২১, আগস্ট, ২০১৮, মঙ্গলবার | | ৯ জ্বিলহজ্জ ১৪৩৯

পাটের অভাবে উৎপাদন ব্যাহত, মজুরি বকেয়া ৩১ কোটি টাকা

আপডেট: আগস্ট ১০, ২০১৮

পাটের অভাবে উৎপাদন ব্যাহত, মজুরি বকেয়া ৩১ কোটি টাকা

পাটের অভাবে খুলনার রাষ্ট্রায়ত্ত ৯ পাটকলে উৎপাদন বন্ধ হওয়ার উপক্রম। দৈনিক উৎপাদনক্ষমতা ২৭২ মেট্রিক টনের বিপরীতে এখন উৎপাদন নেমে এসেছে মাত্র ১২ মেট্রিক টনে। এদিকে, বিক্রি না হওয়ায় মিলের উৎপাদিত প্রায় তিনশ কোটি টাকার পণ্য মজুত পড়ে রয়েছে। আর পাটকলগুলোতে শ্রমিক-কর্মচারীদের মজুরি ও বেতন বকেয়া পড়েছে ৩১ কোটি টাকার। এতে শ্রমিকদের পরিবারে চলছে হাহাকার। পাট খাতের শ্রমিকদের বাঁচিয়ে রাখতে এবং এ খাতকে উজ্জীবিত করতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন তারা।

জানা গেছে, খুলনার রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোতে গত ঈদের পর থেকে এ পর্যন্ত মজুরি বকেয়া পড়েছে ৫ থেকে ৬টি। মজুরি খাতে ৯ পাটকলে শ্রমিকদের বকেয়ার পরিমাণ প্রায় ২০ কোটি ৬০ লাখ টাকা। আর কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের দুই থেকে চার মাসের বকেয়া বেতনের পরিমাণও প্রায় ১০ কোটি ৮০ লাখ টাকা। অন্যদিকে, গত ছয় মাস ধরে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে উল্লেখযোগ্য পাটজাত পণ্য বিক্রি না হওয়ায় খুলনা-যশোর অঞ্চলের ৯ পাট কলে মজুত পণ্যের পরিমাণ প্রায় ৩০০ কোটি টাকা সমমূল্যের।

এদিকে পাটের মৌসুম শুরু হলেও এখন পর্যন্ত পাট কেনার জন্য সরকার কোনো টাকা বরাদ্দ না দেওয়ায় পাট কিনতে পারছে না মিলগুলো। পাট ব্যবসায়ীদের কাছে আগের দেনা প্রায় ২০৩ কোটি টাকা। পাট ব্যবসায়ীরাও বলছেন, মিলে পাট দিয়ে বিপাকে পড়েছেন তারা। তাদের কাছ থেকে পাট নিতে হলে অন্তত আগের পাওনা টাকা পরিশোধ করতে হবে বলে জানান পাট ব্যবসায়ী মো. আলম। পাট ব্যবসায়ী নূরুল ইসলাম বাবুলও বলেন, গত দু’বছর কোনো টাকা দেয়নি পাটকলগুলো। ফলে তারা আর রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোতে পাট বিক্রি করতে আগ্রহী নন।

শ্রমিক নেতারা জানান, ক্রিসেন্ট জুট মিলে শ্রমিকদের পাঁচটি মজুরির সোয়া ৬ কোটি টাকা এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দুই মাসের বেতন বাবদ প্রায় ১ কোটি ৬৪ লাখ টাকা বকেয়া পড়েছে। মিলে পাট খাতে দেনার পরিমাণ প্রায় ৫৫ কোটি টাকা। অন্যদিকে, মিলে বিক্রি না হওয়া উৎপাদিত পণ্য রয়েছে প্রায় ৬৫ কোটি টাকার। প্রায় দেড় কোটি টাকা বিদ্যুৎ বিল বকেয়া রয়েছে। পাটের মজুত আছে দুই সপ্তাহের।

মিলের মহাব্যবস্থাপক গাজী শাহাদাত হোসেন বলেন, মিলের উৎপাদিত পণ্য বিক্রি হলেই শ্রমিকদের মজুরিসহ দেনা পরিশোধ করা সম্ভব। তাছাড়া পাটের অভাবে মিলের অধিকাংশ লুম বন্ধ। আবার সরকার ২০১০ সালে সব পাটকলের আগের ব্যাংক ঋণ ফ্রিজ করে বন্ড ইস্যু করলেও এর আওতায় ক্রিসেন্ট জুট মিল ছিল না। ফলে মিলকে প্রতিমাসে প্রায় সোয়া এক কোটি টাকা সুদ দিতে হচ্ছে।

এদিকে, প্লাটিনাম জুট মিলে শ্রমিকদের পাঁচটি মজুরি বাবদ প্রায় ৫ কোটি এবং কর্মচারী-কর্মকর্তাদের দুই মাসের বেতন বাবদ ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা বকেয়া পড়েছে। পাট খাতে দেনা ৪০ কোটি টাকা। বিক্রি না হওয়া উৎপাদিত পণ্য রয়েছে প্রায় ৬৫ কোটি টাকার। মিলের মহাব্যবস্থাপক মুজিবর রহমান মল্লিক জানান, মিলের একদিকে শ্রমিকদের মজুরির চাপ, অন্যদিকে ব্যবসায়ীদের পাওনার চাপে রয়েছি। মজুত পণ্য বিক্রি হলে এ সমস্যা থেকে কিছুটা পরিত্রাণ পাওয়া যেত।

খালিশপুর জুট মিলে শ্রমিকদের চার সপ্তাহের মজুরি প্রায় দুই কোটি এবং কর্মচারী-কর্মকর্তাদের ১ কোটি ৬৫ লাখ টাকার বেতন বকেয়া রয়েছে। পাট ব্যবসায়ীদের কাছে দেনা আছে প্রায় ২৫ কোটি টাকা। এ মিলে পাটের কভারেজ ৫০ দিন। মিলের প্রকল্প প্রধান ইঞ্জিনিয়ার শফিকুল ইসলাম জানান, মিলের প্রধান সমস্যা শ্রমিকদের বকেয়া ও পাট ব্যবসায়ীদের দেনা। উৎপাদিত পণ্য বিক্রিহলে তার মিলের সমস্যা অনেকটা কেটে যাবে।

এদিকে, স্টার জুট মিলে শ্রমিকদের মজুরি বকেয়া রয়েছে তিনটি, যার পরিমাণ প্রায় ২ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। এছাড়া, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দুই মাসের বেতন বাবদ প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ টাকা বকেয়া রয়েছে। এই মিলের পাট খাতে দেনা রয়েছে প্রায় ২৮ কোটি টাকা। বিপরীতে মজুত পণ্য রয়েছে প্রায় ২১ কোটি টাকার। মিলের প্রকল্প প্রধান এফ এম বলুর রশিদ জানান, শ্রমিকদের মজুরি দিয়ে তাদের কাজে রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। কিন্তু মিলে মাত্র ২০ দিনের পাট মজুত আছে। এ অবস্থায় নতুন পাট না কিনলে উৎপাদন বন্ধ করে দিতে হবে।

একই চিত্র আলীম জুট মিলেও। সেখানে শ্রমিকদের ছয় সপ্তাহের বকেয়া মজুরির পরিমাণ প্রায় এক কোটি ৬ লাখ টাকা, কর্মচারী-কর্মকর্তাদের চার মাসের বকেয়া বেতন প্রায় ৮৮ লাখ, পাট খাতে দেনা ১২ কোটি টাকা, বিদ্যুৎ বিল বকেয়া ২৪ লাখ টাকা। আর ১৫ কোটি টাকার পাটজাত পণ্য বিক্রি হয়নি।

ইস্টার্ন জুট মিলে শ্রমিকদের ছয় সপ্তাহের বকেয়া মজুরি প্রায় ২ কোটি ৪০ লাখ টাকা, কর্মচারী-কর্মকর্তাদের তিন মাসের বেতন বাবদ বকেয়া ১ কোটি ২০ লাখ টাকা। এ ছাড়া, পাট খাতে দেনা প্রায় ১৭ কোটি টাকা, বিদ্যুৎ খাতে দেনা ৩৫ লাখ টাকা। বিপরীতে মিলে মজুত পণ্য রয়েছে প্রায় ১৫ কোটি টাকার। শ্রমিক-কর্মচারীদের বকেয়া বেতন-মজুরি ও পাট ব্যবসায়ীদের দেনার প্রচণ্ড চাপে আছেন বলে জানান মিলের প্রকল্প প্রধান ড. জুলফিকার আলী।

জেজেআই জুট মিলে শ্রমিকদের পাঁচ সপ্তাহের মজুরি বকেয়া প্রায় ২ কোটি ৯০ লাখ টাকা, কর্মচারী-কর্মকর্তাদের চার মাসের বেতন বকেয়া প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা। মিলের মজুত পণ্য রয়েছে ৩৫ কোটি টাকার। এই মিলের পাট খাতে দেনা প্রায় ২০ কেটি টাকা। মিলের প্রকল্প প্রধান ইঞ্জিনিয়ার নূরুল ইসলাম জানান, মিলে পাটের মজুত আছে মাত্র ১০ দিনের।

এদিকে, কার্পেটিং জুট মিলে শ্রমিকদের মজুরি বকেয়া আছে তিন সপ্তাহের, যার পরিমাণ ৫৪ লাখ টাকা। কর্মচারী-কর্মকর্তাদের দুই মাসের বকেয়া বেতন প্রায় ৪৪ লাখ টাকা। পাট খাতে দেনা আছেন প্রায় ৬ কোটি টাকা। মিলে উৎপাদিত মজুত পণ্য ১৫ কোটি টাকার। মিলে মাত্র ৩ দিনের পাট আছে বলে জানান মহাব্যবস্থাপক বনিজ উদ্দিন আহমেদ।

ক্রিসেন্ট জুট মিলের তাঁত বিভাগের শ্রমিক মহিদুল জানান, পাটের অভাবে মিলের বেশিরভাগ তাঁত বন্ধ থাকায় তাকে ৮ ঘণ্টার বিপরীতে মাত্র ৪ ঘণ্টা করে কাজ করতে হচ্ছে। অন্যদিকে তার ছয় সপ্তাহের মজুরি বকেয়া থাকায় পরিবার-পরিজন নিয়ে অর্ধাহারে দিন কাটাতে হচ্ছে।

প্লাটিনাম জুট মিলের শ্রমিক হাসান জানান, মজুরি বকেয়া পড়ায় বাজার করতে পারছেন না। এতদিন দোকানদার বাকি দিলেও এখন তাও দিচ্ছে না।

স্টার জুটমিলের শ্রমিক বেল্লাল জানান, কেউ তাদের আর বাকিতেও চাল-ডাল দিচ্ছে না। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে কিভাবে দিন কাটবে, সেই চিন্তা করছেন তিনি।

ক্রিসেন্ট জুটমিল সিবিএ’র সাধারণ সম্পাদক সোহরাব হোসেন  বলেন, পাটকলের শ্রমিকদের বর্তমান প্রধান সমস্যা বকেয়া মজুরি ও মজুরি কমিশন বাস্তবায়ন করা। অবিলম্বে পাট কেনার জন্য অর্থ ছাড় দেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। আর এসব সমস্যা নিয়ে বিজেএমসি’র সঙ্গে বহুবার বসেছি। কিন্তু তারা কোনো সমাধান দিতে পারেনি। তাই শ্রমিকবান্ধব সরকারের প্রধনমন্ত্রীর সরাসরি হস্তক্ষেপ চাই আমরা।

খুলান-যশোর অঞ্চলের ৯ পাটকলের এসব সমস্যা নিয়ে জানতে চাইলে খুলনা জোনের প্রধান শেখ রহমত উল্লাহ জানান, মিলের সবচেয়ে বড় সমস্যা উৎপাদনের পাট নেই, উৎপাদিত পণ্য বিক্রি না হওয়া অবস্থায় রয়ে গেছে। শ্রমিক-কর্মচারী-কর্মকর্তাদের বেতন বকেয়া পড়েছে। এছাড়া শ্রমিকরা সাত পাটকলে মজুরি কমিশন বাস্তবায়ন ও বকেয়া মজুরির জন্য গেট সভা করেছে। এসব সমস্যার কথা বিজেএমসিকে জানিয়েছি। তারা এসব বিষয় মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় সমাধানের পথ খুঁজছেন। সমস্যা সমাধানে করণীয় নিয়ে সম্প্রতি ৯ পাট কলের প্রকল্প প্রধানদের নিয়ে জরুরি বৈঠকও হয়েছে বলে জানান তিনি।