শরৎ এলেই প্রতিমা তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করেন মৃৎশিল্পরা
শরৎ মানেই পরিষ্কার নীল আকাশে ভেসে চলা সাদা সাদা পেঁজা তুলোর মেঘ। ভোরে ঘাসের ডগায় জমতে থাকা শিশিরবিন্দুর মধ্যে সাদা শাড়িতে কমলা আঁচল বিছিয়ে শিউলি ফুলের সজ্জা। সেই সঙ্গে বাংলায় শরৎ মানেই ঢ্যাম কুড় কুড় ঢাকের তালে আলতা রাঙা পায়ে শারদীয় বার্তা নিয়ে হিন্দু দেবী দূর্গার আগমন।
বাংলার অন্যতম বড় এই উৎসবে প্রকৃতিও যেন সেজে ওঠে অন্যন্য উপায়ে। শরৎ মানেই যেন আকাশ আর মাটির মেলবন্ধন। ঘন সবুজ কাশের বনে আকাশের কয়েক টুকরো মেঘ যেন উড়ে এসে কাশফুল হয়ে ফুটে থাকে। আশ্বিনের শুক্লপক্ষে দেবী আসেন দশভূজা রূপে, সিংহের পিঠে অধিষ্ঠান হয়ে। হিন্দু ধর্মমতে, দুর্গতি বা সংকট থেকে রক্ষা করার জন্য তিনি দুর্গা। অন্য মতানুসারে দুর্গম নামের অসুরকে বধের কারণে তাঁকে দূর্গা নামে ডাকা হয়।
বাঙলাী হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দূর্গাপুজা শুরু হবে। আর এইটি ঘিরেই যেন হিন্দু সম্প্রদায়ের চলছে নানান আয়োজন। বেড়েছে মৃৎশিল্পীর ব্যস্ততা। দেবী দূর্গার প্রতিমা তৈরিতে বিভিন্ন মন্দির মন্দিরে রাতদিন কাজ করে যাচ্ছেন প্রতিমা কারিগররা।
আগামী ১১ অক্টোবর থেকে পাঁচ দিন ব্যাপী এ উৎসবকে কেন্দ্র ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ায় মন্ডপে মন্ডপে চলছে প্রতিমা তৈরির কাজ। প্রতিমা শিল্পীরা তাদের নিপুন হাতের ছোঁয়ায় তৈরি করছেন অনিন্দ্য সুন্দর দেব-দেবীর প্রতিমা। ইতিমধ্যে মাটি দিয়ে প্রতিমা গড়ার কাজ শেষ হয়েছে।
চলছে শেষ মুহুর্তের ফিনিশিংয়ের কাজ। প্রতিমা কারিগররা ব্যস্ত সময় পাড় করছেন প্রতিমা তৈরিতে। প্রতিটি মন্দিরে রং কাম, পেন্ডেল ও তোরণ নির্মাণ করে সাজানো হচ্ছে নতুন সাজে।
প্রস্তুতি চলছে আলোকসজ্জার। এবছর আখাউড়ায় ২২টি পুজা মন্ডপে দূর্গাপুজা উদযাপিত হবে। এরমধ্যে পৌরশহরে ১০টি এবং ৫টি ইউনিয়নে ১২ টি পুজা অনুষ্ঠিত হবে। দূর্গাপুজাকে ঘিরে প্রতিটি মন্দিরে পুরোদমে প্রস্তুতি চলছে।
এদিকে পুজাকে কেন্দ্র করে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনের মাঝে উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। অপেক্ষা করছেন দেবী দূর্গার আগমনের।
সরজমিনে পৌরশহরের রাধানগর রাধামাধব, সাহা পাড়া, দাস পাড়া, কুমার পাড়া কলোনী, দূর্গাপুর, মোগড়া ইউনিয়নের মোগড়া পুজা মন্দির ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিমা কারিগররা পরম যত্নে কাদামাটি দিয়ে প্রতিমা গড়ছেন। চলছে ফিনিশিংয়ের কাজ। তাদের নিখুঁত হাতের ছোঁয়ায় সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলছেন বিভিন্ন দেব-দেবীর মুখাবয়ব। মাটি শুকিয়ে আসলেই দেয়া হবে রং, তারপর কাপড় জড়িয়ে গহনা পড়ানো হবে। এসব প্রতিমার মধ্যে রয়েছে দেবী দুর্গা, অসুর, সিংহ, মহিষ, গণেশ, সরস্বতী ও কার্তিক।
রাধামাধব আখড়া মন্দিরে কথা হয় প্রতিমা কারিগর রতন পালের সঙ্গে। তিনি বলেন, প্রথমে বাঁশ ও খেড় দিয়ে কাঠামো তৈয়ার করা হয়। তারপর হয়ে গেলে কাদা মাটি দিয়ে প্রতিমা গড়া হয়। মাটি শুকিয়ে গেলে রুদে শুকানো হয়। তারপর রং দিয়ে গহনা, কাপড় জড়ানো হয়।
তিনি আরও বলেন, বিগত প্রায় ২০ বছর ধরে তিনি এ পেশায় আছেন। বাবার কাছ থেকে কাজ শিখেছেন। এবছর তিনি ৯টি পুজা মন্দিরের প্রতিমা গড়ার কাজ পেয়েছেন। প্রতিমা ভেদে ৩০ হাজার থেকে ৭০/৮০ হাজার টাকা মজুরি নেন। ২ জনসহ কাজ করে প্রতিটি মন্দিরের প্রতিমা গড়তে ৬/৭ দিন সময় লাগে।
রাধানগর সাহাপাড়ার বাসিন্দা আশীষ সাহা বলেন, গত বছর করোনা ভাইরাসের কারনে সীমিত পরিসরে দূর্গাপুজা উদযাপন করেছি। এবছর করোনা সংক্রমণ কমে যাওয়ায় ঝাঁকজমভাবে দূর্গাপুজা উদযাপন করতে পারব বলে আশা করি।
আখাউড়া উপজেলা পুজা উদযাপন পরিষদের সদস্য সচিব বিশ্বজিৎ পাল বাবু বলেন, উপজেলায় এবার ২২টি মন্দিরে দূর্গাপুজা উদযাপিত হবে। ইতিমধ্যে প্রতিমা তৈরীর কাজ শেষ হয়েছে। সরকারি নির্দেশনা এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে প‚জা পালনের সব প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
আখাউড়া উপজেলা পুজা উদযাপন পরিষদের আহবায়ক দীপক কুমার ঘোষ বলেন, গত বছর করোনা ভাইরাসের কারণে অনুষ্ঠানমালা কাটছাট করে সীমিতভাবে পুজা উদযাপন করতে হয়। এবছর আশা করি ঝ্কাজমক ভাবে আনন্দ উল্লাসের মধ্য দিয়ে পুজা উদযাপন করতে পারব। মন্দিরের নিরাপত্তায় প্রশাসনের পাশাপাশি আমাদের নিজস্ব স্বেচ্ছাসেবক নিয়োজিত থাকবে।
আখাউড়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. মিজানুর রহমান বলেন, দুর্গাপুজা হিন্দু স¤প্রদায়ের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় উৎসব। এই উৎসবে কেউ যাতে কোন ধরনের অপ্রিতিকর ঘটনা না ঘটাতে পারে সেজন্য প্রশাসন তৎপর রয়েছে।
হাসান মাহমুদ পারভেজ/বার্তা বাজার/টি