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে ভেনিস বন্ধ করে দেওয়া উচিত নয়। কারণ এটা আমাদের শহর, আমাদের নিবাস, এটা কোনো ‘থিম পার্ক’ নয়।

ইউরোপের পর্যটক প্রিয় শহরগুলো সারা বিশ্বের পর্যটন শহরগুলোর প্রতিনিধিত্ব করছে। নবম শতাব্দী থেকে ১৯ শতক পর্যন্ত এই শহরগুলোতে দর্শনার্থীদের আগমণ সীমিত থকলেও গত দশক থেকে এর সংখ্যা অতিমাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে পর্যাপ্ত আবাসস্থল না থাকায় ঝুঁকিপূর্ণ জায়গাগুলোতেও অবস্থান করেন পর্যটকরা। ২০১৭ সালের এক হিসাবে দেখা যায়, ফ্রান্সে ঘুরতে যান ৮৭ মিলিয়ন পর্যটক। এরপর রয়েছে ইতালি, যেখানে ঘুরতে যান ৫৮.৩ মিলিয়ন। এমনকি ছোট নেদারল্যান্ডেও ১৭.৯ মিলিয়ন পর্যটক ঘুরতে যান।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় সব পর্যটক প্রিয় দেশগুলোতেই দর্শনার্থী সংখ্যা বেড়েছে। ২০১৬তে দেখা যায়, এশিয়াতে পর্যটকের সংখ্যা ৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, ল্যাটিন আমেরিকায় ৩.৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ভ্রমণের মৌসুম ছাড়াও বিশ্বের অসংখ্য মানুষ নানা দেশে ঘুরতে যাচ্ছেন।

আর এত এত দর্শনার্থীদের জন্য পর্যটন প্রধান শহরগুলো হয়ে উঠছে সাধারণ বসবাসের জন্য অনুপোযুক্ত। একটি হিসাবে দেখা যায়, ১৯৫১ সালে ভেনিসের স্থানীয় জনসংখ্যা ছিল ১ লাখ ৭৫ হাজারের মতো, সেখানে এখন মাত্র ৫৫ হাজার স্থানীয় বাসিন্দা বসবাস করছে। অনেকে বলছে এটা ৫৫ হাজারেরও নিচে চলে গেছে। এই শহরের চারিদিকে বড়বড় শপিং মল, দোকান, রেসটুরেন্ট, অফিস, হাসপাতাল ইত্যাদিতে জমাটবদ্ধ হয়ে রয়েছে। বড়-ছোট অসংখ্য রাস্তা শহরের চারদিকে ঘুরপাক খাচ্ছে। এসব রাস্তায় শুধু গাড়ি আর গাড়ি ভর্তি পর্যটক। রাস্তার পাশে আবার গাড়ি পার্কিং, বসার জায়গা ও রেস্টুরেন্টের জন্য বিশাল জায়গা ছেড়ে দেওয়া রয়েছে। ভেনিসের মতো ইউরোপের অন্যান্য ভ্রমণার্থী প্রিয় শহরগুলোর একই চিত্র বলে টাইম ম্যাগাজিনের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

বর্তমানে এসব শহরের স্থানীয় সরকার পর্যটকদের নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম শুরু করেছে। তারা দূষিত পানি, পরিকল্পিত ভবন ও রাস্তা নির্মাণ, বাজার ব্যবস্থা ও পর্যটন স্পটগুলোর মধ্যে যোগসূত্র স্থাপনের কাজ করছে। তবে এরপরও মনে করা হচ্ছে, এসব স্থানে পর্যটকদের নিয়ন্ত্রণ করা খুব সহজ হবে না। এর জন্য তাদের দীর্ঘ পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে এগোতে হবে।

এক দশকের মধ্যে পর্যটক সংখ্যা দ্রুত হারে বৃদ্ধির কারণ হিসেবে প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা মানুষকে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে দ্রুত পৌঁছে দিচ্ছে। বাস, ট্রেন, বিমান ইত্যাদি বাহনের টিকিটের দামও অনেক কমেছে। বিশ্বে সব দেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণি উদীয়মান পর্যটন শ্রেণিতে পরিণত হচ্ছে। এর পাশাপাশি বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তনও এই পর্যটন শিল্পকে বিকশিত করছে বলে প্রতিবেদনে উঠে আসে।

সূত্র: টাইম ম্যাগাজিন