ডাক্তারের বিরুদ্ধে প্রতারণা ও ভুল চিকিৎসার অভিযোগ

কিশোরগঞ্জের ভৈরবে মেডি ল্যাব নামে এক প্রাইভেট ক্লিনিক মালিকের বিরুদ্ধে ভুল চিকিৎসার অভিযোগ ওঠেছে। ফলে অন্তসত্তা এক নারীর গর্ভের সন্তান নষ্ট হয়ে গেছে। এ ঘটনায় ভুল চিকিৎসার শিকার নারীর বাবা আক্কাছ আলী বাদী হয়ে মেডি ল্যাবের মালিক ডা. কেএনএম জাহাঙ্গীর ও তার স্ত্রীসহ ৩জনের বিরুদ্ধে কিশোরগঞ্জ আদালতে মামলা দায়ের করছেন। গত মঙ্গলবার (০২ জুলাই) আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে ভৈরব থানার ওসিকে ঘটনাটি তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিল করতে আদেশ দিয়েছেন।

জানা গেছে, সরকারি চাকরির সুবাদে প্রায় ৬ বছর আগে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যোগদান করেন ডা. কেএনএম জাহাঙ্গীর। পরে ক্ষমতাসীন দলের হাতেগুণা কয়েকজন নেতার সাথে সখ্যতা গড়ে তুলেন।

ফলে কর্মক্ষেত্রে দু’বছর পাড় না হতেই তিনি শহরের কমলপুরে মেডি ল্যাব (প্রাইভেট) নামে একটি ক্লিনিক খুলে বসেন। তিনি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপে­ক্সে চাকরির সুবাদে সুকৌশলে রোগীদের তার ক্লিনিকে এনে টেস্টের নামে হাজার হাজার টাকা হাতিয়ে নেন। এছাড়াও উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ডা. কেএনএম জাহাঙ্গীর একটি দালাল চক্র গড়ে তুলেন।

একাধিক চিকিৎসকের নাম ব্যবহার করে বিভিন্ন এলাকায় দালালদের মাধ্যমে চটকদার বিজ্ঞাপন বা লিফলেট বিতরণ করেন। ফলে গ্রামের সহজ-সরল মানুষজন তার ফাঁদে পড়ে চিকিৎসা সেবা নিতে এসে প্রতারণার শিকার হন। গেল এক বছরে ডা. কেএনএম জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে রোগীদের সাথে প্রতারণা ও একাধিক ভুল চিকিৎসার অভিযোগ ওঠেছে। ফলে তিনি কাউকে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে আবার কাউকে ভয় দেখিয়ে এসব অভিযোগ ধামাচাপা দিয়েছেন।

এছাড়াও নানা অনিয়মের কারণে একবার মেডি ল্যাব ক্লিনিক মালিক ডা. কেএনএম জাহাঙ্গীরকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করেন ভ্রাম্যমাণ আদালতের নিবার্হী ম্যজিস্ট্রেট জেসমিন আক্তার।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, উপজেলার শিমুলকান্দি ইউনিয়নের মধ্যেরচর গ্রামের স্বামী পরিত্যক্তা নাজমা বেগমের কাছ থেকে অপারেশনের নামে প্রায় ২৫ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয়। ৬ মাস পরে ফের নাজমা বেগমের শারিরীক সমস্যা দেখা দিলে প্রতারণার বিষয়টি ধরা পড়ে। ফলে এর প্রতিকার চেয়ে নাজমা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক, জেলা প্রসাশক, সিভিল সার্জন ও উপজেলা নিবার্হী অফিসারের বরাবরে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।

অবশেষে নাজমা বেগমকে নগদ ২০ হাজার টাকা দিয়ে বিষয়টি দামাচাপা দেয়া হয়। এর আগে কমলপুরের এক তরুণীর এপেন্ডিসাইটের অপারেশন করতে গিয়ে ভুলে তরুণীর সন্তান জন্ম দেয়ার থলি কেটে ফেলা হয় অভিযোগ রয়েছে। তাছাড়া পৌর শহরের পুলতাকান্দা গ্রামের সওদাগর জামানের শিশুপুত্রের পেট ব্যথা হলে মেডি ল্যাব ক্লিনিকে নিয়ে গেলে ডা. কেএনএম জাহাঙ্গীর জানান, তার এপেন্ডিসাইট পেইন।

তাই ইমার্জেন্সী অপারেশন করতে হবে। পরে অপারেশন না করে শিশুটিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে গেলে শিশু বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ডা. নুরুজ্জামান জানান, অপারেশনের কোনো প্রয়োজন নেই। পেটে গ্যাসের কারণে এমনটি হয়েছে। অন্যদিকে সম্প্রতি কুলিয়ারচর উপজেলার গোবরিয়া আব্দুল্লাহপুর গ্রামের তানিয়া বেগমের পেট ব্যথা হলে তাকে মেডি ল্যাব ক্লিনিকে নিয়ে আসা হয়।

পরে ডা. কেএনএম জাহাঙ্গীর বিভিন্ন পরিক্ষা-নিরিক্ষা শেষে জানান, তানিয়ার পিত্তথলিতে পাথর রয়েছে এবং তার গর্ভে ৪ মাসের সন্তানও আছে। সে অনুযায়ী তানিয়াকে ২দিন ক্লিনিকে ভর্তি রেখে চিকিৎসা করা হয়। পরে তাকে ছাড়পত্র দিয়ে বাড়িতে পাঠানো হয়। কিন্তু তানিয়ার ফের পেট ব্যথা শুরু হলে আবার মেডি ল্যাবে নিয়ে আসলে ডা. কেএনএম জাহাঙ্গীর এবার জানান, তার কিডনি ফুলে গেছে।

এতে তানিয়ার অভিভাবকদের সন্দেহ হলে তাকে দ্রুত জহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল নিয়ে গেলে সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা জানান, তানিয়ার পিত্তথলিতে কোনো পাথর নেই। এমন কি? তার কিডনিও ফুলে যায়নি। আসলে তানিয়ার এপেন্ডিসাইট ফেটে গেছে আর সেখানে ভুল চিকিৎসার কারণে তানিয়ার গর্ভের সন্তানটি নষ্ট হয়ে গেছে। অবশেষে তানিয়াকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

এদিকে হয়রানি ও ভুল চিকিৎসার প্রতিকার চেয়ে তানিয়ার বাবা জেলা প্রসাশক ও সিভিল সার্জন বরাবরে লিখিত অভিযোগ করেন। একই সাথে প্রতারণা ও ভুল চিকিৎসা বন্ধে এবং সুষ্ঠু বিচারের দাবীতে মেডি ল্যাবের মালিক ডা. কেএনএম জাহাঙ্গীরকে প্রধান অভিযুক্ত করে ৩জনের বিরুদ্ধে কিশোরগঞ্জ আদালতে মামলা দায়ের করেছেন।

মামলার অন্য আসামীরা হলেন- মেডি ল্যাবের অপর মালিক তার স্ত্রী তামান্না ফেরদৌসী এবং ডা. হাফিজা খাতুন।

স্থানীয়রা জানায়, একের পর এক ভুল চিকিৎসার কারণে হয়রানি শিকার হচ্ছেন গ্রামের সহজ-সরল লোকজন। ফলে ক্ষোভে ফুসে ওঠেছে তারা। এছাড়াও ক্লিনিকের সামনে বেশ কয়েক জন চিকিৎসকের নাম ব্যবহার করে সাইন বোর্ড টানানো হয়েছে। কিন্তু, তারা কোনো দিন কিংবা সপ্তাহে একদিনও রোগী দেখতে আসেন না। শুধু তাই নয়, ভর্তি রোগীদের সেবা দিতে কোনো একজন আবাসিক মেডিকেল অফিসার কিংবা অভিজ্ঞ নার্সও নেই।

খোজঁ নিয়ে জানা যায়, মেডি ল্যাব (প্রাইভেট) ক্লিনিকের মালিক ডা.কেএনএম জাহাঙ্গীর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপে­ক্সে (আরএমও) আবাসিক মেডিকেল অফিসার হিসেবে নিয়োজিত রয়েছেন। কিন্তু তার ব্যক্তি মালিকায় ক্লিনিকে চেম্বার করায় নিধার্রীত সময়ে সরকারি হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করছেন না। এমনি কি? সরকারি কোয়াটারেও তিনি থাকেন না। ফলে সেখানেও সেবা বঞ্চিত সেবা প্রত্যাশী শত শত রোগীরা।

সম্প্রতি এসব বিষয়ে জানতে সাংবাদিকরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপে­ক্সে গেলে তাকে না পেয়ে তার ব্যাক্তি মালিকায় গড়া প্রাইভেট ক্লিনিক মেডি ল্যাবে গেলে ডা. কেএনএম জাহাঙ্গীর বলেন, কাজ করলে ভুল হতেই পারে।

তাছাড়া কেন? নাজমাকে জরিমানা দিলেন। এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ওটিতে নেয়ার পর নাজমাকে অপারেশন করার মতো অবস্থা ছিল না। তারপরও আমরা আমাদের মতো চেষ্টা কেরছি। পরে গরিব মানুষ হিসেবে কিছু টাকা দেয়া হয়েছে। অন্যদিকে তানিয়া ভুল চিকিৎসার শিকার হলে সাংবাদিকরা মেডি ল্যাবে গেলে তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন এবং স্থানীয় নেতাদের নাম বলে ভয় দেখায়।

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর