মুশুলী উচ্চ বিদ্যালয়ের ৭ম শ্রেণীর ছাত্র সুহাগ রানা। সে ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার পালাহার গ্রামের দিনমজুর হাবু মিয়ার পুত্র। দরিদ্র বাবার সংসার চলে টানাটানির মধ্যে। তাই করোনা মহামারির কারণে দেড় বছর আগে স্কুল ছুটি হওয়ার পর সংসারের আয়বর্ধক কাজে নিয়োজিত হয়েছে। রাজমিস্ত্রীর কাজ করে সংসারের উপার্জনকারী হিসেবে ভূমিকা রাখেছে।
এর মধ্যে ১২ সেপ্টেম্বর স্কুল খোলা হলেও ক্লাসে ফেরেনি সুহাগ। সুহাগের মত অনেক শিশুই বই খাতা রেখে এখন টাকা রোজগারের পথে নেমেছে। কেউ কেউ আবার ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় নিয়োজিত হয়েছে। এদের স্কুলে ফেরানোর দৃশ্যমান কোন উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। ফলে অনেক শিশুরই স্কুল থেকে ঝড়ে পড়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
জানা গেছে, মহামারি করোনাভাইরাসের কারণে গত বছরের ১৭ মার্চ থেকে দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দফায় দফায় ছুটি ঘোষণা করা হয়। কবে স্কুল খোলা হবে তার কোন নিশ্চয়তা ছিল না। তবে ছুটির এই সময় শিক্ষার্থীদের পাঠদান কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে সংসদ টিভির মাধ্যমে অনলাইনে ক্লাস পরিচালনা করেছে সরকার। কিন্তু অবসরে এ সময়টাতে স্কুলের শিক্ষকদের তদারকির অভাবে দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীরা টাকা রোজগারের পথে নেমেছে।
সুহাগ রানার সঙ্গে কথা বললে সে জানায়, স্কুল ছুটি থাকা অবস্থায় পরিবার থেকে টাকা উর্পাজনের জন্য তার উপর চাপ সৃষ্টি করা হয়। বাধ্য হয়ে সে ২৫০ টাকা রোজে রাজমিস্ত্রীর কাজ শুরু করে। এখনতো স্কুল খোলা হয়েছে ক্লাসে যাবে কি না জানতে চাইলে সে ‘বাবা জানে’ বলে মন খারাপ করে চলে যায়।
সুহাগের পিতা হাবু মিয়া বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ। স্কুল বন্ধ থাকায় ছেলেকে কাজে দিয়েছিলাম। এখন সে রাজমিস্ত্রীর কাজ শিখে গেছে। তাই ভাবছি আর স্কুলে পাঠাবো না।’
উপজেলার বনগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্র সাবাব জানায়, ‘তাদের ৩ ভাই। সে মধ্যম। বাবা চা স্টল চালায়। মাঝে মধ্যে অন্য কাজও করে। স্কুল বন্ধ থাকায় চায়ের দোকানে কাজ শুরু করে সে। প্রতিদিন দুই-তিনশ টাকার মতো উর্পাজন হয়।’
সাবাবেরও স্কুলে যাওয়া অনিশ্চিত।
ডাংরী গ্রামের কোচিং শিক্ষক বিল্লাল হোসেন জানান, তাঁর ছাত্র মিশ্রিপুর মাদ্রাসার নবম শ্রেণিতে পড়ুয়া রাকিব ওয়ার্কসপে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে যুক্ত হয়েছে। আরেক ছাত্র সজিব চৌরাস্তা এলাকায় চাচার হোটেলে কাজ করে। ওই শিক্ষকের ধারণা তারা আর বিদ্যালয়ে ফিরবে না।
বিল্লাল আরও জানায়, এদের মত তার পরিচিত অনেক শিক্ষার্থীই এখন আর স্কুলে যাচ্ছে না। একাধিক অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দীর্ঘ ছুটির এই সময়ে শিক্ষকরাও ছাত্র-ছাত্রীদের খোঁজখবর রাখেনি।
মেরেঙ্গা আব্দুল জব্বার উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. শাজাহান বলেন, তার স্কুলের কিছু ছাত্র ঢাকায় পোশাক কারখানায় কাজ শুরু করেছে। অনেক ছাত্রীর বিয়ে হয়ে গেছে। নতুন বছর শুরু হলে সঠিক পরিসংখ্যান করা যাবে ঠিক কতজন শিক্ষার্থী ঝড়ে গেছে।
বাকচান্দা আব্দুস সামাদ একাডেমি উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক হুমায়ুন কবির ভূইয়া বলেন, বিদ্যালয় খোলার পর যে শিক্ষার্থীরা এখন পর্যন্ত বিদ্যালয়ে আসেনি তাদের বিষয়ে কোনো নির্দেশনা এখনো আসেনি।
নান্দাইল মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি সুলতান আহম্মেদ বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে কোনো নির্দেশনা পাইনি। তবে আমরা ওই সব শিক্ষার্থীদের খোঁজ খবর নিচ্ছে।
নান্দাইল শহীদ স্মৃতি আদর্শ ডিগ্রী কলেজের অবসরপ্রাপ্ত বাংলা বিভাগের প্রভাষক শিক্ষাবিদ আফেন্দি নূরুল ইসলাম বলেন, শিক্ষার্থীদের করোনা দুযোর্গের সময় খোঁজ খবর রাখা প্রয়োজন ছিল। দীর্ঘ সময় বিদ্যালয় ছুটি থাকায় শিক্ষার্থীরা কর্মে জড়িয়ে পড়ছে। এতে অনেক শিক্ষার্থীই বিদ্যালয় থেকে ঝড়ে যেতে পারে।
নান্দাইল উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার রোকন উদ্দিন আহমেদ বলেন, করোনা মহামারির সময় যে শিক্ষার্থীরা অন্য পেশায় যুক্ত হয়ে এখন পর্যন্ত বিদ্যালয়ে আসছে না তাদের সম্পর্কে এখনো কোন নির্দেশনা পাইনি।
মজিবুর রহমান ফয়সাল/বার্তা বাজার/এসজে